ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

টার্গেট কিলিং শুরু হওয়ার সময় আমরা অনেকেই বলেছি – এসব করছে জামায়াত-বিএনপি’র নিয়োগ করা লোকেরা। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম যে টার্গেটেরা সকলেই প্রগতিশীল এবং জামায়াত-বিএনপি’র ভোট ব্যাংকের বাইরের মানুষ। এদের হত্যা করলে আইএস-তালেবানী জোশ উস্কে দেয়া যায়; হেজাবি (হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি) সম্প্রদায় চাঙ্গা হয়; সাম্রাজ্যবাদী বন্ধুরা মাতব্বরি দেখানোর সুযোগ পায়; আন্দুলনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা যায়; বাকশালী সরকারকে হটিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করার সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলা যায়; বাড়তি প্রত্যাশা – যদি এই চান্সে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট আমির, ওমরাহগণকে মুক্ত আকাশের নিচে নিয়ে আশা যায়। টার্গেট কিলিং বহুভাবেই হেজাবিদের উদ্দেশ্য পূরণের উপায় নির্দেশ করে। বিশেষ করে যেখানে প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধ লাগানোর ঘোষণা দিয়েও সে যুদ্ধ সর্বাত্বক পর্যায়ে নেয়া যায়নি; পেট্রোল বোমা অধ্যায়কেও যুদ্ধ পর্যায়ে উন্নীত করা যায়নি। উল্টো পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে আমির, ওমরাহগণের জন্য শোক প্রকাশ করতে একটা পেট্রোল বোমা হরতাল পর্যন্ত তারা করতে পারছে না। তাহলে এই বিরাট জঙ্গিবাহিনী দিয়ে তারা করবেটা কি? ৩৪ বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে পাহাড়ে, জঙ্গলে প্রশিক্ষণ দিয়ে যে বিশাল বাহিনী বানানো হল তাদের কাছ থেকে এর হোতারা কিছুই পাচ্ছে না। টার্গেট কিলিং করিয়ে এদের কাছ থেকে কিছু সার্ভিস আদায় করা সম্ভব। সুতরাং তাই হোক।

সরকার আমাদের কথায় কান না দিয়ে উল্টো হেফাজতের সঙ্গে ব্যালেন্স করতে গেছে যাতে তারা জামায়াতের সঙ্গে না থাকে। জামায়াত থেকে তারা এখন দূরে আছে ঠিক, কিন্তু সুযোগ পেলেই আগুন-টাগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ প্রচার করছে যার প্রকাশ দেখা গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, নারায়ণগঞ্জে। হেফাজত জামায়াত-বিএনপি থেকে দূরে সরে গেলেও জামায়াতী সন্ত্রাস কমেনি। পরবর্তীতে টার্গেট কিলিং বেড়ে গেলে সরকার প্রগতিশীল লেখকদের শাসালেন, উল্টাপাল্টা লিখলে তার দ্বায়িত্ব নেবে না বলে জানিয়ে দিলেন। যদিও এর পরের কথাটা ছিল “ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না’, এ কথা ভালভাবে প্রচার হয়নি। বেশি প্রচার হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রথম অংশ। প্রথম অংশ বেশি প্রচার হওয়ায় কি গুপ্ত হত্যা খানিকটা হলেও উৎসাহিত হয়নি, এতে কি অসাম্প্রদায়িক মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়েনি? জঙ্গিদের প্রতি চরম অবস্থান না নেয়ার একটা প্রবণতা সরকারের মধ্যে দেখা গিয়েছিল। সরকার নরম অবস্থানে থেকে মৌলবাদীদের না খেপিয়ে জঙ্গিদের মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছে। এটা একটা ভুল এবং অকার্যকর কৌশল ছিল। সরকারের এই কৌশল কাজে আসেনি। জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত, প্রশিক্ষিত জঙ্গিদের সঙ্গে কোন রকমের নরম অবস্থান গ্রহণের সুযোগ নেই। ‘১৩ এবং ‘১৫ সালের মত এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানই হচ্ছে জঙ্গি দমনের কার্যকর উপায়।

পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতু হত্যার পর নড়ে-চড়ে উঠেছে সরকার। শুরু করেছে জঙ্গি দমনে সাঁড়াশি অভিযান। সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি বলতে শুরু করেছে, ‘সাঁড়াশি অভিযানে’র নামে সরকারবিরোধীদের দমন শুরু হয়েছে। এ কথার মাধ্যমে বিএনপি বস্তুত এই অভিযানকে নস্যাৎ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিএনপি’র সঙ্গে প্রথমে সুর মেলাবে তথাকথিত সুশীল সমাজ, তারপর তাদের বিদেশী প্রভুরা। এদের এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান ব্যর্থ করে দেয়া যাতে জঙ্গি দমন করে টার্গেট কিলিং বন্ধ করা না যায়। টার্গেট কিলিং বন্ধ হয়ে গেলে জামায়াত-বিএনপি স্বাধীনতা বিরোধী চক্র রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত থাকবে। সমর্থকদের চাঙ্গা রাখার জন্য আপাদত আর কোন বিষয় থাকবে না। ফলে দিন দিন তারা রাজনীতির প্রধান গতিধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসতে হলে জামায়াতকে ছাড়তে হবে; জামায়াতকে ছাড়তে হলে আগে ছাড়তে হবে জামায়াতের প্রধান সংযোগস্থল, তারেক রহমানকে; পেট্রোল বোমা রাজনীতির জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এর কোনটাই বিএনপি’র পক্ষে এই সময়ে সম্ভব নয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যতই তাগাদা দিক না কেন জামায়াতের সঙ্গ ছাড়া বিএনপি’র পক্ষে সম্ভব নয়। সন্তান যেমন পিতাকে অস্বীকার করতে পারেনা, বিএনপিও তেমনি জামায়াতকে অস্বীকার করতে পারে না; বিএনপি ধ্বংস হয়ে গেলেও না।

ইউরোপ এবং আমেরিকার চাপে এতদিন জামায়াত নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণে দ্বিধা করেছে সরকার। ‘১৩ সালে সংগঠিত জামায়াত-বিএনপি’র ব্যাপক ধ্বংস, হত্যা দেখার পর থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছে। জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরু করার পর আবারো তারা সে পরামর্শ মনে করিয়ে দিয়েছে। এর মানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জানে টার্গেট কিলিং এর পেছনে জামায়াত আছে। বিএনপিকে জামায়াত মুক্ত করে বিএনপি’র একটা ক্লিন ইমেজ তৈরী করে তাকে রাজনৈতিক বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ইউরোপ জামায়াতের পেছন থেকে সরে গেলেও এখনো তাদের সঙ্গে রয়েছে আমেরিকা, ইসরাইল, পাকিস্তান। ইউরোপের সরে যাওয়া এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমেরিকাও আর বেশিদিন জামায়াতকে প্রশ্রয় দেবার সুযোগ পাবে না। জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। যত শীগ্র সরকার এই ব্যবস্থা নেবে তত দ্রুত মনোবল ভেঙ্গে যাবে জঙ্গিদের। মনোবল ভেঙ্গে গেলে তাদের দমন করা অনেক সহজ হয়। জঙ্গি দমন সরকারের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে দেরী হলে ম্লান হয়ে যাবে সরকারের সকল অর্জন।