ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে খাবারে ভেজাল নতুন কিছু নয়, কিন্তু আমাদের দেশে খাবারে ভেজালের পরিমান দেখে মনে হয় এসব ভেজালকারীরা বদ্ধপরিকর যে কিছুদিনের মধ্যেই তারা দেশের শতভাগ খাবারে ভেজাল পরিপূর্ণ করে গিনেস বুকে নাম উঠাবে! মাছ, মাংস, ডিম, দুধ থেকে শুরু করে শাকসবজি,ফলমূল পর্যন্ত আজ ভেজাল হচ্ছে। যেখানে দেশের ষোল কোটি মানুষের প্রধান খাবার হচ্ছে ভাত, সেই চালের সাথেও মিশানো হচ্ছে ইউরিয়া সার এবং ক্ষতিকারক সাদা রঙ যাতে চাল আরও আকর্ষণীয় এবং সাদা দেখায়। পরে বেশি দামে এসব চাল “মিনিকেট” অথবা “নাজিরশাল” নামে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হচ্ছে।

বছরখানেক আগে পান্থপথে বসুন্ধরা মার্কেটে এক খাবারের দোকানে খেতে গিয়েছিলাম আমার এক বন্ধুর সাথে। হঠাৎ করে কে একজন বলল, যে কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকি মার্কেটের ভিতর মোবাইল কোর্ট আসবে। সাথে সাথে আমরা যে দোকানে বসে ছিলাম সেখানকার কর্মচারীরা দোকান বন্ধ করে হাওয়া হয়ে গেল! পাশাপাশি আরো অনেক দোকানই দেখলাম বন্ধ হয়ে যেতে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি মার্কেটের ভিতরের খাবারের দোকানের যদি এ অবস্থা হয় তবে সাধারন মানুষের খাবারের অবস্থা কেমন হবে?

এবার আসি সাধারন মানুষের কথায়,সেদিন পত্রিকাতে পড়লাম যে , ফুটপাথ থেকে ডাব কিনে খাবার পর একজন লোক সংজ্ঞাহীন হয়ে গেছেন। তার মানে রাসায়নিক পদার্থ সেখানেও পৌঁছে গেছে, কি অদ্ভুত উন্নতি আমাদের দেশের! এছাড়া “একই পরিবারের ৩/৪ জন সদস্যের কাঁঠাল/আম খেয়ে মৃত্যু” জাতীয় খবরগুলোর সাথেও আমরা এখন সবাই কমবেশি পরিচিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে ক্যানসার, আলসার, হার্ট এটাক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়রিয়া সহ ইত্যাদি রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক ভাবে বাড়ছে, যার কারন এসব ক্ষতিকর, রাসায়নিকযুক্ত এবং ভেজাল খাবার। আমার এক বন্ধু সেদিন মজা করে বলল যে, আজকাল নাকি কেউ আর দুধে পানি মিশায় না, বরং তারা পানিতে দুধ মেশায়! তাই আজকাল বাজার করার সময় খুব সতর্ক থাকি, কে চায় আর বেঘোরে নিজের প্রাণটা হারাতে।

কিছুদিন আগে সন্ধাবেলা পাউরুটি কিনতে গিয়ে এর গায়ে উৎপাদনের তারিখ দেখতে গিয়ে তো আমি পুরো থ! কারন তারিখটি ছিল আগামীকালের, অর্থাৎ তার পরের দিনের। দোকানদারের কাছে এর কারন জানতে চাইলে সে নির্বিকারভাবে জবাব দিল যে, রুটিটা মাত্রই কারখানা থেকে এসেছে। আর আজকের রাতটা গেলেই তো আগামীকাল ,অতএব এটা ঠিকই আছে! তার অগ্রিম চিন্তাভাবনা দেখে আমি আঁতকে উঠলাম, “ভাবলাম দেশটা কি তার মতো মানুষের চিন্তা ভাবনা দিয়ে এগুচ্ছে কিনা”। যদি তাই হয়, তাহলে তো দেশের বারটা বাজতে আর খুব বেশি দেরি নেই!
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে খাবারে ভেজাল রোধে অত্যন্ত কঠোর আইন রয়েছে, এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে দেয়া হয় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। বছরখানেক আগে চীনে গুড়ো দুধে মেলানিন নামক পদার্থ মেশানোর জন্য দায়ীগণদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। আর আমাদের দেশে যদিও প্রায় সব খাবারেই ভেজাল বিদ্যমান,কিন্তু এর পরেও কোন মানুষ/ প্রতিষ্ঠানকে খুব বড় কোন শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। শুধুমাত্র অর্থ জরিমানাকে অথবা দুই এক বছর জেলে থাকাকে আমি কখনোই খাবারে ভেজালকারীদের শাস্তি হিসাবে মেনে নিতে পারি না। যেখানে এসব খাবার খেয়ে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুমুখেও অনেকে পতিত হচ্ছে, সেখানে ভেজালকারীদের এ শাস্তি নিতান্তই গৌণ। বিষয়টি কেন আমাদের সংশ্লিষ্ট আইন প্রনেতারা একটু ভেবে দেখেন না তা আমার বোধগম্য নয়। কে জানে, হয়তো ভেজাল খেতে খেতে আমাদের সবার সুস্থ মস্তিস্কে কোন কিছু চিন্তা করার ক্ষমতাই হয়তো হারিয়ে গেছে! এর মতে আমাদের দেশের শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি খাবারে ভেজাল বিদ্যমান। কাজেই ভেজাল খেতে খেতে আমরা এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, কিছুদিন পর কেউ যদি হঠাৎ করে ভেজালবিহীন খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পরে তাহলে হয়তো আর অবাক হবার মতো কিছু থাকবে না! এ সংক্রান্ত একটি জোকস না বলার লোভ সামলাতে পারছি না । তা হল, ঈদের পরের দিন এক গৃহকর্তা তার বাড়িতে দীর্ঘ দিন যে গোয়ালা দুধ সরবরাহ করে তাকে ধরে নিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেন। গৃহকর্তার অভিযোগ, গোয়ালা তাকে ঈদের দিন ভেজাল দুধ দিয়েছে যা খেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পরেছেন । অবশেষে পুলিশের মার খাবার ভয়ে গোয়ালা সত্য স্বীকার করে যে, সে আসলে অনেক দিন ধরে গৃহকর্তাকে পানি মিশ্রিত দুধ দিচ্ছিল, কিন্তু গতকাল ঈদের দিন দেখে সে ভেবেছিল যে আজ গৃহকর্তাকে একটু খাঁটি দুধ দিবে।কিন্তু এতেই ঘটে বিপত্তি, কারন দীর্ঘদিন ভেজাল দুধ খেতে খেতে হঠাৎ গৃহকর্তার পেটে খাঁটি দুধ আর সহ্য হয়নি!

[ আমার এ লেখাটি বদলে দাও, বদলে যাও ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে]