ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

‘চির বন্ধু-চির নির্ভর-চির শান্তি তুমি হে…’ রবিঠাকুরের এই লাইনগুলো বার বার মনে পড়ছে। হুমায়ুন আহমেদ স্যারের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য অনেক। আমি তার তুলনায় অতি নগণ্য- কি সাহিত্যে, লেখায়, পান্ডিত্যে-এমনকি বয়সের পার্থক্যে। তারপরেও তিনি কেমন করে আমার বন্ধু হয়ে গেলেন সেটা একটা ভাবনার বিষয়। আমাদের প্রজন্ম, আমাদের আগের বা পরের প্রজন্ম কে হাতে ধরে বই পড়া শিখিয়েছেন। বই এর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে দিয়েছেন হুমায়ুন স্যার। মনে পড়ে, সেই ছোট্ট বেলা থেকে আমি আমার এবন্ধু-ওবন্ধুর কাছ থেকে ধার করে তাঁর বই পড়তাম। আর পরবর্তিতে প্রতি বইমেলাতে গেলে স্যারের উপর খুব রাগ হতো অন্যপ্রকাশের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে। এই সব দেখেই তো বড় হলাম। আজ সেই বাংলা সাহিত্যের মহানায়কের বিদায় দিতে হচ্ছে। চোখ বারবার ভারী হয়ে আসছে।

১৮ বছর বয়স খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই বয়সের আগে থেকে মানুষ যখন কৈশোরে পা দেয়, তখন মানুষের জীবনবোধ-যুক্তি-প্রতিযুক্তি-কিছুটা আবেগ-ভাল লাগা-মন্দ লাগা-চেতনা গড়ে ওঠে। সেই বয়স থেকেই হুমায়ুন আহমেদ এই সব কচি ছেলে মেয়েদেরকে বই এর জগতে টেনে নিয়ে এসেছিলেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো। যাতে করে কোমলমতি ছেলেমেয়েরা অতি আবেগের বশবর্তি হয়ে চলতে না পারে। তাদের ভিতরে যেন একধরণের যুক্তিবোধ-জীবনবোধ কাজ করতে পারে। তাই তিনি হিমু-মিসির আলির মত কিংবদন্তি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তি-প্রতিযুক্তি দিয়েই চলতে হয়। জীবনকে বোঝার জন্য-জীবনকে উপভোগ করার জন্য হুমায়ুন আহমেদ একটি প্রতিষ্ঠান-একটি আশ্রয়স্থল-একটি আদর্শ।

‘ও কারিগর-দয়ার সাগর-ওগো দয়াময়…চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়…’ –এই কথাগুলো তাঁর একটি বিখ্যাত নাটকের সংলাপের মাধ্যমে শুনেছিলাম। সেই থেকে জোছনা আমার খুব প্রিয় বিষয়। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি নিজেই একজন চন্দ্রগ্রস্থ মানুষ। জোছনা যে এত স্নিগ্ধ-মায়াবী-সুন্দর হতে পারে তা যে হুমায়ূন আহমেদ হাতে ধরে শিখিয়ে দিলেন আমায়। আজ শুধু হুমায়ূন আহমেদ নন তাঁর সঙ্গে হিমু-মিসির আলিরও মৃত্যু হল। রাত ১২ টার দিকে যখন শুনলাম তাঁর মৃত্যুর কথা মনের অজান্তেই জানালার বাইরে চোখ চলে গেল। বাইরে আমি জোছনা খোজার চেষ্টা করছিলাম। চোখের কোনে মেঘ জমে আসছিল। হঠাৎ মনে হল আর একদিন পরেই তো রমজান মাস। তার মানে আজ অমাবস্যা। মৃত্যুটি চাঁদনী রাতে হয়নি। অমাবস্যায় হল। কিন্তু কেন! কিন্তু কেন!! আজ অমাবস্যা। হুমায়ূন স্যার চলে যাবেন বলে কি জোছনারও মন খারাপ?

এই তো সেদিন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। আমার এক ছোট ভাই গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে আমাকে মুঠোফোনে রেজাল্ট জানিয়ে খুদেবার্তা পাঠিয়েছে। আর লিখেছে আমি যেন তার ভাল ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করি। আমি ফিরতি খুদেবার্তা তে লিখে পাঠালাম ‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে এই দিনেরেই নিতে হবে সেই দিনেরই কাছে…।’ হুমায়ূন আহমেদ কে খুব পছন্দ করতাম কিনা জানিনা। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে এই মহানায়ক কখন যে তার আসন আমার হৃদয়ে করে নিয়েছেন, আমি বুঝতেও পারি নাই।

মনটা খুব অস্থির হয়ে আছে। আসলে আমরাও একটি অস্থির সময় পার করছি। মনটা কেন্দ্রীভূত করতে পারলে ভাল হত। কিন্তু স্রষ্ঠার নিয়ম তো মানতেই হবে। উহু! আর ভাবতে পারছিনা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কি হুমায়ূন আহমেদ বাতাস হইয়া জড়াইবেন কেশ! কখনও কি দিবেন না ভুলিতে?