ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহনীর দ্বারা সংগঠিত গণহত্যা এবং নির্যাতন অস্বীকার করে পাকিস্তান তার অনুসারীদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে ফিরে পাবার পরিকল্পনা তাদের এখনো আগের মতই বলবৎ আছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজনৈতিক ফ্রন্টে খুনি মোস্তাক এবং সামরিক ফ্রন্টে জেনারেল জিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধের ইতি টানতে চেয়েছিলেন। সে লক্ষে ভারতে মোস্তাক পাকিস্তানী এবং মার্কিণ দূতাবাসের সঙ্গে দেনদরবার করে ওয়াশিংটন রওনা হয়েছিলেন সে কথা নিজ মুখে ওয়াশিংটন গিয়ে মার্কিন নেতাদের বলতে। তাজউদ্দীন সরকার একথা জানার পর তাকে কোলকাতায় একরকম গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জেনারেল জিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অধীনে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এ বিষয় নিয়ে নয় জন সেক্টর কমান্ডার এবং মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর বৈঠকে একমাত্র জেনারেল জিয়া প্রবাসী সরকারের অধীনে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান। এই বিরুদ্ধাচারের শাস্তি হিসেবে ওসমানী জিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন। জেনারেল জিয়ার সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানের চর হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে রাষ্ট্র ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করে তিনি গোলাম আযমসহ বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া বহু স্বাধীনতা বিরোধীকে দেশে ফিরিয়ে এনে সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসিয়েছেন। একজনকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত করেছেন। দালাল আইন বাতিল করে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারাধীন ১১ হাজার রাজাকার, আলবদর, আলশামসকে মুক্তি দিয়ে পরবর্তীতে তাদের নিয়ে রাজনৈতিক দল খুলেছেন।

পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের চেষ্টা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আবারো মাথা চাড়া দিয়েছিল। সে চেষ্টা এখনো চলছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংগঠিত গণহত্যাকে অস্বীকার করে পাকিস্তান সেই পুরনো কনফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র বা বাংলাস্তানের স্বপ্ন উজ্জীবিত রাখতে চায়। এসব কথা শুনে এদেশের পাকিস্তানী প্রেতাত্মারা অনুপ্রাণিত হয়। তাদের বাংলাস্তানের স্বপ্ন রঙিন হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারদের স্ত্রীগণের মত স্বামীর সঙ্গে রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধসঙ্গী না হয়ে জেনারেল জিয়া পত্নী সেনানিবাসে পাকিস্তানী জেনারেলদের সঙ্গে বসবাস করে তখনই প্রমাণ করেছিলেন বাঙালি নয় পাকি জেনারেলরাই তার কাছে অধিকতর পছন্দনীয়। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সব রকমের কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ করে একাত্তরের সঙ্গী পাকি জেনারেল জুনেজোর মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠিয়ে বেগম জিয়া আরেক বার প্রমাণ দিয়েছিলেন তার পাকপ্রেমের।

এহেন পাকপ্রেমী বেগম জিয়া পাকিস্তান সরকারের একাত্তরের গণহত্যা অস্বীকার করার সঙ্গে সুর মিলিয়ে; রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে গলা তুলে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত একাত্তরের শহীদের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তুলবেন তাতে অবাক হওয়ার কি আছে? বেগম জিয়া এবং অন্যান্য স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষে যুদ্ধাপরাধী বিচার চলাকালীন এসব কথা বলে জঙ্গিদের উত্তপ্ত করে হাঙ্গামা বাধানোর চেষ্টা করা তার পক্ষে খুবই স্বাভাবিক।

এখন দরকার হচ্ছে একাত্তরের পরাজিত শক্তির ইতিহাস বিকৃতির সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া। আর সে জন্য চাই ইউরোপের ‘হলোকাষ্ট ডিনায়েল আইন’ এর মত একটা আইন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজী বাহিনীর গণহত্যা এবং বর্বর নির্যাতনের বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের শাস্তি প্রদানের বিধান করে গণহত্যার শিকার ১৪টি ইউরোপীয় দেশ হলোকাষ্ট ডিনায়েল আইন করেছ। এই আইন করার পর বন্ধ হয়েছে নাজী বাহিনীর মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি। বাংলাদেশেও দরকার এ রকম একটি আইন। যে আইন মুক্তিযুদ্ধের সর্বজন স্বীকৃত ইতিহাস নিয়ে বিরোধিতাকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করবে। যে আইন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রক্ষা করবে; শহীদের রক্তের আর বিরঙ্গনার আত্মত্যাগের মর্যাদা দেবে।