ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমি শাবিপ্রবির অতি নিরীহ গোছের ছাত্রদের মধ্যে একজন। কেউ কখনো বলতে পারবে না কারও সাথে চোখ গরম করে দুটো কথা বলেছি। ভার্সিটিতে একটা ডিপার্টমেন্টে পড়ছি। গতানুগতিক মধ্যবিত্ত চিন্তানুযায়ী কোনোমতে সার্টিফিকেটটা নিয়ে বের হয়ে জবে ঢুকে যেতে পারলে বাঁচি। এই চার বছরের সময়কালকে নির্বিঘ্ন করতে কখনো কোনো রাজনৈতিক গ্রুপিং এর সাথে আমি ছিলাম না। কিন্তু তবু শুধুমাত্র একজন সাধারণ ছাত্র হিশেবে এই প্রায় তিন বছরের ক্যাম্পাস লাইফে কয়েকটা বিষয় বুকে কাঁটার মতো হানে। এবং আশ্চর্যের বিষয় সবগুলোর সাথেই কোনো না কোনোভাবে শাবির বর্তমান ভিসি স্যার সংযুক্ত।

মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্য ইস্যুঃ

ক্যাম্পাস লাইফের প্রথম দিনই শাবির তৎকালীন ভিসি স্যার এবং জাফর স্যারের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু তথ্য শুনে গর্বে বুকটা ভরে গিয়েছিলো। আসলে ভর্তির আগে শাবি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না আমি। তো সেইদিনই জাফর স্যারের মুখে শুনি আমাদের ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে কিছুদিনের মধ্যেই বসানো হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ব্যায়বহুল মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্য। শুনে তো আমরা আহ্লাদে আটখানা। কিন্তু সেই আহ্লাদ আর দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। এর কিছুদিন পরে ভিসি পরিবর্তন হয়ে বর্তমান ভিসি আসেন।আগে থেকেই সিলেটের স্থানীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী ভাষ্কর্য স্থাপন নিয়ে দু এক জায়গায় মিটিং মিছিল করতে থাকে। এর সাথে যোগ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু জামায়াত মনষ্ক শিক্ষক। কিন্তু তবু আমরা চোখে আশা নিয়ে গোলচত্বরের অর্ধনির্মিত বেদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। ভাবি, কিছুদিনের মধ্যেই মৌলবাদী অপশক্তিকে তোয়াক্কা না করেই মুক্তিযুদ্ধের সেই অসাধারণ ভাষ্কর্যটি আসবে। ভাষ্কর্য নির্মাণ কাজ সম্পুর্ণ শেষ হলেও সেই ভাষ্কর্য আর ক্যাম্পাসে এল না। মাননীয় নতুন ভিসি এসে আর গুরুত্ব দিলেন না ভাষ্কর্য স্থাপনের ব্যাপারটিকে। ফলে আজও গোলচত্বরের ওই অর্ধনির্মিত বেদীটি পুরো ক্যাম্পাসের দিকে তাকিয়ে অশ্লীলভাবে হাসে। কটাক্ষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে, যার অর্থ, এই দীর্ঘ আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেও অন্ধ মৌলবাদের কাছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো জিম্মি!

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ইস্যুঃ

ভাষ্কর্যের পর আমরা দেখি আরেক নাটক। ২০১৩-১৪ সেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময়ই জানানো হয় পরীক্ষা হবে সমন্বিত পদ্ধতিতে, শাহজালাল এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। এটা নিয়ে আমরা অনেক উত্তেজিত ছিলাম। কেননা আমাদের শাবিপ্রবি বাংলাদেশে ইতোপূর্বে অনেক নতুনত্বের পথপ্রদর্শন করে এসেছে। প্রথম ওয়াইফাই ঘেরা ক্যাম্পাস, সেমিস্টার পদ্ধতি, মোবাইলে ভর্তি প্রক্রিয়া, নিজস্ব সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকা এবং আরও অনেক কিছু। আর মেডিকেলের মত, বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীদের যে কতটা সুবিধা হত তা আমরা প্রতিটা ছাত্রই হাড়ে হাড়ে জানি যারা সারা দেশ ঘুরে ঘুরে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বেড়িয়েছি। যাই হোক ভর্তি পরীক্ষার তারিখ চলে আসলো। কিন্তু ঠিক তিন চার দিন আগে কোথাকার কোন ভুঁইফোড় সঙ্গঠন এসে দাবী করলো এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া যাবে না। শুধু তাই না, সিলেটিদের জন্য ৫০% আঞ্চলিক কোঠার মতো হাস্যকর দাবিও তারা তুলেছিলো। কিন্তু মাননীয় ভিসি স্যার তাদের আশ্বাস দিলেন। এবং ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করলেন। ফলস্বরুপ জাফর স্যার এবং ইয়াসমিন ম্যাম তৎক্ষণাৎ ক্যাম্পাস থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাথে সাথে ক্যাম্পাসে হাজার হাজার স্টুডেন্ট জড় হল জাফর স্যারের পদত্যাগ প্রত্যাহার এবং সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বহাল রাখার দাবিতে। ভিসি স্যার যখন দেখলেন সাধারণ ছাত্রদের কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না, তখন তিনি আশ্বাস দিলেন পরীক্ষা সমন্বিত পদ্ধতিতেই হবে। এরপর জাফর স্যার ও ইয়াসমিন ম্যাম পদত্যাগ প্রত্যাহার করে নিলেও আন্দোলোন থেমে গেলে কথা রাখেন নি ভিসি স্যার। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা তো বাতিল করেছেনই, উপরন্তু আর কখনো যেনো সমন্বিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা না নেওয়া যায় এমন ব্যবস্থা তিনি করেছেন। [লিঙ্ক ২] http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article739730.bdnews

ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং ভিসির রহস্যময় অন্তর্ধানঃ

গতবছর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে একজন ছাত্র মারা যায়। ক্যাম্পাসে প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রের মত অবস্থা তৈরি হয়। পুলিস তাদের বিশাল বহর, জলকামান, টিয়ারশেল, রবারবুলেট নিয়ে হাজির হয়। এমন থমথমে পরিস্থিতিতে হলভ্যাকেন্ট করার নির্দেশ দেয়া হয়। আমাদের এই পোড়া দেশের প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে। কিন্তু আমরা ক্যাম্পাসের ছাত্র-ছাত্রীরা আকাশ থেকে পড়লাম যখন শুনলাম, আমাদের ভিসি স্যার ঘটনার পরদিন ভারত ভ্রমণে গিয়েছেন। আমরা জানি একজন ভিসি হচ্ছেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় কর্তা। বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি একটি পরিবারের মত ধরি তবে নিজের পরিবারকে রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে রেখে যিনি ভারত ভ্রমণে যা তিনি কেমন কর্তা, পরিবারের জন্য তাঁর দরদ কতটুকু তা আর কারও বুঝতে দেরি থাকে না। উপরন্তু স্যারের সফরসঙ্গী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জামাতপন্থী শিক্ষক। ভিসি স্যারের এই অদ্ভুত পলায়ন ছাত্র-ছাত্রীদের ভিতরে ব্যাপক সংশয়ের জন্ম দেয়। [লিঙ্ক ৩] http://www.jugantor.com/news/2014/11/24/178508

 

পোষ্যকোটা চালু ও অন্যান্যঃ

 

শাবিতে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানদের জন্য কোনো পোষ্য কোটা ছিলো না। পোষ্যকোটা চালুর আয়োজন করলে শাবির প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। এবং বরাবরের মত এবারো ভিসি আশ্বাস দেন এবং গোপনে সবার অগোচরে পোষ্য কোটা চালুর ব্যবস্থা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাঁর নিজ বিভাগের ছাত্রী যৌন হয়রানীর অভিযোগ তোলে। পরবর্তীতে তা যৌন হয়রানী নিরোধ কমিটিতে পাঠানো হলেও তদন্ত বন্ধ করে দিয়ে ভিসি মহোদয় সেই শিক্ষককে শিক্ষা ছুটিতে বিদেশ পাঠিয়ে দেন! [ লিঙ্ক]

http://www.jugantor.com/bangla-face/2014/05/26/103532

http://www.jugantor.com/news/2015/01/31/213124

 

শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগ দিয়ে হামলাঃ

এবং সবশেষে শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগ দিয়ে হামলার প্রসঙ্গ। হামলা তাঁর সামনেই হয়েছে, অথচ হামলার পরপরই তিনি সাংবাদিকদের জানান তিনি হামলার ব্যাপারে কিছু জানেন না। এবং যারা ছিল তারা নাকি ছাত্রলীগের কেউ ছিল না। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী। তারা ভিসি ভবনে এসেছিল একাডেমিক মিটিং এ সহযোগীতা করার জন্য! এর প্পর কি হয়েছে তা তো আমরা সবাই জানি। এসবের ভিডিও আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। রিসেন্ট একটা সিসিটিভি ফুটেজে দেখলাম ভিসি স্যার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে আরেকজন প্রফেসর ডঃ ইউনুস স্যারের কলার ধরে মাটিতে ফেলে দিচ্ছেন! এ বিষয়ে আমার আর কিছুই বলার নেই। [লিঙ্ক] https://www.youtube.com/watch?v=RgWuszCH4MA

http://www.jugantor.com/last-page/2015/09/02/317383

মাননীয় ভিসি স্যার যোগ্য না, না অযোগ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যোগ্যতা আমার নাই। ভিসি স্যার কোন-কোন দূর্নীতি-স্বজনপ্রীতির সাথে জড়িত তাঁর খবর রাখাও আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি শুধু সেইসব বাহ্যিক ঘটনা তুলে ধরলাম যা আমাকে, এবং আমার মত আর সব সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে মানসিকভাবে আঘাত করেছে। শুধু আঘাত না, আমাদের শিক্ষাজীবনও পিছিয়ে দিয়েছে ছয়টি মাস (গতবছরের ছাত্রলীগের সংঘর্ষ)।

1_317383 1_316315 sust-zafar-sir-pic syl-pic-17-(30-08-15)_158752