ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

“দেশের মুক্তি-সংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না? ইতিহাসে অনেক উদাহরণ আছে, রাজপুত রমণীরা অসীম সাহসের সহিত রণাঙ্গনে যুদ্ধ করিতেন এবং স্বদেশের স্বাধীনতা ও নারীত্বের মর্যাদা রক্ষার জন্য শত্রুর প্রাণ-সংহার করিতে কিছুমাত্র দ্বিধা-বোধ করিতেন না।”

“…..সশস্ত্র বিদ্রোহে অন্য দেশের বহু নারী যোগদান করিয়াছে, তবে কেন ভারতীয় নারীরা বিপ্লবের এই পন্থাকে অন্যায় বলিয়া মনে করিবে? নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়াছে যে, আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করিবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সশস্ত্র বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন- এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।”

এমনি এক পণ করেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সৈনিক প্রীতিলতা প্রথম বাঙ্গালী নারী হিসেবে আত্মাহূতি দেন।

 

215px-Original_Archived_photo_of_Pritilata_Waddedar

তার এ আত্মত্যাগ শুধু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকেই বেগবান করেনি বরং এটাই ছিল রাজনীতিতে বাংলার নারী সমাজের জাগরণের সূচনা। এরপর ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ- সর্বক্ষেত্রে গোপনে ও প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়েছেন নারীরা।

আজ আমরা স্বাধীন দেশে নিজস্ব পতাকা তলে বসবাস করছি। প্রীতিলতার স্বপ্ন ‘দেশের মুক্তি’ সফল হয়েছে। নারীরা আজ রাজনীতিতে সক্রিয়। রাষ্ট্র প্রধান, দলীয় প্রধান হচ্ছে নারী। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, সন্ত্রাস দুর্নীতিকে মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে চলেছেন। হয়তো এরকম কিছু একটাই স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রীতিলতা। শিক্ষায়, সম্মানে, অর্থ-বিত্তে বাহ্যিক দিক দিয়ে নারী স্বাধীনতা আসলেও মূলত নারী আজও শৃঙ্খলিত। নারী শৃঙ্খলিত তার নিজ কারণে। নারী এতটা ক্ষমতা পাওয়ার পরেও তারা নিজ দোষে তা হারাচ্ছে। মানবাধিকার প্রশ্নে নারী পুরুষের সমান অধিকার আদায়ে আজও সংগ্রাম আন্দোলন চলছে। কোটিপতি থেকে রাস্তার ফকিরের ঘরেও প্রতিটি রাতে নিভৃতে কাঁদে আমদের নারী সমাজ এবং তা সবচেয়ে বেশি সয়ে যায় উচ্চবিত্ত ঘরের নারীরা। যে নারী কর্মী নারী-অধিকারের জন্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ঘরে ফেরার পর তিনিও ওই একই নির্যাতনের শিকার হন।

এই সমস্যা সমাধানের একটাই উপায়, আর তা হল- নিজের অধিকারের প্রতি নিজেকে সজাগ হওয়া। মুখের উপর তার সঙ্গীকে মনে করিয়ে দেয়া ‘আমিও সমাজের অর্ধাঙ্গি’।

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে একটাই চাওয়া সকল নারীরা হয়ে উঠুক সংগ্রামী, প্রতিবাদী, দৃঢ়চেতা, দীপ্ত মনের এবং স্বাধীনচেতায় উদ্ভূদ্ধ হয়ে সমাজ গড়ার সমান হাতিয়ার হয়ে গর্জে উঠুক আমাদের নারী সমাজ।