ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

দুই বিদেশী হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আইএস এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ওয়েব সাইট, সার্চ ফর ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্ট এন্টিটিস (SITE Intelligence Group)। তাদের প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মিডিয়া বিশ্বব্যাপী রব তোলে যে বাংলাদেশে আইএস রয়েছে এবং তারা বিদেশীদের হত্যা করছে। SITE এ প্রকাশিত তথ্য সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইএস এর অস্তিত্ব নেই; SITE এর তথ্য ভেরিফাই করে দেখতে হবে। জামায়াত-বিএনপি, শুষিল, বামাতি সকলেই নেমে পড়ে সরকারের সমালোচনায়। তাদের বক্তব্যঃ জঙ্গিবাদের অভিযোগে যাদের এতদিন সরকার ধরেছে তাদের মধ্যে অনেকের সম্পর্কেই আইএস, তালেবান, আল-কায়েদা, ইত্যাদির সম্পর্ক রয়েছে বলে সরকার যা প্রচার করেছে তা কি সত্য নয়? দেশে আইএস বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা আছে কি নেই এ নিয়ে চলে তুমুল বিতর্ক। বিদেশী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিদেশী কোন গোষ্ঠী নয় দেশীয় জঙ্গিরা একাজ করেছে বলে মনে করে সরকার। দেশে আইএস নেই বলতে সরকার আইএস সংগঠনের সরাসরি তৎপরতা নেই বুঝিয়ে থাকতে পারে। সরকারের এই অবস্থান সমর্থিত হয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্যে। বিডিনিউজ টুয়েণ্টিফোর ডট কম জানায়ঃ টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুসারে, ভারতীয় গোয়েন্দারা মনে করেন, আইএস নয় ইতালিয়ান এবং জাপানি নাগরিকদের হত্যায় জামায়াতে ইসলামী জড়িত। সরকারী দলের নেতারাও বিদেশী নাগরিক হত্যায় জামায়াত-বিএনপি জড়িত বলে ইঙ্গিত করেছেন।

SITE এ প্রকাশিত তথ্যের সূত্র জানতে টেলিফোনে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা যোগাযোগ করেছেন তাদের প্রতিষ্ঠাতা রিটা কাৎজের সঙ্গে। বারবার সূত্র জানতে চাইলেও কোন সূত্র দেননি রিটা। সাধারণত আইএস কোন অপারেশনের পর যেসব ওয়েবসাইটে দায় স্বীকার করে বিশ্বব্যাপী বিবৃতি বা ভিডিও আপলোড করে, তার কোনটিতেই এখনো বাংলাদেশে দুই বিদেশীকে হত্যার ব্যাপারে সংগঠনটির ‘দ্বায়িত্ব স্বীকার’ করার মত তথ্য পায়নি তদন্তকারী সংস্থা। গোয়েন্দারা আরও বলেছেন যে রিটার আচরণ রহস্যজনক। বাংলাদেশের গোয়েন্দারা যখন আইএস এর দায় স্বীকার সংবাদের সূত্র জানতে চান তখন তাদেরকে সে সূত্র দিতে SITE এর অসুবিধা কোথায়? রিটা কেনই বা রহস্যজনক আচরণ করবেন? সারা পৃথিবীতে যত সংবাদ মাধ্যম আছে তারা সবসময় সংবাদের উৎস উল্লেখ করে খবর প্রকাশ করে; সামান্য কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া। যখন সংবাদদাতার কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে তখন মিডিয়া সূত্র গোপন রাখে। আইএস যদি বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েই থাকে এবং তার দায় স্বীকার করে থাকে তবে তাতে কোন ব্যাক্তির ক্ষতি হওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষতি যা হবার তা আইএস এর। সে ক্ষতির দায় নিয়েই আইএস বহু হত্যাকণ্ডের দায় অতীতে স্বীকার করেছে; হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রচার করেছে। আমেরিকান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে কাজ করা প্রতিষ্ঠান SITE এ প্রকাশিত তথ্য আমেরিকান সরকারের কারসাজী নয়তো?

আইএস বিদেশীদের হত্যার দায় স্বীকার করেছে SITE এর দেয়া এমন তথ্যটি ক্যাশ করতে সময় নেননি মার্কিণ রাষ্ট্রদূত, বার্ণিকেট। তিনি আইএস মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেন প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। এই প্রস্তাব বাংলাদেশ গ্রহণ করলে দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকাকে নাক গলানোর সুযোগ দেয়া হবে। এরকম সুযোগ নিয়ে আমেরিকানরা বিভিন্ন দেশে জঙ্গি তৎপরতা কমানোর পরিবর্তে বাড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমনের নামে তারা আফগানিস্থান, পাকিস্থান, ইরাক, লিবিয়া, তিউনেশিয়া এবং ইয়েমেনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করে দিয়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিন সেসব দেশে জঙ্গি হামলা হচ্ছে, মানুষ মরছে বেশুমার।

বাংলাদেশেও তারা জঙ্গিবাদী ধ্বংসযজ্ঞ উৎসাহিত করে চলছে। যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে একাট্টা হয়ে তারা ২০১০ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইবুন্যালকে বিতর্কিত চেষ্টা করেছে। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা থেকে বিরত রাখার জন্য মার্কিণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি নিজে ফোন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর প্রচ্ছন্ন সমর্থন পেয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িত ১৫০টি জঙ্গি সংগঠন ২০১৩ এবং ২০১৫ সালে ব্যাপক ধ্বংসাত্বক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে; শত শত মানুষ এবং হাজার হাজার গাছের প্রাণনাশ করেছে। পশ্চিমাদের সমর্থনে এতসব করেও জামায়াত-বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে প্রগতিশীল দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে।

সমর্থকদের ব্যর্থতার দায় থেকে মুক্ত করতে এবার পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেরাই কি নেমেছে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে, যেমনটা নেমেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী সময়ে? স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে ব্যর্থ করে পাকিস্থানীদের রাজনৈতিক এজেণ্ডা বাস্তবায়ণ করতে সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন গ্রুপকে উস্কানী দেয়া থেকে শুরু করে ‘৭৪ এর দূর্ভিক্ষ ঘটানো পর্যন্ত বহু অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল আমেরিকা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা ছিল সে অধ্যায়ের শেষ অপকর্ম। বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধী তথা সাম্রাজ্যবাদীদের দোসরদের রাজনীতি স্বাধীন বাংলাদেশে চিরতরে নির্মূল করার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনা। বাংলার মাটিতে তাঁর রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চাইবেনা পশ্চিমা বেনিয়ার দল। এটা খুব সহজেই অনুমেয়। যুদ্ধবাজ এই পশ্চিমা শক্তি শত শত বছর ধরে শোষণ করেছে ল্যাটিন আমেরিকানদের। এখনো তাদের শোষণ চলছে আফ্রিকায়, মধ্যপ্রাচ্যে; অর্ধশতাব্দী ধরে অশান্তিতে রেখেছে ফিলিস্তিনিদের। হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত মিশর এখন মৃত্যু উপত্যকা। সাম্রাজ্যবাদীদের রোষানলে জ্বলেছে লেবানন। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে তারা আফগানিস্থান, পাকিস্থান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন। সেসব দেশে এখন শুধু রক্ত আর রক্ত। যেকোন মূল্যে বাংলার রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদীদের নাক গলানোর সুযোগটা বন্ধ করে দিতে হবে চিরতরে। সেটা করতে পারলেই নিশ্চিত হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, তার আগে নয়।