ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

২০১৩ থেকে ১৫ সাল সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার্থে দেশে যে পরিমাণ জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড, অগ্নিসন্ত্রাস করে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয়েছিল তাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভরসা হারিয়ে ফেলেছিল। এ সময়ে নতুন বিনিয়োগ করে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরিয়েছে প্রধানত সরকার।

অবকাঠামোতে ক্রমাগত সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতির চাকা শুধু চালুই থাকেনি, বছর বছর বৃদ্ধি পেয়েছে প্রবৃদ্ধির হার যা গত অর্থবছরে ৭.২৮% এ দাঁড়ায়। চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৭.৫% হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা ৭.৮% নির্ধারণ করার কথা ভাবছে সরকার।

দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের রক্ষণশীল আচরণ বদলে যেতে থাকে ২০১৬ সাল থেকে। জঙ্গিদের এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ক্রমাগত দমনে তারা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যক্ষ করে; বাড়তে থাকে বিনিয়োগ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অলস টাকা বিনিয়োগ হতে হতে ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ তা ফুরিয়ে যায়।

এ বছরের শুরু থেকে সৃষ্টি হয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট। এ সঙ্কট আরও ঘনীভূত করে ফার্মারস ব্যাংক কেলেংকারি। ফার্মারস ব্যাংক সরকারি দফতরের গচ্ছিত টাকা সময়মত ফেরত দিতে না পারায় সরকারি অন্যান্য দফতরও ঢালাও ভাবে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করে। এতে তারল্য সঙ্কট আরও বেড়ে যায়। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে ঋণের সুদের উপর। ৮-৯% থেকে ঋণের সুদের হার উঠে যায় ১২-১৩%। মার্চের মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রী উচ্চ ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার নির্দেশ দেন।

বেসরকারি খাতে তারল্যের সঙ্কট বাড়লেও অলস টাকা পড়ে আছে সরকারি ব্যাংকগুলোতে। এর কিছু অংশ বেসরকারি খাতে প্রবাহ করতে উদ্যোগী হন অর্থমন্ত্রী। গত শুক্রবার তিনি ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি দফতরগুলোর আমানত রাখার হার বাড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। এখন সরকারি দফতরগুলো বেসরকারি ব্যাংকে তাদের তহবিলের ৫০% পর্যন্ত রাখতে পারবে যা ছিল ২৫%।

বাংলাদেশ ব্যাংক কমিয়েছে বাধ্যতামুলক নগদ জমার পরিমাণ (সিআরআর)। এতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নতুন করে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রবাহিত হবে। দূর হবে তারল্য সঙ্কট। ঋণের সুদের হার আগামি এক মাসের মধ্যে ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী।

বেসরকারি ব্যাংকের তারল্য সংকট দূর করার প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন সুশীল অর্থনীতিবিদগণ। এদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, সালেহ উদ্দিন আহমেদ; বিশ্ব ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ হাজিদ হোসেন; এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ। এরা বলছেন, সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া পদক্ষেপগুলোর ফলে দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে। কেন বা কিভাবে তা বাড়বে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা তারা গণমাধ্যমে দেননি। তারা শুধু বলেছেন মূদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ মূদ্রাস্ফীতি তখনই বাড়ায় যখন বাজারের পক্ষে বাড়তি অর্থ উৎপাদনমূখী কোন খাতে বিনিয়োগ না হয়ে তা যদি শুধু সীমিত সরবরাহের ভোগ্যপণ্য এবং বিলাস দ্রব্যে ব্যয় করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছরে বদলে গেছে অনেকখানি। ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অনেক অবকাঠামো তৈরি হওয়ায় নতুন বিনিয়োগের চাহিদা বেড়েছে।

সামান্য বেসরকারি এবং ব্যাপক সরকারি বিনিয়োগ উৎপাদনমূখী বিনিয়োগ ক্ষুধা মেটাতে পারছিল না। দরকার ছিল প্রচুর দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ। ২০১৩ – ২০১৫ সালে জঙ্গিবাদী অগ্নিসন্ত্রাস না হলে দেশে দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ হত আরও অনেক বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮% ছাড়িয়ে যেত।

তবে গত দু’বছরে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে অনেকখানি। এমন পরিস্থিতিতে মূদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবার কারণ দেখি না।