ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মানিনা, যে বিয়েতে অন্য একজনের সাথে তিন মাস তের দিন সংসার করে আবারো পুরনো স্বামীর সংসারে আসতে হবে, এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, এর চেয়ে মৃত্যু ভালো। রাগের মাথায় দেয়া তালাক বৈধ হলে, আদালতের মাধ্যমে তার সমাধান করুন। সরকার হিল্লা, দোররা ফতোয়া অবৈধ করেছে। এজাতীয় কিছু করার চেষ্টা করলে আইনের আশ্রয় নেব। কথাগুলো বললেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার সীমারকান্দা গ্রামের গৃহবধূ রীনা আক্তার(৩০)।

এলাকার স্থানীয় কিছু যুবক এবং গ্রামের বেশ কিছু মানুষ এই সিদ্ধান্তের বিরোদ্ধে সোচ্চার কন্ঠ তুলে। কিন্তু এলাকার সালিশকারী মুরুব্বিদের প্রতাপের কাছে তারা পেরে ওঠতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কিছু সাংবাদ কর্মির কাছে জানায় এবং সরোজমিনে এসে ব্যাপরটি জানার জন্য অনুরোধ জানায়। ঐ এলাকায় গিয়ে জানা যায় অনেক কিছু ওঠে আসে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ কিছু করুন চিত্র। এলাকার বেশ কিছু যুবক আর অধিকাংশ গ্রামবাসী নিজ গ্রামের সন্তান অভিযুক্ত মিজানের বিরোদ্ধে গিয়ে ভিনগাঁয়ের মেয়ে এই গ্রামের নির্যাতিত গৃহবধু রিনা আক্তারের পক্ষালম্বন করে যথার্থই পালন করল মানবিক নাগরিক কর্তব্য।

রিনার সাথে মিজানের বিয়েটা ছিল প্রেমের,পরিবারের বাধার মুখে কোর্ট ম্যারেজ করে দুজন। এক পর্যায়ে মিজানের পরিবারের পক্ষ থেকে রিনাকে মেনে নিলেও চলতে থাকে নিরব মানষিক ও শারিরিক নির্যাতন। গরিব পরিবারের মেয়ে রিনা দেখতে সুন্দরী হলেও মিজানের পরিবারের তুলনায় বিত্ত বৈভবে নিন্মপর্যায়ে থাকায় স্বভাবতই নিরবে মুখ বুঝে সহ্য করা ছারা আর কিছু করার ছিলনা তার। আর এই সব নির্যাতনের বিষয় নিয়ে এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে হয়েছে অনেক শালিস দরবার। সাময়িক কিছুদিন ভাল থাকলেও ধারাবাহিক ভাবেই এই নির্যাতন চলতে থাকে। আর এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার ওই গৃহবধূ রিনার স্বামী মিজানুর রহমান (৩৫) পারিবারিক কলহের জের ধরে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়।

বিষয়টি নিয়ে এলাকার লোকজন শুক্রবার জরুরী বৈঠকে বসেন। মোঃ রোশন আলী (৭৫)’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সালিসের সিদ্ধান্তানুযায়ী ইসলামিয়া শরিয়া অনুযায়ী অনাকাঙ্খীত ঘটনার সমাধানে মতামতের জন্য চার সালিসদারকে ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলহাজ্ব আব্দুল হালিম পীর সাহেবের কাছে পাঠানো হয়। ওই চার ব্যক্তি তালাক প্রাপ্তা গৃহবধূর স্বামী মিজানুর রহমান (৩৫), ভাসুর মোহাম্মদ আলী (৪৫), প্রতিবেশী আব্দুল মালেক (৬৫) ও নজরুল ইসলাম (৫৫) ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলহাজ্ব আব্দুল হালিম পীর সাহেব’র মতামত ও সিদ্ধান্তের আলোকে এলাকায় এসে গ্রাম বাসীদের নিয়ে সন্ধ্যায় আবারো বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সালিসদাররা জানান, আমাদের বক্তব্য শোনে হুজুর তালাক বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর সমাধান ইসলামী শরিয়া মতে একমাত্র ‘হিল্লা বিয়ে’। যেহেতু ‘হিল্লা বিয়ে’ সরকারী আইনে নিষিদ্ধ, সেহেতু আপনারা পারিবারিক ভাবে বসে ওলামা একরামদের নিয়ে তার সমাধানের ব্যবস্থা করুন।

ওই সিদ্ধান্তের আলোকে ভাসুর মোহাম্মদআলী জানান, হুজুরের সিদ্ধান্তানুযায়ী তালাক বৈধ হয়েছে, ইসলামিয়া শরিয়ানুযায়ী এর সমাধান ‘হিল্লা বিয়ে’র বিকল্প নেই। তা না হলে কাবিন নামার ধার্যকৃত একলক্ষ টাকার অর্ধেক দিয়ে তাকে বিদায় করতে হবে।

কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ তালাক প্রাপ্তা গৃহবধূ রীনা আক্তার। তার দাবী হিল্লা বিয়ে কুসংস্কার, অনেকে হিল্লা বিয়ে করে ফেরত দেয় না, আমার দু’পুত্র সন্তান সীমারকান্দা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ রিফাত হোসেন (১০) ও শিশু শ্রেণীর ছাত্র মোঃ সিফাত হোসেন হৃদয় (৪)’র পিতার- মাতা পরিচয়ে কলঙ্কের প্রলেপ দিতে চাই না। আমাদের বিয়ে কোর্টের মাধ্যমে হয়েছে, আজকের সমাধানও কোর্টের মাধ্যমে চাই, তবে বিবাহ বিচ্ছেদ নয়।

গৃহবধূ রীনা আক্তারের শ্বাশুরী জানান, বিষয়টি ছোট ঘটনা, গ্রামের কিছু লোক আমাদের পরিবারের মান সম্মান ক্ষুন্ন করতে বিষয়টিকে অনেক বড় করে দেখিয়েছেন। রাগের মাথায় তালাক দিয়েছে, বাইন তালাকও বলে নাই, তওবা পড়িয়ে সংসার করা যায়, এটাকে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করা, মোল্লাদের কাছে দৌর-ঝাপ উদ্দেশ্য প্রনোদীত।

গৃহবধূ রীনা আক্তারের পিতা তিতাস উপজেলার দুলারাম্পুর গ্রামের সফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৩বছর আগে আমার মেয়ের সাথে মিজানের বিয়ে হয়, বিয়ের পর থেকে পারিবারিক কলহ নিয়ে অনেক সালিস হয়েছে, মেয়েটা এখানে শান্তিতে নেই। এখন কি করব বুঝে উঠতে পারছিনা। তার শ্বশুর পরিবারের লোকজন হিল্লা বিয়ে দিতে চায়। অন্যথায় বিয়ের কাবিন নামার এক লক্ষ টাকার মধ্যে অর্ধেক টাকা দিয়ে মেয়েকে বিদায় করতে চাচ্ছে। গত দুদিন ধরে মেয়েকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয়না, কারোর সাথে কথা বলতে দেয়া হয়না।

সালিসদার আবু তাহের শেখ জানান, আমরা চারজন হুজুরের কাছে গিয়েছিলাম, হুজুর জানতে চেয়েছেন আমরা ‘লা’ মুজাবী’ নাকি ‘হানাফি’, লা’ মোজাবী’ হলে কোন মন্তব্য করবেন না, আর ‘হানাফি’ হলে তালাক বৈধ হবে। এর সমাধান এক মাত্র ‘হিল্লা বিয়ে’, হিল্লা বিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ, তাই আপনারা বসেই সিদ্ধান্ত নেবেন।

এব্যপারে অসুস্থ্য থাকার কারনে ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আলহাজ্ব আব্দুল হালিম পীর সাহেব’র সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। অফিসার ইনচার্জ(ওসি সার্বিক) স্বপন কুমার নাথ জানান, তালাকের ঘটনায় যদি কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ হিল্লা বিয়ে দিতে চায়, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

কটি সময় ছিল গ্রামের বেশীর ভাগ পারিবারিক ও নারী সংক্রান্ত গুরুত্বপুর্ন সিদ্ধান্ত আসতো কতিপয় আলেম ওলামা ও সমাজপতিদের মাধ্যমে। ঐ সব আলেম ওলামা এবং সমাজ পতিরা যে সিদ্ধান্ত প্রদান করতো তা অনায়াসেই মুখ বুঝে মেনে নিতেন গ্রামের সরল সোজা নিরিহ মানুষগুলো আর তাতে যুবকদের সম্পৃক্ততারতো কোন সুযোগই ছিল না। তবে আশার কথা এখন সাধারন মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র কতৃক প্রনিত আইন কানুন এমনকি মানবাধিকার সম্পর্কেও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে আশানুরুপ ভাবেই। যুবকরা এখন তথা কথিত সমাজপতিদের চোঁখ রাঙ্গানীর কাছে মাথানত করলেও ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে খুব সহজেই যে কোন অন্যায় অবিচারের তথ্যটি মিডিয়া কিংবা আইনশৃংখলা বাহিনির কাছে পৌছে দিতে পিছপা হচ্ছে না। আর এই সব দিক গুলি একটু ভাল ভাবে বিশ্লেষন করলে বলতেই হয় আমরা এখন এই কিছুদিন আগের তুলনায় অনেক বেশী সচেতন,আমাদের মাঝে ব্যাপক ভাবেই তথ্য প্রযুক্তির প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন শুধু দরকার ধর্মের দোহাই দিয়ে কুসংস্কারের পর্দাটি সরিয়ে দেওয়ায় ধর্মের সঠিক দিক নির্দেশনা যথাযথ ভাবে উপাস্থাপন এবং ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তির কল্যানে ধর্মিয় মুল্যবোধের উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন পুর্বক সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।