ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

ইউনিভার্সিটির প্রথমবর্ষের মেধাবী ছাত্রী মৌসুমি(ছদ্মনাম), ফেসবুক এ নিয়মিত চ্যাট করে তার বন্ধুদের সাথে। একদিন এক যুবক তাকে অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠালে সে তা একসেপ্ট করলো। এর পর নিয়মিতভাবে তাদের মধ্যে কথোপকথন হতে লাগলো। শুরুতে শুধু ফেসবুক এ যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে মোবাইলে এবং অবশেষে সামনাসামনি দেখা করা আরম্ভ হল। কবে যে তাদের মধ্যে মন দেয়া নেয়া শুরু হয়ে গেছে তা দুজনের কেউই বলতে পারবে না । হটাৎ একদিন মৌসুমি জানতে পারলো যে, ছেলেটি এতদিন তার নিজের সম্পর্কে যা কিছু বলেছে তার অধিকাংশই সত্যি নয়, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলেটির কাছে সে প্রথমে এ বিষয়টির সত্যতা জানতে চাইলে প্রথমে সে অস্বীকার করলেও পরে চাপে পরে বাধ্য হয় সত্যি স্বীকার করতে । এ নিয়ে তাদের মাঝে শুরু হয় ঝগড়া , কলহ এবং অবশেষে বিচ্ছেদ। কিছুদিন পর বাবা মার মতে মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে হয়। অতীত ভুলে সুখেই কাটছিল মেয়েটির দিনকাল। কিন্তু হটাৎ একদিন তার এক বন্ধুর মাধ্যমে মেয়েটি জানতে পারলো যে তার প্রাক্তন প্রেমিক তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবি আপলোড করে দিয়েছে ইন্টারনেটে।

লজ্জায়,ভয়ে,অপমানে মেয়েটি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। পরিচিত অন্য কারও সাথে তো দূরের কথা,নিজের স্বামীর সাথেও ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করতে সে ভয় পাচ্ছিলো। অতঃপর একদিন থাকতে না পেরে সে তার স্বামীকে পুরো ঘটনাটি খুলে বলল এবং তার ভুলের জন্য স্বামীর কাছে ক্ষমা চাইলো।শুরুতে তার স্বামী ঘটনাটি শোনার পর তাকে ক্ষমা করে দিলেও পরে সে ধীরে ধীরে তার মত বদলাতে থাকে। অকারণে সে তার স্ত্রীর সাথে রাগ করে , মেজাজ দেখায়। একটা সময় মেয়েটির স্বামী তাকে আর সহ্যই করতে পারে না । অবশেষে মৌসুমি আর থাকতে না পেরে তার বাবার বাসায় ফিরে আসে। ততদিনে ব্যাপারটি আসে পাশে পাড়ার সবাই জেনে গেছে। তাই লজ্জায় আর অপমানে স্বামী পরিত্যক্ত মেয়েটির দিন কাটে আজ ঘরের চার দেয়ালের মাঝে।

আমাদের চারপাশে আজ নিত্যনতুন এমন হাজারো ঘটনা ঘটছে, যার ফলে অকালে ঝরে যাচ্ছে এমন সম্ভবনাময় অনেক জীবন।এ থেকে বাদ যাচ্ছে না আজ কেউই। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী ,নাট্যশিল্পী, গায়ক-গায়িকা ,খবর পাঠিকা থেকে আরম্ভ করে প্রায় সব শ্রেণীর মানুষেরই আপত্তিকর ছবি, ভিডিও আজ ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে, এবং প্রায় সব বয়সের মানুষই এসব দেখার নেশায় আসক্ত। একটি জরিপে দেখা গিয়েছে যে, আমাদের দেশের শতকরা ৬০ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এসব আপত্তিকর ওয়েবসাইটগুলো থেকে ভিডিও ডাউনলোড অথবা আপলোড করে থাকেন। আর আমাদের সাইবার ক্যাফেগুলোতে এ হার শতকরা ৯০ ভাগ ! আর হবেই না কেন , আমাদের সাইবার ক্যাফের মালিকগণ যেভাবে চারপাশে ঘিরে একেকটা কম্পিউটার বসিয়ে রাখেন তাতে তো মনে হয় তারা এসব আপত্তিকর বিষয় দেখবার জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টি করতে চান!

আজকাল ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে এ আমরা অনেক নামিদামী মানুষের ছবি এবং তথ্য সংবলিত অ্যাকাউন্ট দেখতে পাই যার অধিকাংশই ভুয়া। অনেক সময় আবার ছেলেরা মেয়ে সেজে এবং মেয়েরা ছেলে সেজে অনেক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। এসবের মাধ্যমে আজ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মানুষের গোপনীয় তথ্য, ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার ইত্যাদি। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ছবি নিয়েও অশালীন ছবির সাথে জোড়া দিয়ে তা বিকৃত করা হচ্ছে, এ থেকে বাদ যাচ্ছেন না স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও! বিভিন্ন সফটওয়্যার যেমন – এডোবি ফটোশপ, এডোবি ইলাস্ট্রেটর, পিকাসো, ম্যাজিক ফটো ইফেক্টসহ ইত্যাদি সফটওয়্যার এর মাধ্যমে আজ যে কেউ ঘরে বসে নিমিষেই একটি আপত্তিকর ছবির সাথে একটি ভালো ছবিকে জোড়া দিয়ে বিকৃত ছবি তৈরি করতে পারে, এর জন্য খুব শিক্ষিত হবার প্রয়োজন নেই । এবং এই এডিট করা ছবিটি বলতে গেলে প্রায় নিখুঁত হবে, আর তা না হলেও তেমন কোন সমস্যা নেই। কারন যারা এসব ছবি বা ভিডিও দেখে তারা বিশ্বাসের জন্য নয়, তারা দেখে শুধুমাত্র মজা পাবার জন্য। সেদিন একটি পত্রিকায় পড়লাম দশম শ্রেণীর একজন মেধাবী ছাত্র তার স্কুলের একজন শিক্ষিকার কিছু ছবি সংগ্রহ করে তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এডিট করে বিকৃত অবস্থায় নেটে ছেড়ে দিয়েছে। পরে শিক্ষিকা র্যােব এর সদর দফতরে অভিযোগ করলে তারা ছেলেটিকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। হায়রে বাংলাদেশ, আমাদের মেধা এবং দক্ষতাকে আজ আমরা কোন পথে খাটাচ্ছি?

এটা সত্যি যে ইন্টারনেট এর মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ফেসবুক, টুইটার, গুগলপ্লাস ইত্যাদি ব্যবহার করে আজ আমরা অনেক পুরানো বন্ধুদেরকে ফিরে পাচ্ছি,সাথে যোগ হচ্ছে অনেক নতুন বন্ধুও, যেকোনো তথ্য শেয়ার করতে পারছি আজ নিমেষেই, কিন্তু একইসাথে এগুলো ব্যাবহার করে অনেকেই যে ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছেন, অনেকর যে সংসার পর্যন্ত ভেঙ্গে যাচ্ছে ,তাও কিন্তু আমাদের লক্ষ রাখা প্রয়োজন। অনেক ছাত্রছাত্রীই আজ প্রচুর সময় কাটায় এসব ওয়েবসাইটগুলো নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থেকে, যার ফলে তারা পরীক্ষায় আশানুরুপ ফলাফল করতে ব্যর্থ হয়। সেদিন একজন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে , যারা এসব আপত্তিকর বিষয়গুলো দেখার প্রতি সময় বেশি দেয় তাদের মানসিক রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভবনা রয়েছে এবং দ্রুত বিয়ে করার একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায় । বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম থেকে এরা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে গুটিয়ে নেন এবং একটা সময় হয়ে পরেন অলস এবং কর্মক্ষম ।

আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনো ততটা উন্নত নয়, যার ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অপরাধীরা আরেকজনের ব্যক্তিগত ছবি এবং ভিডিও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আপলোড করে দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক সময় অপরাধীরা দেশের বাইরে থেকে অপরাধ সংঘটিত করায় তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আমাদের দেশের আইনেও সুনির্ধারিত ভাবে কিছু বলা নেই , তাই দিন দিন এসব অপরাধ বেড়েই চলছে। অথচ এক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টি দেয়া একান্ত প্রয়োজন এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও করা উচিত। আমার দৃষ্টিতে একজন মেয়ের মুখে এসিড নিক্ষেপের চেয়েও ভয়ংকর অপরাধ হচ্ছে মেয়েটির আপত্তিকর ছবি/ভিডিও সবার সামনে এভাবে প্রকাশ করে দেয়া। কারন বর্তমান যুগে উন্নত চিকিৎসা এবং প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে আপনি হয়তো মেয়েটির মুখের দাগ মুছে ফেলতে পারবেন সহজেই কিন্তু তার চরিত্রে যদি কোন দাগ লাগে তা কি কোনোদিন মোছা সম্ভব ? কাজেই এসব ক্ষেত্রে শাস্তির বিধানটাও যেন সবকিছু বিবেচনা করেই ঠিক করা হয়। সরকারের দ্রুত এ বিষয়টি দিকে লক্ষ দেয়া উচিত, এবং এর পাশাপাশি দরকার সামাজিক সচেতেনতা । অভিভাবকদের উচিত শিশু কিশোর এবং ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারনেট ব্যবহারকে সীমিত রাখার দিকে নজর দেয়া, এর পাশাপাশি আমাদের সুস্থ বিনোদন ব্যবস্থা বাড়ানোর দিকেও চেষ্টা থাকতে হবে ।