ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

বাঙালির বহুকালের স্বপ্ন ‘পদ্মা সেতু’ বাস্তবায়ণের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী মূল কাজের উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শরীয়তপুরের জাজিরায় নদী শাসন এবং মাওয়ায় সেতুর সার্ভিস পাইল উদ্বোধন করেন। আর মাত্র তিন বছরের মধ্যে সড়ক পথে যুক্ত হবে দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের ৫ কোটি মানুষ। সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে সড়ক পথে যোগাযোগের জন্য এক-চতুর্থাংশ সময় বেঁচে যাবে; পর্যটন বাড়বে; সেতু দিয়ে পারাপার হবে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং অপটিক ফাইবারের মাধ্যমে যাবে ইন্টারনেট; এই সেতু এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হওয়ায় বাড়বে আঞ্চলিক যোগাযোগ; ২৯% শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে নির্মাণ শিল্পে, ৯.৫% কৃষিতে, ৮% শিল্প উৎপাদনে; জাতীয় আয় বাড়বে ১.২%; দারিদ্র কমবে ১%।

পদ্মা সেতু নিয়ে বহু রাজনীতি হয়েছে। রাজনীতি করে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ণ নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এর নির্মানের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। পরবর্তী জামায়াত-বিএনপি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পদ্মা সেতুর জন্য কোন কাজ তাঁরা করেননি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে আবার কাজ শুরু করলে জামায়াত-বিএনপি এবং তাদের দোসর শুষিল সমাজ তা নস্যাতের জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামে। তাদের এ চক্রান্তে সহযোগী হয়েছিল মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ। কাল্পনিক দূর্ণীতির অভিযোগ এনে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রয়োগ করে বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপান সরকার এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংককে দিয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তির বরখেলাফ করিয়ে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়া হয়। জামায়াত-বিএনপি’র পক্ষে আন্তর্জাতিক চক্রান্তে জড়িতদের মধ্যে সর্বাগ্রে আসে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী ডঃ মুহম্মদ ইউনুসের নাম। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে পদ্মা সেতুর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার জন্য ডঃ মুহম্মদ ইউনুসকে অভুযুক্ত করেছেন। সুশীল  সমাজের পুরোধা ডঃ কামাল হোসেন থেকে শুরু করে সমগ্র শুষিল সমাজ এই চক্রান্তের অংশ ছিলেন বলে সামাজিক আলোচনা রয়েছে।

সুশীল ডঃ ইউনুস এবং সুশীল ডঃ কামালের এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য পাওয়া না গেলেও পদ্মা সেতু প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাহারের পক্ষে তাদের অনুচরেরা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন গণমাধ্যম। সুশীল গণমাধ্যম সেসব বক্তব্য, মন্তব্য প্রচার করেছে বেশুমার। উদ্দেশ্য পদ্মা সেতু বাস্তবায়ণ হতে না দেয়া। পদ্মা সেতু তৈরী হলে আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়ে যাবে, শক্তি পাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যা কোন ভাবেই হতে দিতে চাইছিল না জামায়াত-বিএনপি এবং তাদের দোসর ‘জাতীয়তাবাদী নিরপেক্ষ দল’ ওরফে ‘শুষিল সমাজ’।

ঋণদাতাদের ঋণদানে বাঁধা দিয়েই তারা থামেননি। সরকার যখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার ঘোষণা করল তখনো সুশীলেরা বাঁধা দিয়েছেন পর্বত প্রমাণ। ২৯ জুলাই ২০১২ তারিখে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনার আয়োজন করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মান রুখে দিতে চায় সুশীল সমাজ। সেখানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুশীল ডঃ আকবর আলী খান, সুশীল এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম, সুশীল ব্যাংকার মামুন রশিদ, সুশীল নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত এবং বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সেমিনারে প্রাক্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুশীল ডঃ আকবর আলী খান বলেছিলেনঃ ১) এই বিশ্বায়ণের যুগে আবেগতাড়িত হয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ণ উচিৎ হবে না। ২) যদি সরকার নিজস্ব অর্থায়নে সেতু বানাতে যায় তবে অনেক বড় সমস্যায় পরবে। ৩) যেখানে অর্থ ব্যাবস্থাপনায় অদক্ষতা রয়েছে সেখানে এত বড় প্রকল্পের জন্য যোগ্য নির্মাতা পাওয়া যাবে না। ৪) বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করলে আমরা চাইলেও নির্মাতারা এখানে আসবেন না। কারণ তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত চাইবে যা দেবার ক্ষমতা সরকারের নেই। ৫) যোগ্য নির্মাতা নিয়োগ করা না গেলে ৩ বছরের কাজ শেষ করতে ১০ বছর লাগবে। ৬) এত বড় প্রকল্পে অর্থায়ণের ক্ষমতা সরকারের নেই, দশগুণ বেশি সুদ দিয়ে এই সেতুতে অর্থায়ন করতে হবে।

একই সেমিনারে প্রাক্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুশীল এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেছিলেনঃ ১) দুর্ণীতি মুক্ত এবং স্বচ্ছ পরিচালনা পদ্ধতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিকল্প খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। ২) বিকল্প খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলে সেতু নির্মাণ ব্যয় বহুগুণ বেশি হবে। ৩) এক্ষেত্রে সেতুর মালিকানা বেসরকারি খাতে যাবে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিজ স্বার্থে টোল আদায় করবে যার ফলশ্রুতিতে দুর্ভোগ পোহাতে হবে সাধারণ জনগণকে।

বিএনপি নেতা এবং প্রাক্তন মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একই সেমিনারে বলেছিলেনঃ নিজস্ব তহবিল থেকে সেতু নির্মাণের ফলাফল ভয়াবহ হবে। যেমনটা হয়েছে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের ক্ষেত্রে।

সুশীল ডঃ আকবর আলী খান, সুশীল এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা আমির খসরু সাহেবদের কোন কথাই সঠিক ছিলনা – আজ তিন বছর পরে তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সরকার বাস্তবতা অনুধাবন করে কোটি মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে, দেশের এবং আঞ্চলিক সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মান কাজ শুরু করেছিল। বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য ঋণদাতারা অর্থায়ণ বন্ধ করে দিলে সরকার প্রথমে বিকল্প পন্থায় চিন এবং মালয়শিয়ার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করেছিল। তারা এগিয়েও এসেছিলেন। কিন্তু সে এগিয়ে আসা বন্ধুর বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ানো ছিল না। তারা সুযোগ সন্ধানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অনেক বেশি খরচে পদ্মা সেতু নির্মান প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ সে ফাঁদে পা দেয়নি; আভ্যন্তরীণ শক্তির উপর নির্ভর করেছে।

সুশীল অর্থনীতিবিদেরা বলেছিলেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বানালে বৈদেশিক মুদ্রার উপর অনেক চাপ পড়বে, প্রয়োজনীয় আমদানি করা সম্ভব হবেনা, অর্থনীতি মুখথুবড়ে পড়বে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এর কোন কিছুই ঘটেনি। নির্মান খরচ বাবদ এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা প্রদান করা হয়েছে যা ডলারে প্রায় ২ বিলিয়ন। এই বিপুল অর্থ পরিশোধ করার পরেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়েনি বরং ২০১২ সালের তুলনায় তা অনেক বেড়েছে। সুশীল অর্থনীতিবিদেরা এসব কথা হয় অজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন, নয় তাঁরা অর্থনৈতিক পরামর্শ হিসেবে নয় – জামায়াত-বিএনপি’র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ণের জন্য বলেছিলেন।

সুশীল ডঃ আকবর আলী খান এবং সুশীল এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম নিজেদের কর্ম জীবনে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ সচিবের পদ অলংকৃত করেছেন। তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতি নিজ হাতে পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছেন। এমন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যাক্তিগণ অজ্ঞতা থেকে ২০১২ সালে পদ্মা সেতুতে নিজস্ব অর্থায়ণের বিরোধিতা করেছেন এমনটা মেনে নেয়া কঠিন। বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালে জামায়াত-বিএনপি যে সহিংস রাজনীতি করেছে সে রাজনীতির পক্ষে কথা বলতে দেখা গেছে এই দুই প্রাক্তন অর্থ সচিবকে। এখান থেকে এই ভাবনা জোড়াল হয় যে তাঁরা স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ণের স্বার্থে পদ্মা সেতুতে নিজস্ব অর্থায়নের বিরোধিতা করেছিলেন। চক্রান্তকারীদের সকল চত্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে শুরু হয়ে গেছে পদ্মা সেতুর মূল পর্বের কাজ। আর কিছু কালের মধ্যেই নির্মান হবে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সেতু; স্থাপন হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক সংযোগ। বেড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস; নিজেদের টাকায় নিজেদের সেতু গড়ার অন্যন্য গৌরব।