ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

কবি গুরু রবিনদ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি”। কবি তাঁর এই কাবিতার লাইনে গ্রাম- বাংলার অবারিত রুপ বর্ণনা করে ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মল পরিবেশ, যেখানে গাছ সুনিবিড় ছায়া দিয়ে শান্তির নীড় তৈরীতে সাহায্য করেছে। আবার কবি বন্দে আলী মিয়া বলেছেন- ‘‘আম গাছ জাম গাছ বাঁশ ঝাড় যেন, আছে সেথা সবে মিলে আত্মিয় হেন”। কিন্তু সেই আত্মিয়তা আর নেই। কারণ মানুষ নির্বিচারে, নির্বিকারে কাটছে গাছ। অথচ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন ‘‘এ শহরের (মক্কা) কাঁটা গাছ উপরিয়ে ফেলা বা গাছ কর্তন করা যাবে না, শিকারকে তাড়ানো যাবে না, প্রচারের উদ্দেশ্য ব্যতীত পড়ে থাকা কোন জিনিস তুলে নেয়া যাবেনা এবং কাঁটা ঘাস কাটা বা উত্তোলণ করা যাবে না”। এসব শুনে আব্বাস (রাঃ) বল্লেন ‘‘ হে রাসুল! ইযখের ঘাস বাদ রাখুন কেননা তা স্বর্ণকারদের ও গৃহের ছাদের জন্য প্রয়োজন হয়”। তখন নবী বল্লেন ‘‘ ইযখের গাছ বাদ”।(হাদিস নং- ১৭৩, বোখারী শরিফ)। আবার মাহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআ’ন মজিদে উল্লেখ করেছেন ‘‘ওয়ান্নাজমো ওয়াশ্শাজারো ইয়াশজুদান”, অর্থাৎ তৃণলতা ও বৃক্ষাদি মানিয়া চলে তাহারই (আল্লাহ্র) বিধান।
প্রয়োজন অনুযায়ী গাছ লাগানো হচ্ছে না। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের পরিবেশ। এই পরিবেশের সাথে নিবিড় ভাবে সম্পর্কিত জীববৈচিত্র, মাটি, পানি, বায়ু, গাছ-পালা, বন-জঙ্গল সহ আমাদের বেঁচে থাকার সকল উপাদান। এক সময় আমাদের পরিবেশে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক পরিবর্তনে প্রভাব লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু এখনকার সময়ে অধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহার, পরিবেশের উপর মানুষের হিংস্রতা ও অমনোযোগীতা এবং অসচেতনতা এবং আরও নানা কারনে পরিবেশের উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে জীবন রক্ষাকারী সকল উপাদান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনজীবন হয়ে উঠছে দূঃর্বিসহ। বিল্প্তু হয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতি। মাতাল হয়ে উঠছে প্রকৃতি। হুমকির রুপ নিয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। বর্তমানে এই পৃথিবী এবং এর মানুষের অন্যতম প্রাণঘাতি শত্রুদের মধ্যে একটি হল বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। তাই এখনই সময় কিছু একটা করার। একটু সচেতন হলে হয়তো মানুষ টিকিয়ে রাখতে পারবে পরিবেশের ভারসাম্য। এ সমস্যা মোকাবেলা করার খুবই কার্যকরি অস্ত্রগুলির মধ্যে একটি হচেছ- গাছ।
বলা হয়ে থাকে পরিবেশকে বাঁচাতে গাছের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রয়োজন দেশের শতকরা ১৫ ভাগ বনায়ন। এই বনায়নের জন্য কৃষি জমি বন্ধ করে বা বসত বাড়ি উচ্ছেদ করে একত্রিত ভাবে আর বনায়নের প্রয়োজন নেই। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল যা আছে তাই থাকবে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে পাশাপাশি বাড়ির আঙ্গিনায়, রাস্তার ধারে, কল-কারখানার ফাঁকে ফাঁকে গাছ লাগান। আর তাত্ত্বিক ভাবে সেগুলো একত্রিত করে হিসেব করুন তার আয়তন দেশের মোট আয়তনের শতকরা ১৫ ভাগ হয় কিনা। এভাবে অন্তত ১৫ ভাগ ভূমিতে গাছ থাকলে তবে বাঁচবে আমাদের পরিবেশ। তাই বেশী বেশী করে গাছ লাগান। কিন্তু সব ধরণের গাছই কি পরিবেশকে বাঁচাতে পারবে? না। তাই আমাদের পরিবেশ বান্ধব গাছ লাগাতে হবে। কিছু কিছু গাছ মরূভূমি করনে সাহায্য করে। যেমন- ইউক্যালিপ্টাস গাছ। এই গাছ মাটি ও বায়ুমন্ডল থেকে প্রচুর পরিমানে পানি শুষে নেয়। তাই গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এদেশে ইউক্যালিপ্টাস গাছ নিষিদ্ধ করেছে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গেলে হয়তো কাগজ কলম দুটোই ফুরিয়ে যাবে তবু ভূমিকা শেষ হবে না। তারপরও বলতে হয় যে গাছ আমাদের পরম বন্ধু। এই বন্ধুত্ব দেহে দেহে, প্রাণে-প্রাণে। প্রাণের চাহিদায় আমরা নিশ্বাষে অক্সিজেন গ্রহণ করি আর কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করি। বেঁচে থাকার তাগিদে গাছ সেই কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমন্ডল থেকে গ্রহণ করে খাদ্য তৈরীতে ব্যবহার করে। সূর্যালোকের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড ও পানিকে কার্বহাইড্রেটে রূপান্তরিত করে এবং অক্সিজেন নির্গত করে। গবেষণায় দেখা যায় যে, একটি সবুজপাতা সমৃদ্ধ পরিণত গাছ যে পরিমান অক্সিজেন নির্গত করে তা দশজন মানুষের অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করে। মানুষ তার পরিবারকে আর্থিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী করতে কতনাকি করছে। কিন্তু একবারও কি কেউ ভেবে দেখেছে অক্সিজেনে সে ও তার পরিবার স্বাবলম্বী কি না? তার নিজের-ই কমপক্ষে একটি অক্সিজেন তৈরীর ফ্যাক্টরী তথা প্রাণ রক্ষাকারী গাছ আছে কিনা? নাকি সে চেয়ে আছে অন্যের অক্স্রিজেনের ফ্যাক্টরির উপর। শুধু যে অক্সিজেন দিয়ে জীবন বাঁচায় তা নয়, গাছ বাতাসকে পরিশুদ্ধ করে। মানব জাতী সহ সকল প্রাণীকুলের খাদ্য সরবরাহ করে। জীববৈচিত্রের জন্য ছায়া ও আশ্রয় প্রদান করে। শব্দ দূষণকে সহনশীল করে। মাটির ক্ষয়রোধ করে এমনকি মাটির স্তরে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। পানিকে দুষনের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। অতি বেগুনী রশ্মির হাত থেকে রক্ষা করে। জমিকে করে উর্বর। ঋতু পরিবর্তন চিহ্নিতকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সর্বপরি গাছ এনে দিতে পারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা।
বাংলাদেশে আকিকা নামের একটি প্রথা চালু আছে। এটি একটি নামকরনের অনুষ্ঠান। কোন বাড়িতে নতুন শিশু জন্মের পর তার নামকরন অনুষ্ঠান উপলক্ষে সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কুরবানী দেয়া হয়। যদি এমন হত যে, এই অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে একটি বৃক্ষও রোপণ করা হয় তবে হয়তো বাংলাদেশে এই বনায়ণ ঘাটতি থাকতো না। আসুন আমরা সকলেই অক্সিজেনে সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী হই। নিজেদের ও পরিবারের অক্সিজেনের ব্যবস্থা নিজেরাই করি। পরিবেশ বান্ধব গাছ লাগাই।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, অনেক উৎসাহ ও উদ্দিপনা নিয়ে গাছ লাগানো হয়। একে ঘিরে চলে তিনদিন ব্যাপি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু গাছের দিকে আর ফিরে তাকানো হয় না। গরু-ছাগলে খেয়ে ফেলে সেই গাছ। তাই পরের বছর আবারও একই জায়গায় গাছ লাগানো হয় এবং যথারীতি চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটাই মূখ্য, গাছ লাগানো উপলক্ষ্য মাত্র। সেক্ষেত্রে এমন গাছ নির্বাচন করা কি বাঞ্চণীয় নয় যে গাছ নিজেই নিজেকে গরু-ছাগলের হাত থেকে বাঁচাবে? আমি উদ্ভিদবিদ নই, সামান্য ভূ-তত্ত্ববিদ। তবু আমার মনে হয় যে এমন গাছ আছে। আর সেটা হলো খেজুর গাছ। যা বৃষ্টি বা খরায়ও বাঁচতে পারে। আর তার পাতার অগ্রভাগের সূচালো কাঁটার কারনে গরু-ছাগল খেতে পারে না। তাই রাস্তার পাশে খেজুর গাছ লাগানো যেতে পারে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার হাতে নিয়েছে নানা রকম কর্মসূচী। সাইক্লোনিক সার্চ বা সুনামির হাত থেকে বাঁচতে বে-অব বেঙ্গলের উপকূলীয় অঞ্চলে গড়ে তুলেছে সবুজ বেষ্টনী। সরকারের পাশাপাশি সাধারন জনগনেরও উচিৎ এ কর্মকান্ডে সক্রিয় ও সয়ংক্রিয় ভাবে যোগ দেয়া। আমাদের বাঁচতে ও আমাদের আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে আমাদেরকেই স্বচেতন হতে হবে। আসুন গাছকে বন্ধু ভেবে নিজের কল্যাণের জন্যই গড়ে তুলি সবুজ পৃথিবী।