ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

মা শব্দটি প্রতিটি মানুষের কাছেই একটি মর্মস্পর্শী শব্দ। এর মধ্যে একাধারে আছে আবেগ, ভালোবাসা ও অগাধ অন্তর্নিহিত শক্তি। মা এমন একটি শব্দ যার উৎপত্তি মানুষের অন্তরের অন্ত:কুঠিরে। এর সাথে জরিয়ে থাকে প্রতিটি মানুষের অস্তিত্ব। তাই তো পৃথিবীর সকল আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ, তিতিক্ষা এই মাকে নিয়ে। কখনো এই মা জন্মদাত্রী, কখনো মাতৃভূমি আবার কখনোবা মাতৃভাষা।

শুধুমাত্র অস্তিত্ব আর মাতৃভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণেই ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিল শিশু অহি-উল্লাহ, সালাম বরকত সহ সাতটি প্রাণ, নিজের মহামূল্যবান প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল লক্ষ লক্ষ বাঙালি। সেই মাতৃভাষার আন্দোলনের হাত ধরেই ১৯৭১ এ আমরা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতা, মুক্ত করেছিলাম মাতৃভূমিকে। সেদিনের সেই ভাষার আন্দোলন সফল না হলে হয়তো আমরা আজ এই সোনার বাংলায় বজ্রকন্ঠে ’জয়বাংলা’ ধ্বনি তুলতে পারতাম না, প্রাণ ভরে গাইতে পারতাম না ’আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।

মাতৃভাষার প্রতি বাঙালি জাতির প্রেম অতুলনীয়। কিন্তু ৬৫ বছর পর এসেও ভাষার প্রতি ভালোবাসা কতটুকু টিকে আছে, সে হিসাব জরুরি হয়ে পরেছে। ৫২’র সংগ্রামের প্রত্যাশা ছিল অধিকারের প্রশ্নে নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা। তমুদ্দিনমজলিশের ’রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ এর হাত ধরে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের কর্মসূচিতে শোষকগোষ্টীর নির্বিচার গুলিতে ৭ জন শহীদ হন। ২২ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ ও গায়বানা জানাজা হয়, ২৩ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয় শহীদ মিনার। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই শহীদমিনার ভেঙে ফেলে পাকিস্তানি শোষকরা। তাদেরই দেখানো পথে আমরাও কি ভাষা শহীদ ও শহীদমিনারকে লাঞ্ছিত করছি না। কতটুকু শ্রদ্ধা করছি সেই সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার-শফিউল্লাহ-অহিউল্লাহকে।

২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস জানলেও জানিনা, সে দিন বাংলা ফাল্গুন মাসের ৮ তারিখ জাতীয় শহীদ দিবস। ক্রমানুসারে বলতে পারি না নিজ ভাষার বর্ণমালাগুলো। এত সমৃদ্ধ সাহিত্য ভান্ডার থাকা সত্যেও কোনদিন পরে দেখা হয়নি একটি পুরো উপন্যাস, একটি কবিতা গ্রন্থ। জারি, সারি, বাউল, মারফতি গানের নামও শুনিনি অনেকে। যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, ঘেটুগানতো বাৎসরিক “বৈশাখী মেলার জাদুঘরেই” দেখা মেলে। কারন হানি সিং, সানি লিওন, পাওলিদাম নিয়ে ব্যস্ত আমরা। আখতারুজ্জামান আজাদ যথার্থই বলেছেন, ’বাংলা এখন ভুলেই গেছে প্রীতিলতার নাম/ছেলে বুড়ো ঘামটি ঝরায় নাঙ্গা পাওলি দাম/ মন খারাপের দিস্তা নিয়ে/ কোথায় মেঘের পিওন/ বুকের ভেতর লাফায় এখন/ শুধুই সানি লিওন’।

অবস্থা আজ এমন দাড়িয়েছে যে ইংরেজি-হিন্দিমিশ্রিত বাংলায় কথা না বলতে পারলে আমাদের মুখের কথাই বের হয় না। ইদানীং অবাক লাগে যখন দেখি লোকজন বাংলায় গালি দেয়াও ভুলে যাচ্ছে। হিন্দি সিরিয়াল, কার্টুন দেখে দেখে বাচ্চারা বাংলার চেয়ে হিন্দিই বলছে বেশি। ফলে দিন দিন বড় হচ্ছে আর ভুলে যাচ্ছে তাদের মাতৃ ভাষা বাংলা।

যে রেডিও-টিভি বা বাংলা ছায়াছবি, নাটক ভাষা রক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখা কথা ছিল, তারাই বাংলা হিন্দি ইংলিশের সংমিশ্রণে খোলা বাজারে ধর্ষণ করছে প্রাণের বাংলা ভাষাকে। আর ইদানীং আধুনিক গানের নামে তৈরি হচ্ছে কিছু বাংলা রেপ গান। সত্যিই তারা রেপ গানের নামে রেপ(ধর্ষন) করছে বাংলা ভাষাকে। উন্নত শিক্ষার নামে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু নিজ ভাষার ঐশ্বর্য বাড়ানোর জন্য তাদের উদ্ভুদ্ধ তো করছেই না, বরং আরো বিমুখ করছে। পাঠ্যপুস্তকে বাংলা ভুল বানান, বয়সের তুলনায় কঠিন ব্যাকরণের ব্যাবহার শিক্ষার্থীদের আরো বিমুখ করছে বাংলা ভাষা শিক্ষা থেকে। সাধারণ মানুষদের দোষ দিয়ে আর কি লাভ! খোদ বাংলা একাডেমির প্রধানের একটি ফেসবুক পোস্টে ৩২টি বানান ভুল আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষার অবস্থা কতটা নাজুক।

এত কিছুর পরও ১৯৫২’র ভাষা সৈনিকদের মত আজও কিছু ত্যাগী ভাষা প্রেমিলোক বাংলাকে বিশ্ব দরবারে ফুটিয়ে তোলার জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করছেন। যার একটি উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই জাতিসংঘের মত আন্তর্জাতিক সেমিনারে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলায় ভাষণ। পিপীলিকার মত বাংলা সার্চ ইঞ্জিন, অভ্র-বিজয়ের মত কম্পিউটার এবং মোবাইলে বাংলায় লেখার সফটওয়ার ভাষা বিপ্লবের অংশ বলা চলে। এছাড়াও প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরে বাংলা বই মেলা বাংলা লেখক এবং পাঠকদের জন্য বাংলা চর্চার অনেক বড় খোরাক।

মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা রক্ষার দায়িত্ব আজ আমাদের তরুণদের হাতে। কথায় আছে তরুণরা ইতিহাস পড়তে চায় না গড়তে চায়। তাই শুধু ফেব্রুয়ারিতে বাংলার প্রতি অসীম প্রেম, ২১ তারিখ প্রভাতফেরি আর শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে সেলফিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, শহীদ মিনারটি পরিষ্কারেও হাত লাগান। ছোট ভাই-বোন দের অথবা বন্ধুদের আড্ডায় একটা বাংলা বই পড়ে শোনান। প্রিয়জনের সাথে কাটানো আনন্দময় মুহূর্তগুলোতে একটা বাংলা গান শুনুন, তাকে একটি বাংলা বই উপহার দিন কিংবা পরিবার নিয়ে অন্তত মাসে একদিন একটি বাংলা সিনেমা দেখুন। আর এর মাধ্যমেই শুরু করুন বাংলা রক্ষা, বাংলা চর্চার ভবিষ্যৎ আন্দোলন।