ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সম্প্রতি এক জনসভায় বলেছেন, “রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। জাতীয় স্বার্থে এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রকৃত রাজনীতিবিদদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। শুধু রাজনীতি করলেই চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। দূর্ণীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে। এটাই হবে প্রকৃত রাজনীতিবিদের কাজ। তাহলেই খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে।”

তিন চাকার একটি অটো রিক্সায় চড়ে রাষ্ট্রপতি নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম যান এবং অষ্টগ্রাম পাইলট হাই স্কুল মাঠে এই বক্তব্য রাখেন। তাঁর এই বক্তব্য মূলধারার মিডিয়ায় তেমন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রাষ্ট্রপতির অটো রিক্সায় চড়ার ছবি বেশ শেয়ার হয়েছে। অনেকে এই ছবির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর মেট্রো রেলে চলার ছবির তুলনা করে বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের রাষ্ট্রপতি উচ্চবংশীয়, রাজা-বাদশা বা সেনা শাসকদের মত নন। তিনি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা সাধারণ মানুষ যিনি সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থনে। দেশের সর্বোচ্চ পদে এমন একজন সাধারণ মানুষ পেয়ে অনুভূত গর্ব ফেসবুকে শেয়ার করেছেন অনেকে। কিন্তু যথার্থ এবং পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি তাঁর বক্তব্য নিয়ে। না হওয়ার কারণ হয়ত এটাই যে ভাল কথার দাম নেই; সত্যি কথা বা সঠিক কথা দিয়ে দেশ চলছে না। দেশ চলছে অদ্ভুত উটের পিঠে। ভাল ভাল কথা বলে লাভ কি? এসব আলোচনার কোন ফলাফল আশা করেনা রাজনীতি সচেতন মানুষেরা।

দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রভাব বাড়তে শুরু করে সেই পাকিস্তান আমল থেকে। দেশভাগের পর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা পাকিস্তানের উপর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার শুরু করে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাসী আমেরিকা এখানে ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ণ শুরু করলে পাকিস্তানে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় সাময়িক ছেদ পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। বঙ্গবন্ধুর সরকার সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির দিকে চলা শুরু করে। এ ব্যাবস্থা মেনে নেওয়া কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না আমেরিকানদের পক্ষে। ঘটানো হয় স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড। হত্যাকারীরা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি বাতিল করে চালু করে পশ্চিমাদের লুটপাটেরনীতি, তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি। মুক্তবাজার বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোন দেশে এই মুক্তবাজারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। লাইসেন্স, পারমিট, কোটা, ইত্যাদি দিয়ে সারা পৃথিবীতে মুক্তবাজারকে বন্ধীবাজার করে রাখা হয়েছে। মুক্তবাজারের অস্তিত্ব আছে শুধু ধনী আর তাদের কেনা শুষিল সমাজ ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতায়। বন্ধীবাজার অর্থনীতির ফলাফল হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুরোটাই পুঁজিপতিদের পকেটে যাওয়া। ৯০% সাধারণ মানুষ খেটে খেটে অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও তার প্রবৃদ্ধির ভাগ পায় না। পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা দিন দিন শুধু সম্পদের পাহাড় বাড়িয়ে চলে।

এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিপতিরা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে অনন্তকাল ধরে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক চাওয়াটা পাওয়ার জন্য রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরী। রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। রাজনৈতিক নেতারা সংসদে বসে আইন পাশ করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেন। এই নীতি পরিবর্তনের উপর ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে অর্জিত সম্পদ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সম্পদ আহরণের পথ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। নীতি নিয়ন্ত্রণের কাজ পুঁজিপতিরা দুইভাবে করেন। এক, মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে টাকা ঢেলে; দুই, নিজেরাই সরাসরি নেতা বনে গিয়ে। অর্থাৎ কোন একটা দল থেকে মনোনয়ণ, স্থানীয় নেতা-কর্মি, এবং ভোট কিনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যাওয়া। মিডিয়া এবং রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে টাকা ঢেলে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা কঠিন। নিজে নেতা হয়ে যেতে পারলে রাষ্ট্রীয় নীতি অনেক সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় আবার উপরি হিসেবে বড় বড় রাষ্ট্রীয় ব্যবসাও হাতিয়ে নেয়া যায়।

দেশে আরেক ধরণের ব্যবসায়ী নেতা আছে যারা আসলে না নেতা, না ব্যবসায়ী। এদের কোন রাজনৈতিক চেতনা নেই। এরা এক রকমের ক্ষমতার দালাল। স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাস চালনায় এরা দক্ষ। সন্ত্রাসী দক্ষতার কারণে দূর্বিত্যায়িত রাজনীতিতে এদের উপযোগিতা অনস্বীকার্য। সন্ত্রাস দিয়ে যারা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এরা তাদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হতে হতে অনেক অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যায়। এক সময় নিজেরাই অনেক রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও এরা ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে, এরা আসলে ব্যবসায়ী নয়; এরা সন্ত্রাসী, এরা লুটেরা।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির আলোচ্য বক্তব্য প্রদানের পর দ্যা ডেইলি স্টার জানিয়েছে ২০০৮ সালের সংসদে ব্যবসায়ী ছিল ৬৩%। ২০১৪ সালের সংসদে কতজন ব্যবসায়ী আছেন তা পত্রিকাটি জানাতে পারেনি। তবে নিশ্চয়ই তা ৬৩ শতাংশের কম নয়। কৃষক, শ্রমিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের সংখ্যা বিবেচনা করে নিশ্চিন্তে বলা যায় দেশে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ৬৩ শতাংশ লোকের সংসদে থাকার দরকার নেই। ব্যাবসায়ী কাম নেতাদের কোন রাজনৈতিক লক্ষ নেই, অর্থাৎ এদের জনকল্যাণের ভাবনা নেই। এদের একটাই নীতি – পকেট নীতি। উপরোক্ত তিন প্রকার ব্যবসায়ীর কোন প্রকার দিয়েই রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশিত রাজনীতি পাওয়া সম্ভব নয়। সরকার পরিচালনা এবং আইন প্রণয়ন করার কাজ থেকে এদের বিযুক্ত করতে না পারলে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে না। রাজনীতি থেকে ব্যবসায়ীদের বিযুক্ত করার জন্য সুস্থ রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার লোকদের এগিয়ে আসতে হবে। সকলকে যার যার জায়গা থেকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে হবে, রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলো থেকে অপশক্তিগুলো দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।