ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 


শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে বলতে চাই। পিয়ন থেকে শুরু করে সবাই কি আন্তরিক! একজন উর্ধতন কর্মকর্তা আমাদেরকে চা পান করালেন। আমি তো অবাক। একি কান্ড! আমাদের মত এত সামান্য মানুষদেরকে মন্ত্রণালয়ের কোন কর্মকর্তা চা পান করাবেন কেন! সত্যিই আমি/আমরা মুগ্ধ।

সকল স্তরের কর্মকর্তা মন খুলে আমাদের সাথে সুন্দর আচরণ করলেন। আমাদের সকল কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেন।
পিয়ন বা কেরানিরা যেন এক এক জন দাতা হাতেম তাই। তাঁরা মানুষকে সেবা করার জন্য ব্যাকুল। মহান আল্লাহ পৃথিবীতে এত সুন্দর সুন্দর মানুষকে সৃষ্টি করে কেন যে মন্ত্রণালয়ের কেরানী বা পিয়ন বানিয়েছেন! আল্লাহর কোন উদ্দেশ্য নিশ্চয় আছে। যা হোক, এ মন্ত্রণালয়ের মত যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ মানুষগুলোর জন্যই হয়তো আজো পৃথিবীটা টিকে আছে। বাংলাদেশটাও উন্নয়নের দিকে ক্রমান্নয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।


ভূমিকা রাখি। এখন কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা উল্লেখ করি।
সেদিন ছিল মঙ্গল বার। সপ্তাহের এই দিনটি আমি খুব পছন্দ করি। এই দিনেই নাকি আমি জন্ম গ্রহণ করেছিলাম।
২০১২ সালের সেই সকালে আমার বন্ধু বজলু কাঁদতে কাঁদতে মোবাইল ফোনে বলল, দোস্ত আমি বড় বিপদে পড়েছি।
আমি বললাম, কি বিপদ?
– আমার প্রোমশন হয়েছে।
– এ তো ভালো কথা। তুই কাঁদছিস কেন?
– আমি এ প্রোমশন চাই না।
– কেন?
– আমি আসলে প্রোমশনের যোগ্য না। আমার বউ এক অশিক্ষিত মহিলা। আমার প্রোমশন হলে ওর আর আমার মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাবে। সংসারের ভারসাম্য হারিয়ে যাবে।
আমি বললাম, বলিস কি? গাধা কোথাকার।
– দোস্ত, বিশ্বাস কর। আমাকে একটু আগে হুমকি দিয়েছে, বলেছে, প্রোমশন নিয়ে তুমি হাই লেভেলে চলে যাচ্ছো, আমি তোমার ঘরে আগুন দেব!
– সর্বনাশ। আমাকে কি করতে হবে বল! স্ত্রৈণ বজলুর প্রতি আমার সহানুভুতি হলো।
– শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাবো। একা ডর লাগে। তুই আমার সাথে যাবি, দোস্ত, প্লিজ, কিসলু, না করিস না।
কিসলু আমার ডাক নাম। আমি রাজি হলাম। বললাম, রাজি।


শিক্ষা মন্ত্রণালয়! একটা ইলাহি কান্ড। লিফটে চড়ে সা করে আমরা উনিশ তলায় পৌঁছে গেলাম।
করিডোরের মুখেই পুলিশ বসে আছে। বুকের মধ্যে একটু শির শির ভয় উকি দিয়ে দ্রুতই চলে গেল। বজলুকে বুঝতে দিলাম না।
আমাকে অনেকে কিসলু টাউট বা কিসলু দালাল বলে টিটকারি মারে। এরাই বিপদে পড়লে আমাকে কিসলু ভাই বা কিসলু দোস্ত বলে ডাকে। বজলু এ ধরনের একজন যে বিপদে পড়ে আমার মত টাউটের স্মরণাপন্ন হয়েছে। এ ধরনের উঁচু তলায় আমার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। পাড়া, মহল্লা, মার্কেট, জমিজমার সমস্যা ইত্যাদি বারো ভেজাল নিয়ে আমি ডিল করি।
বজলু নেম প্লেট দেখতে দেখতে আগাচ্ছে, আমি তাকে অনুসরণ করছি। করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছে সে বলল, দোস্ত, তুই একটু দাঁড়া, আমি একটু বাথরুমে যাবো।

বজলু টয়লেটে ঢুকে পড়লো। বাইরে আমি অপেক্ষা করতে থাকি। সে আমার ধৈর্য নষ্ট করে দিল। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে টয়লেট থেকে বের হয়ে এলো।
আমি বললাম, তুই কি কাজে এসেছিস না টয়লেট করতে এসেছিস।
– ডো ন্ট মাইন্ড দোস্ত। চল আজ ফিরে যাই। আজ আর কারো সাথে কথা বলবো না।
– মানে?
– বাথরুমে বসে আমার শাশুড়ির সাথে কথা হয়েছে। তিনি তার মেয়েকে বুঝাবেন।
– তা হলে আজ …..
– হ্যাঁ, আজ চল ফিরে যাই, ……..।

পরদিন সকালে আবার বজলুর ফোন। বলল, দোস্ত স্ত্রীর সাথে সমঝোতা আলোচনা ভেঙে গেছে। আজ আবার মন্ত্রণালয়ে যেতে হবে।
– ঠিক আছে। তবে দোস্ত আমার হাজার পাঁচেক টাকা লাগবে। সাথে রাখিস।
– আচ্ছা ঠিক আছে। তুই রেডি হ।
বেলা একটায় আবার আমরা মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হলাম। উনিশ তলায় পৌঁছে সেই চা খাওয়ানো স্যারের রুমে ঢুকলাম। স্যার বজলুকে বললেন, তোমার এই বন্ধুকে চিনি বলে মনে হচ্ছে।
বজলু বলল, স্যার, গতকাল ওকে দেখেছেন! তাই বোধ হয় …….
– কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ……..

-কি  সমস্যা আপনার? তাড়াতাড়ি বলেন।

-স্যার আমার প্রোমশনটা …….

-প্রোমশন হয়নি, কারণ কি? দরখাস্ত এনেছেন?

-জি, না স্যার। আমার প্রোমশন……

-দরখাস্ত কই?

-আসলে স্যার আমার প্রোমশন হয়েছে, আমি প্রোমশন চাই না, স্যার। বজলু বলে ফেলল। অফিসার ওর দিকে হা করে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

…..