ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 


ছবি ক্যাপশন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে আমি!

১.
একজন মানুষের কথা চিন্তা করুণ যাকে মাইক ছাড়া মঞ্চে তুলে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার মানুষের সামনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য! সামনের কিছু মানুষ বাদে আর কেউই তার বক্তব্য শুনতে পাচ্ছে না। সে তার মত করে বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছে আর পেছনের মানুষগুলো চিৎকার করে, “হ্যাঁ” “কি বলছেন?” “শুনতে পাচ্ছি না ” বলেই যাচ্ছে! কিন্তু পেছন থেকে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না।

এবার একটা প্রশ্ন করি! এই যে মঞ্চের মানুষটার বক্তব্য কেউই বুঝতে পারছে না, এই দোষটা কার? মঞ্চের সেই ব্যক্তির? সাধারণ মানুষের? না সেই আয়োজকদের যারা এতগুলো মানুষের সামনে বক্তব্য দিতে মঞ্চের মানুষটার জন্য একটা মাইকের ব্যবস্থা করেনি? নিশ্চয় বলবেন আয়োজকদের যারা মাইকের ব্যবস্থা করেনি।

২.
কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চাকুরীর আবেদন করতে গিয়ে আর করা হয়নি। কারণ আবেদন করার আগেই জানতে পারি অফিসটি চারতলায়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে চারতলায় উঠা আমার পক্ষে সম্ভব না। এমন সমস্যা শুধু আমার নয় প্রতিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেই এই ধরণের নানান সমস্যায় পড়তে হয়।

গণপরিবহনের সমস্যার করণে অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারেন না কারণ পরিবহনগুলো হুইলচেয়ার ব্যবহারকরীদের উপযুক্ত না। অনেক হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে হয়, ফুটপাথ হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য উপযুক্ত নয় বলে। অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ঘরের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন অফিস-আদালত বা শপিং মলে গিয়ে টয়লেট চেটে রাখেন। কারণ সেখানকার টয়লেটগুলো যে ধরনের তা তাদের ব্যবহারের উপযুক্ত না।

অনেক ইশারাভাষী ব্যক্তি ইশারা ভাষায় অনুষ্ঠান হয় না বলে টিভি দেখার সুযোগ পায় না, অফিস-আদালতে ইশারা ভাষায় সেবা দেওয়া হয় না বলে সেখানে গিয়ে পরতে হয় বিড়ম্বনায়।
প্রতিনিয়ত হাজার হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি চাকুরী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ তারা চাকুরীর জন্য উপযুক্ত না। অন্তত চাকুরীদাতারা তাই মনে করে। কিন্তু কেউ ভেবে দেখছে না এই মানুষগুলো চাকুরীর জন্য উপযুক্ত না; না চাকরিকে এই মানুষগুলোর জন্য উপযুক্ত করে তৈরী করা হয়নি?

pic

৩.
উপরে যে উদাহরণ দিলাম তা প্রতিবন্ধী মানুষের বঞ্চনার বাস্তব উদাহরণ! এখন যদি প্রশ্ন করি এই মানুষগুলোর এই যে প্রতিনিয়ত বাঁধার মুখোমুখি হচ্ছে এবং জীবনে এগিয়ে যেতে পারছে না এর জন্য দায়ী কারা, তাহলে কি উত্তর দিবেন? নিশ্চয় বলবেন তাদের প্রতিবন্ধীতা দায়ী? এমন কেন উত্তর দিবেন? যদি মাইক না থাকাটা আসল কারণ হয় তবে লিফট না থাকা, র‌্যাম্প না থাকা, উপযুক্ত বাস না থাকা, উপযুক্ত টয়লেট না থাকাটা কেন কারণ হবে না?
৪.
আপনি যে উত্তর দিয়েছেন তা সবাই দিচ্ছে! সবাই ধরে নিচ্ছে এই সমাজ যেমন আছে সেটাই ঠিক! এই সমাজের সাথে যারাই চলতে পারবে না তারাই হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা অনুপযুক্ত। সমাজের ক্ষুতকে নিজেদের অযোগ্যতা হিসেবে মেনে নেওয়াই যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাগ্য! একবারও ভাববেন না সমাজের কিছু ক্ষুত যদি একটু সারিয়ে নেওয়া যায় তখন সমাজটা সত্যিকার অর্থে সবার জন্য এবং সমাজ হয়ে উঠবে!

এই যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম এগুলোর মূল আসলে একটাই। “প্রবেশগম্যতা”র সমস্যা।

শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে আমাদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ভৌত অবকাঠামোয় প্রবেশগম্যতা না থাকা। একটি র‌্যাম্প থাকলে, নিচ তলায় কাজের সুযোগ থাকলে, একটি ব্যবহার উপযোগী টয়লেট থাকলে, ফুটপাথ চলার উপযোগী হলে, কিংবা যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত গণপরিবহন থাকলে খুব সহজেই আমাদের পক্ষে আমাদের প্রতিভাগুলোর বিকাশ ঘটানো সম্ভব হত, আমরা সহজেই যে কোন চাকুরী করতে পারতাম এবং নিজের মত করে নিজেদের প্রয়োজনে যেখানে খুশী সেখানে যেতে পারতাম। এই বিষয়গুলো না থাকাই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলশ্রুতিতে সমাজের ক্ষুত নিজের ঘাড়ে নিয়ে আজ আমরা “প্রতিবন্ধী ব্যক্তি”।

৫.
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতার সমস্যাকে বিভিন্ন নীতিমালায় গুরুত্বসহকারে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাখা হয়েছে এটি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধারা। ভৌত অবকাঠামোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে সবচাইতে ভাল ভাবে যে বিধিমালাটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেটি হল ঢাকা মহানগর ইমারাত বিধিমালা। এর ৭ম অধ্যায়ের ৬৪ নং ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে করণীয় উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে যে বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেগুলো হল লিফট, র‌্যাম্প, টয়লেট, গাড়ি রাখার স্থান সহ অন্যান্য স্থানসমূহ যেগুলো সাধারণ মানুষকে নিয়মিত ব্যবহার করতে হয়। কিভাবে কি করতে হবে তাও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে পরিশিষ্ট এর ১ নং সাধারণ নিয়মে। শুধু ধারাই অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। এর সাথে এই বিধান মেনে না চললে কি ধরেনর শাস্তি হবে তাও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বিধিমালার সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন যাপনকে শুধু সহজই করবে না, তাদের কর্মদক্ষতার সঠিক প্রকাশ ঘটাতেও সহযোগীতা করবে।
এই নীতিমালার আলোকে চিটাগং মহানগর ইমারত বিধিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে বিধায় সেই বিধিমালাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত।

৬.
একদিনেই দেশ বদলে যাবে এমনটা আমরা আশা করি না। তবে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেই লক্ষ্যের সাথে মিল রেখে আমরা এতটুকু নিশ্চয় আশা করতে পরি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি প্রবেশগম্য সমাজ গড়ে তোলা হবে যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়ন করতে পারবে, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতে পারবে, দেশের বিনোদনের মাধ্যমগুলোতে স্বাচ্ছন্দে যেতে পারবে! আমরা এমন একটি সমাজ আশা করতেই পারি যেখানে সমাজের প্রতিবন্ধকতাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।

৭.
নীতিমালা এবং আইনের সাথে বাস্তবতার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েক দিন আগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে একটি চাকুরীর পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। ভবনের লিফট দিয়ে যে কোন ফ্লরে যাওয়ার সুযোগ। কিন্তু রাস্তা থেকে লিফট পর্যন্ত যেতে ছোট্ট দুইটি উচু পথ পারি দিতে হয় যা হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য খুবই কঠিন। গণিত বিভাগের জন্য যে নতুন ভবন করা হয়েছে তাতে একটি ঢালু পর রয়েছে। গাড়ি উঠার জন্য করা হলেও সেটা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের জন্য বেশ ভাল বলেই মনে হল। এর প্রথম তলা থেকেই রয়েছে লিফট। বেশ বড় হওয়াতে সেটাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ করে হুইলচেয়ার ব্যবহাকারীদের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু বাঁধ সাজবে সাজিয়ে রাখা পাপোশ! সেগুলোকে দু’টো কাঠের ফ্রেমে রাখা হয়েছে যা প্রায় ৪ ইঞ্চির মত উঁচু। সেই উচ্চতা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য বিশাল যা তাদের চলার পথকে বাঁধাগ্রস্থ করবে।

নতুন যে ভবনগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে তাদের প্রায় সবারই এইরকম অবস্থা। যেটিকে র‌্যাম্প বলে চালিয়ে দেওয়া হয় সেটি আসলে গাড়ি উঠার ঢালু পথ। তাই এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত না। প্রায় প্রতিটি ভবনেই প্রবেশগম্যতা বলতে ঠিক এতটুকুকেই বোঝায়, “কোন মতের একটি র‌্যাম্প”। যা আমাদে চাহিদা পুরণের ক্ষেত্রে দূরতম কোন ভূমিকা রাখতে পারে না।
ঢাকাতে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার ভবন গড়ে উঠছে। গড়ে উঠছে শত শত শপিং মল আর প্লাজা। তার কয়টিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে? নেই বললেই চলে। যেগুলোতে আছে তাতেও রয়েছে হাস্যকর রকমের ফাঁকি।

বসুন্ধরা সিটিতে রয়েছে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। আপনার প্রয়োজন হলে আপনি মূল প্রবেশদ্বারের পাশে রাখা এই হুইলচেয়ারগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু হাস্যকার বিষয় হল এই হুইলচেয়ারগুলো ব্যবহার করার আগে আপনাকে কতগুলো সিড়ি বেয়ে উঠতে হবে কিংবা গাড়ি পার্কিং দিয়ে লিফটে উঠতে হবে। ভবনের পেছনে লিফটের সামনে থেকেই ঢালু পথের ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু সেগুলো কিচেনের ট্রলি এবং পণ্যের ট্রলি টেনে নেওয়ার জন্য। খুব সরু করে তৈরী করা এগুলো হুইলচেয়ার নিয়ে চলতে গেলে পিছলে যাবার ভয় থাকবে।
এটাই হল বাস্তবতা। আইনে অনেক কিছু থাকে। বিধিমালায় স্পষ্ট করে সব বলা থাকে, বিধিমালায় শাস্তির জন্য এত এত ধারা থাকে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না। এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা প্রবেশগম্যতা উপভোগ করতে পারি না। এটাই বাস্তবতা! এই ভাবেই চলছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন।

৮.
এই বিধিমালা বা নীতিমালা কিংবা আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার বড় কারণ হল নিয়মিত মনিটোরিং এর ব্যবস্থা না থাকা। আইন যতটা শক্ত করে তৈরী করতে হবে তার চাইতে বেশী কঠিন ভাবে মনিটোরিংএর ব্যবস্থা রাখতে হবে তাহলেই সম্ভব হবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা। এই মনিটরিং করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের পক্ষে হয়তো শহরের সব ভবন মনিটোরিং করা সম্ভব হবে না কিন্তু চাইলে গুরুত্বপূর্ণ বভনগুলো যেমন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল, সরকারী-বেসরকারী সেবা প্রতিষ্ঠান, গণ স্থাপনাগুলো মনিটোরিং এর আওতায় এনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্য করা খুবই সহজ হবে। কিন্তু কে করবে সেই মনিটোরিং এর কাজ? বাস্তবতা হল প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান একে অপরের দিকে আঙ্গুল তুলে নিজেদের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেতে চায়!

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের allocation of business ঠিক করে দেওয়া আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেখার জন্য দায়িত্ব দেয়ওয়া হয়েছে “সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়”কে। যখনই কোন প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদাগুলো নিশ্চিত করার বিষয়ে বলা হয় তখনই তারা সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের প্রতি দিকনির্দেশ করে দেয়। আর যদি সেটা সম্ভব না হয় তখন অন্য প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে দায়িত্ব দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করা হয়। ভবনগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে কথা বলতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। এতে করে আমাদের অধিকারগুলো আর বাস্তবায়ন হয় না। হলেও সেটা হয় খুবই ধীর গতিতে।

৯.
আমরা চাই আমাদের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে এই ফুটবল খেলা বন্ধ হোক। প্রতিটি সরকারী প্রতিষ্ঠান নিজ থেকে তাদের দায়িত্বের মাঝে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি তাদের করণীয় ঠিক করে তা বাস্তবায়ন করার দিকে মনোযোগী হোক যাতে করে আমাদের মত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যারা যোগ্যতা সত্বেও চাকুরী পাচ্ছে না, যারা প্রয়োজনের ঘর থেকে বের হতে পারছে না, যারা নিজেদের প্রয়োজনের অন্যের উপর নির্ভর করতে গিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে তারা একটু মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।