ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

SAMSUNG CAMERA PICTURES

ব্যক্তিগত একটা ঝামেলার কারণে গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে বিকেলে পৌছে কাজ শেষ করে যখন ঢাকা ফেরার জন্য বাসে উঠলাম ঘড়ির কাটায় তখন রাত দেড়টা। চলন্ত বাসে বসে হুট করে বেড়ানোর নেশা জেগে উঠল। ইচ্ছে করছিল না ঘরে ফিরে যেতে। রাতের গভীরতার সাথে সাথে নিস্তব্দতা বেড়ে যায়। এই নিস্তব্দতা মানুষকে ভাবায়, ভাঙ্গা গড়ার হিসেব মিলায়। সিটে হেলান দিয়ে নানান কিছু ভাবতে ভাবতে শারীরিক ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম টেরই পেলাম না। ঘুম ভেঙ্গে বামে ডানে তাকিয়ে দেখি মহাখালী আমতলী সিগনাল অতিক্রম করছে বাস। কি পারফেক্ট টাইমিং! সামনের রেলগেইট মোড়ে নেমে এক কাপ চা পান করলাম। ঘরে ফিরে বিছানায় শুতেই আবার ঘুমিয়ে পরা বেড়ানোর নেশা নাড়াচাড়া দিয়ে জেগে যায়। কিভাবে কোথায় যাওয়া যায়! চোখ বন্ধ করলেই একটু একটু হিসেব মিলে তো মিলে না। একূল-ওকূল ভাবতে ভাবতে মিলল, যাব কোন কূল! রাতের বেলা বিছানায় ঘুমাতে গেলে আর প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে টয়লেটে গেলে এমন অনেক জটিল হিসেবই মিলে যায়।

সকালে কমলাপুর থেকে ট্রেনে চড়লাম। ট্রেনের গৌন্তব্য শেষ হবে নারায়ণগঞ্জ। খুব অল্প সময়ে লাস্ট ষ্টেশনে ট্রেন থামে। তবে ট্রেনের ইঞ্জিন বন্ধ হয়নি। একটা ব্যাপার হয়তো সবার নজরে পরেছে যে, ট্রেন ঘন্টার পর ঘন্টা ষ্টেশনে অবস্থান করলেও ইঞ্জিনের ষ্টার্ট বন্ধ করা হয়না। কেন বন্ধ করা হয়না তার সুনির্দিষ্ট কারণ হয়তো অনেকেরই জানা নেই। আমি একবার এই প্রশ্নের উত্তর জেনেছিলাম। তা হলো, ‘আমাদের ট্রেনগুলোর অধিকাংশ ইঞ্জিনই নাকি মেয়াদউত্তীর্ণ আর তাই স্টার্ট বন্ধ করলে পূনরায় স্টার্ট করতে অনেক ঝামেলা।’ তবে এটা পুরোপুরি সত্য কিনা যাচাই করিনি। যাই হোক ট্রেনের ইঞ্জিন নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে মূল গল্পে আসি। নারায়ণগঞ্জ রেল ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে ‘বন্দর’ লঞ্চ ঘাটে প্রবেশ করলাম। এবার কোন লঞ্চে কোথায় যাব সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম না। দিনে গিয়ে আবার রাত ১০টার মধ্যে বাড়ী ফিরতে পারব এমন কোথায় যাব। ঘাট থেকে খোজ খবর নিয়ে চাদপুরগামী একটি লঞ্চে উঠলাম। লঞ্চটি খুব বড় না (নারায়ণগঞ্জ থেকে চাদপুরগামী লঞ্চগুলো সাধারণত ছোটই হয়)। এখান থেকে চাদপুর যেতে সময় লাগে চার ঘন্টা। আমি ঠিক করলাম, মধ্যপথে কোনো ঘাটে লঞ্চ ভিড়লে সেখানে নামব। লঞ্চে চড়ে এমন একটু ফাঁকা জায়গা খুচ্ছিলাম যেখানে দাড়িয়ে নদী ভ্রমণের পুরো স্বাদ পাওয়া যাবে। কিন্তু এমন প্রতিটি কোনা-কাঞ্চি আগেই দখল করে রেখেছে যাত্রীরা। লঞ্চের পিছন সাইডে ইঞ্জিনের পিছনে একটু ফাঁকা পেয়ে প্রথমে দাড়ালাম। লঞ্চ ছাড়ার পর শব্দের কারণে জায়গাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। আমার আগেই বুঝা উচিত ছিল যে, এই জায়গাটি ফাঁকা থাকার পিছনে অবশ্যই কোন কারণ আছে। সরে গিয়ে লঞ্চের দো’তলার বারান্দায় অন্য একজন যাত্রীর পিছনে দাড়িয়ে একটু ফাঁকা পেয়ে উকি দিয়ে রইলাম। সামনের জন বারবার আমার দিকে পিছন ফিরে তাকাচ্ছিল। তার চাহনিতে বুঝতে পারছিলাম এভাবে তার পিছনে ভড় করে দাড়ানো তার বিরক্তির কারণ। বুঝতে পারলেও কিছু করবার নাই, এখানে স্বার্থপরের মতো আচরণ করলাম। ব্যাহায়ার মতো লোকটার পিছনে তার গায়ে ভড় করে দাড়িয়ে রইলাম। লোকটিকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে তার উপর বেশি ভড় দিচ্ছিলাম। একটুপর লোকটি সরেই গেলেন। আমি ভালোভাবে দাড়ানোর জায়গা পেলাম।
সম্ভবত সর্বোচ্চ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল লঞ্চটি। হটাত করে স্প্রিড একটু কমে গেল। বুঝতে পারলাম চালক গতি কমিয়েছে। তখন বামে-ডানে ও সামনে পিছনে আরো অসংখ্য লঞ্চ, টলার, নৌকা, স্টিমারের আনাগোনা ছিল। এ কারণেই চালক গতি কমিয়ে দেয়। নয়তো দূর্ঘটনা ঘটতে পারত। সেই মুহুর্তে আমার মনে হয়েছে একেই বুঝি বলা হয়, নৌ-পথে যানজট। এ জট পেরিয়ে চালক আবার লঞ্চের গতি বাড়িয়ে দেন। প্রায় বিশ মিনিট পর লঞ্চ ‘গজারীয়া’ লঞ্চ ঘাটে ভিড়ানো হলো। কিছু যাত্রী নামল, তার চেয়ে বেশি যাত্রী উঠল। দুই মিনিটের মধ্যেই লঞ্চ আবার ছাড়ল। আরো ঘন্টা খানেক পর পৌছলাম ‘ষাটনল’ লঞ্চ ঘাটে। এখানে নেমে গেলাম। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চে পৌছতে সময় লাগল দেড় ঘন্টা। ঘাট থেকে কাঠের সাকো গিয়ে ঠেকেছে বাজারে। সাকো যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে একটু সামনেই দেখতে পেলাম অসংখ্য মোটর সাইকেল। সামনে এগোতেই একে একে ক’জন এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন ভাই কোথায় যাবেন! বুঝতে পারলাম এরা মোটর সাইকেলের চালক। সাথে জানলাম এখানে যাতায়াতের মাধ্যম মোটর সাইকেল আর ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা। এখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানলাম, এখান থেকে বেলতলী লেংটার মেলায় যাওয়া যায়। ঠিক করলাম সেখানেই যাব। একজন মোটর সাইকেল চালকের পিছনে চেপে বসলাম। আমার পিছনে উঠল আরেকজন যাত্রী। চালকসহ মোট তিনজন। ঠিক হলো আমার ভাড়া দিতে হবে ৭০ টাকা। ত্রিশ মিনিটে বেলতলী পৌছলাম। মোটর সাইকেল চালানোর স্টাইলে যা ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছে চালক উড়িয়ে নিয়ে এলো।এতো দক্ষ মোটর সাইকেল চালক আমি আর দেখিনি। বেলতলী লেংটার মেলা প্রবেশের মূল গেইটের সামনে শুরুতেই দেখলাম গামছার দোকান। এরপর আগরবাতি, মোমবাতিসহ অন্যান্য দোকান। একটি দোকান থেকে পানির বোতল কিনতে গিয়ে জানলাম, এখানে সব পণ্য মূল্য যা লেখা আছে তার চেয়ে দুই টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হবে। যাই কিনেন দুইটাকা বেশি। এমনকি মোবাইলে একশ টাকা রিচার্জ করলেও দুইটাকা বেশি দিতে হবে। লেংটার মেলা নামে খ্যাত হযরত সোলেমান শাহ (র:)-এর মাজারের মূল ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ চলছিল দেখলাম। সেদিন ভক্তদের আনাগোনা একেবারেই দেখলাম না। হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন চোখে পরেছিল। ক;জন ভক্তদের দেওয়া তথ্য মতে,
‘সোলেমান শাহ উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান আউলিয়ার দাবিদার। তিনি পোশাক পরিধান করতেন না আর তাই তিনি লেংটা বাবা নামেও পরিচিত। তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মতলবের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিয়ে করেছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সারাদেশ ঘুরে বেড়ালেও মতলবের বেলতলীতে বেশিরভাগ সময় থাকতেন। ওরসের সময় এই বেলতলীতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। আশে-পাশের কয়েক গ্রামজুড়ে ভক্ততের অবস্থান থাকে। কয়েক বর্গকিলোমিটার জুড়ে বসে ভান্ডারী, মারফতী ও বাউল গানের আসর। এছাড়া প্রতি বৃহস্প্রতিবারও গানের আসর জমে। অনেকে এ আসরকে লেংটার মেলা, পাগলের আসর, পাগলের মেলাও বলে।’
বেলা তিনটায় দুপুরের খাবার খেয়ে আরেকটি মোটর সাইকেলে চড়ে ষাটনল ঘাটে যাই। বাজার থেকে ঘাটে একটি লঞ্চ দেখতে পেয়ে দিলাম দৌড়….। কাঠের সাকো পেরিয়ে ঘাটের ভেতর ঢোকার আগেই লঞ্চটি ছেড়ে দেয়। আমি উঠতে পারলাম না। ত্রিশ মিনিট পর নাকি আবার আরেকটি লঞ্চ আসবে সবাই বলাবলি করছিল। একবার দাড়িয়ে একবার ওয়েটিং রুমে বসে এভাবে করে ত্রিশ মিনিটের অপেক্ষা। কিন্তু ত্রিশ মিনিট পেরিয়ে চল্লিশ মিনিট হলেও নারায়ণগঞ্জ গামী লঞ্চ এলো না। এরমধ্যে দুটি লঞ্চ এলেও সেগুলো ছিল চাদপুর গামী। ঘাট থেকে দাড়িয়ে দূর-দূরান্তে দেখতে পাওয়া লঞ্চ দেখে মনে হয়েছে, এটিই বুঝি এখানে থামবে। কিন্তু কাছে আসতেই সামনে দিয়ে চলে যায়। ঘাটে না থেমেই। ওগুলো নাকি ডাইরেক বরিশালগামী বড় লঞ্চ। বরিশালের আগে কোথাও থামব না। এই ঘাটে কিছু সময়ের অপেক্ষায় জানলাম- এ ঘাটে নির্দিষ্ট লঞ্চ ছাড়া অন্যান্য লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকা ভিরলেই জরিমানা দিতে হবে।
বিকেল চারটা বেজে ত্রিশ মিনিটে লঞ্চে উঠি। এই লঞ্চের ছাদে উঠার সুযোগ পেলাম। তবে ছাদে যাত্রী সংখ্যা কম ছিল। এককোণে লোহার গ্রিলে বসলাম। চলন্ত লঞ্চ থেকে বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ভয়ে গ্রিলে শক্ত করে ধরে রাখলাম। কিছুক্ষণ পর অবশ্য ভয় কেটে যায়। তখন কিছু দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। এর মধ্যে একজন টিকেট হাতে ভাড়া চাইল। বিশ টাকা ভাড়া মিটিয়ে টিকেট বুঝে নিলাম। কেটে যাচ্ছিল রোমাঞ্চকর মূহুর্ত। এরই মাঝে একজন ডিস্টার্ব করতে চলে এলো বলল, ছাদ থেকে নামতে হবে। একে একে উপরের সবাই নামতে শুরু করে। সবাই নেমে যাওয়ার পর রইলাম বাকি আমি। কোনরকমের চালাকি কাজে আসল না। একটু পরে নামতে চাইলে লোকটি বলল, সমস্যা আছে। অহন নামেন। কি সমস্যা পাল্টা প্রশ্ন করলাম? ‘নারায়ণগঞ্জ আইয়্যা পরছি। ছাদে লোক নিসি দেখলে আমগো লঞ্চের জরিমানা করব।’ এমন উত্তরে কথা না বাড়িয়ে ছাদ থেকে নেমে গেলাম। তার কয়েক মিনিট পরেই বন্দর লঞ্চ ঘাটে পৌছালাম। নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনে গিয়েই ঢাকাগামী একটি ট্রেন দাড়িয়ে থাকতে দেখে খুশি হয়ে যাই। ভাবলাম মিনিট কয়েকের মধ্যেই ট্রেন ছাড়বে। ঘড়ির কাটায় সন্ধা ছয়টা বেজে দশ মিনিট। অপেক্ষা করতে করতে ট্রেন ছাড়ল, আটটার কয়েক মিনিট আগে।

slide