ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ডেইলি স্টার জামায়াতকে একাত্তরের ভুলের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করার পরামর্শ দিয়েছে ৮ জানুয়ারির সম্পাদকীয়তে। নিজামীর ফাঁসির আদেশ বহাল থাকার প্রতিবাদে জামায়াতের ডাকা হরতালের সমালোচনা করে পত্রিকাটি বলেছেঃ জামায়াতের উচিৎ আদালতের রায় মেনে নেয়া এবং একাত্তরের নৃশংস যুদ্ধাপরাধের জন্য জনগণের কাছে আন্তরিক ক্ষমা চাওয়া; যুদ্ধাপরাধের বিচার জামায়তের জন্য ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে; তাদের উচিৎ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মূল নীতিগুলোকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া; একাজ যত দ্রুত তারা করবে ততই তাদের মঙ্গল।

জামায়াতের মঙ্গল চিন্তায় ডেইলি স্টার এত চিন্তিত কেন? জামায়াত যদি একাত্তরের নৃশংস গণহত্যার জন্য ক্ষমা না চায় এবং তার জন্য যদি জামায়াতের ক্ষতি হয় তাতে ডেইলি স্টারের অসুবিধা কি? বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাধীনচেতা, ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মানুষ যেখানে জামায়াতের ধ্বংস কামনা করে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবী করে তখন ডেইলি স্টার জামায়াতকে সদুপদেশ দেয় কেন? কে কার মঙ্গল কামনা করে? অবশ্যই মানুষ প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা করে; প্রিয়জনের মঙ্গলের জন্য চিন্তিত থাকে। ডেইলি স্টার যখন জামায়াতের মঙ্গল নিয়ে চিন্তিত এবং জামায়াতকে সদুপদেশ দিচ্ছে তখন এটা বুঝে নিতে হয় যে ডেইলি স্টার জামায়াতের প্রিয়জন।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখেছি ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো বাংলাদেশ রাজনীতিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে কথা বলে। মার্কিনিরা যখন যে দিকে কথা বলে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো সেদিকে হাওয়া দেয়। স্বাধীনতার শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সব সময়েই সৌদি আরব, পাকিস্তানের সঙ্গে জোট বেঁধে জামায়াত-বিএনপি’র পক্ষে থাকে। তাদের এই রাজনৈতিক ঐক্যের জন্য জনসমর্থন তৈরী করার মহান দ্বায়িত্ব পালন করে এই পত্রিকা দুটি। আমেরিকানরা মধ্যযুগীয় মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসী এবং যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতকে “মডারেট মুসলিম” তকমা লাগিয়ে রাজনীতি করার বৈধতা দেয়। বিনিময়ে বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় সব সময় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাকে জামায়াত এবং তাদের ঔরসজাত বিএনপি। এ কথার যথার্থ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ২০০১ সালে জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার গঠনের সপ্তাখানেকের মধ্যে। তৎকালীন জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বলেছিলেন, “মাটির নিচে সম্পদ রেখে লাভ কি”? আমেরিকান তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর দাবী অনুযায়ী দেশের তেল-গ্যাস বিদেশে রফতানী করার সুযোগ তৈরী করে দেয়ার জন্যই তিনি এ কথা বলেছিলেন। জামায়াত-বিএনপি জোটের সে উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছিল সেসময়ের বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যে। হাসিনা বলেছিলেন, “আগামী ৫০ বছরের জন্য প্রয়োজনীয় তেল-গ্যাস না রেখে এক ফোঁটাও রফতানী করা যাবে না”।

জামায়াত-বিএনপি এভাবেই বিভিন্ন সময়ে দেশের সম্পদ আমেরিকানদের হাতে তুলে দিয়েছে শুধু নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। তারা মনে করে পশ্চিমাদের সমর্থন ব্যতীত বাংলাদেশের ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। এ কথার প্রমাণ বেগম জিয়া ২০১৩ সালে দিয়েছেন মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন টাইমসে নিবন্ধ লিখে। সে নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমেরিকানদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আহবান জানিয়েছেন। একটি স্বাধীন দেশের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী কতটা ক্ষমতালিপ্সু হলে আরেকটি দেশকে আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আহবান জানাতে পারে? জামায়াত কতটা মার্কিন প্রভুদের মুখাপেখী তার প্রমাণ তারা রেখেছে ৩২০ কোটি টাকা দিয়ে লবিষ্ট নিয়োগ করে মার্কিন প্রশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল বন্ধ করার জন্য। দাসদের অনুরোধ প্রভু ফেলতে পারেনি। আমেরিকা বিশেষ দূত নিয়োগ করে ট্রাইবুন্যালের সম্পর্কে দেশি এবং বিদেশি মিডিয়ায় নেতিবাচক কথা বলে ট্রাইবুন্যালকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা থেকে বাংলাদেশ সরকারকে বিরত থাকার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ফোন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। জন কেরির মুখের উপর না বলে দিয়ে বাংলাদেশ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার স্বাধ মিটিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশ্ববাসীকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেনঃ পশ্চিমাদের সমর্থন ছাড়াই বাংলাদেশের ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়।

একাত্তরে গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হওয়া এবং ধর্ষনের দায়ে একে একে জামায়াতের সব শীর্ষ নেতা ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পরার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির অস্তিত্ব সঙ্কট ধাপে ধাপে সপ্তমে উঠছে। ট্রাইবুন্যাল এবং আপীল বিভাগ বিভিন্ন রায়ে জামায়াতকে সন্ত্রাসী এবং যুদ্ধাপরাধী সংগঠন বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার করার জন্য সংশোধন করা হয়েছে প্রয়োজনীয় আইন সমূহের। সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবী সম্বলিত আপিল। কিছুদিন পর পর বিভিন্ন ব্যাক্তি এবং সংগঠন বিভিন্ন ইস্যুতে জাম্যাতকে নিষিদ্ধ করার দাবী জানাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতকে সদুপদেশ দেয়ার মানে কি সংগঠনটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনুকূল আবহ সৃষ্টি করা? পাকিস্তান আমলের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ২২ পরিবারের এক পরিবারের সন্তান এবং পাকিস্তান সমর্থিত আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা অনুপ চেটিয়ার পরমাত্মীয় লতিফুর রহমানের মালিকানাধীন ডেইলি স্টার জামায়াতকে রক্ষা করার জন্য শেষ চেষ্টা করবে তা দেখে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।