ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

৩৬৫ দিনের একেকটি বছরের প্রতিটি দিনই কারো না কারো জন্মদিন। কিছু বিশেষ মানুষের জন্মদিনকে আমরা বেশ গুরুত্ব এবং তাৎপর্যবহ ভাবেই পালন করে থাকি। আবার কারো জন্মদিন পালন করা নিয়ে আছে নানা বিতর্ক নানা মতের নানান বিশ্লেষণ। ফেইসবুকে আমার এক বন্ধুর স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারলাম বাংলাদেশের এক নারীবাদী বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনের আজ শুভ জন্মদিন। তার স্ট্যাটাসে শুধু মাত্র লেখিকার জন্মদিনের তথ্যটি নয় পাশাপশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল সেই বন্ধুটি স্ট্যাটাস এক জায়গায় বলেছেন –

“ তথাপি পুনরায় স্মরণ করি এটা ২০১২! যে ২০১২’তে এসে দেশিয় সমাজ ব্যবস্থায়, আমাদের যাপন তরতরিকায় আধুনিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, কেবলমাত্র নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছেন তসলিমা নাসরিন। দাবি করা হয়, আমাদের রাষ্ট্রিয় অধিকারবোধে গণতন্ত্র আসন পেতেছে, অথচ এই রাষ্ট্র থেকে আজ ১৮ বছর ধরে নির্বাসিত হয়ে রয়েছেন তসলিমা নাসরিন ”

এই স্ট্যাটাসটি একান্তই আমার বন্ধুর নিজস্ব মতামত এবং আমি তার ব্যাক্তি মতামতের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হয়েই আমার নিজস্ব কিছু কথা বলতে চাই। এখানে প্রথমেই বলে রাখতে চাই আমি নারীবাদী কিংবা পুরুষতান্ত্রিক সাফাই গাইতে এ লেখাটির অবতারণা করি নাই। এই লেখাটির মুল উদ্দেশ্য আজ থেকে ১৮ বছর আগের বাংলাদেশের সমাজ ব্যাবস্থা এবং বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মাঝে পরিবর্তন কতটা এসেছে শুধু মাত্র নারী স্বাধীনতা কিংবা নারীদের জীবন যাত্রায়।

আজ থেকে ১৮ বছর আগেও নারী নির্যাতন হত এবং বর্তমানেও হচ্ছে এবং জনসংখ্যার আনুপাতিক হার অনুযায়ী এর কম বেশী নির্ধারন করা অনেকটাই কঠিন তবে আঠারো বছর আগে একশতটির মাঝে আমাদের সামনে প্রকাশ হত একটি আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় ৫০টি। আগে যদি একশত ঘটনায় মামলা হত একটি তবে বর্তমানে হয় ২৫টি। আজ থেকে ১০ বছর আগেও মফস্বলের থানা গুলিতে নারী পুলিশ সদস্যের দেখা না মিললেও বর্তমানে প্রতিটি থানায় তিন-চারজন মহিলা পুলিশ সদস্য কাজ করে যাচ্ছেন বেশ স্বচ্ছন্দেই। অফিস আদালত সর্বত্রই আঠারো বছর আগের তুলনায় নারী সম্পৃক্ততার সংখ্যাটি কোন ভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নাই। পত্র পত্রিকা ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় নারীদের অবাধ বিচরন এবং নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা আগের তুলনায় বর্তমানের চিত্রটি কোন ভাবেই বলা যাবে না নারী স্বাধীনতা কিংবা তাদের জীবন যাত্রার পরিবর্তনটি আঠার বছর আগের জায়গাতেই স্থির হয়ে আছে।সাধারন মফস্বলের হাট-বাজারে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতি সত্যি ১৮ বছর আগে ছিল অনেকটাই স্বপ্নের মত। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী বিষয়ক সিদ্ধান্তের নানা প্রক্রিয়া (যত বিতর্কই থাকুক না কেন)নারী স্বাধীনতার সু-বাতাস বলেই মনে করি।

তবে হ্যা,যদি আঠারো বছর আগের তাসলিমা নাসরিনের মত করে কোন নারী ভাবেন বাসর ঘরে স্বামীর নব বিবাহিত স্ত্র্রীর কুমারিত্ব খোজার অনাকাঙ্খিত অপরাধের দায়ে স্বামীর ভ্রুণ নিজ গর্ভে ধারন না করে অন্য পুরুষের ভ্রুণের শিশুটি স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে প্রতিশোধ নেবেন তবে সেই ক্ষেত্রে ১৮ বছর আগের প্রেক্ষাপটের এতটুকুনও পরিবর্তন হওয়ার কোন সুযোগ নেই। এক কথায় বলতে গেলে তসলিমা নাসরিনের ১৮ বছর আগের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমান নারী স্বাধীনতার ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রাকে মিলিয়ে দেখতে গেলে আমরা যতটা এগিয়েছি তা থমকে দাড়াবে। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে নারী বৈষম্যের নানা প্রতিকূলতাকে নারী-পুরুষের মেলবন্ধনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতার মধ্য দিয়েই। সেখানে যদি এখনও আমরা নারীকে পুরুষের প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখতে যাই তবে কখনও নারী স্বাধীনতার অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখা যাবে না। তাসলিমা নাসরিনের থিওরি ছিল পুরুষবিদ্বেষী নারী স্বাধীনতা, যা ছিল খাম্বা বিহীন ছাদ তৈরি করার মত স্বপ্ন মাত্র।

আর আঠারো বছর আগের দৃষ্টি ভঙ্গি হতে তাসলিমা নাসরিন সরে এসেছেন এমন কোন তথ্যও আমাদের কাছে নেই,অত এব আমরা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় আশানুরুপ লক্ষে পৌছাতে ব্যার্থ হলেও কিছুটা এগিয়েছি। কিন্তু তাসলিমা নাসরিন তার দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটানোতে এখনও সেই আঠারো বছর পিছেই রয়ে গেছেন এবং রয়েছেন নিজ দেশ হতে নির্বাসিত। আমাদের মনে রাখতে হবে নারী স্বাধীনতা আর আধুনিক নারীদের জীবন যাপনের সাথে তাসলিমা নাসরিনের দৃষ্টি ভঙ্গি মিলিয়ে দেখার কোন সুযোগ নেই। একজন তাসলিমা নাসরিন মানেই আমাদের গণতান্ত্রিক নারী স্বাধীনতা নয় এবং একজন তাসলিমা নাসরিনের জন্য তা ব্যাহত হোক তা কোনভাবেই কাম্য নয়।

শুভ হোক একজন নারী,একজন মানুষ তাসলিমা নাসরিনের জন্মদিন।

ছবি-নেট