ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

মাদকাসক্তদের নিয়ে বাস্তবসম্মত কোন শুমারি না হলেও বলা হয় গোটা দেশে ৪০ লাখেরও বেশী মাদকাসক্ত নিয়মিত মাদক গ্রহণ করে থাকেন। এর মধ্যে কেবল মাত্র রাজধানী ঢাকায় ২০ লাখেরও বেশী মাদকাসক্ত রয়েছে বলে ধারনা করা হয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ-তরুণীরা প্রতিদিন মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

জনপ্রিয়তা ও অপব্যবহারের শীর্ষে থাকা মাদক:১
কোডিন ফসফেট/ফেনসাইক্লিডাইন/নিকোকোডেন মিশ্রিত সিরাপ “ফেন্সিডিল”।

“ফেন্সিডিল” এক সময় কফ সিরাপ হিসেবে আমাদের দেশে উৎপাদন,বিক্রয় এবং বিপণন হতো। পরবর্তীতে এতে ব্যবহৃত উপাদান কোডিন ফসফেটের মারাত্মক ক্ষতিকর(আফিম,হেরোইন,মরফিন,প্যাথেডিন এর সমতুল্য উপাদান)প্রভাব কিম্বা এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কথা বিবেচনা করে এই সিরাপ বাংলাদেশে উৎপাদন, বিক্রয় এবং বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ততদিনে একশ্রেণীর অপ ব্যবহারকারী এই ফেন্সিডিলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ফেন্সিডিল এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভের কারণ হিসেবে বলা যায় মদ, গাঁজা, চরস বা অন্য কোন নেশা গ্রহণে চোখ লাল হওয়া, ঝিমুনি, মাতলামি, মুখে গন্ধ না থাকার কারণে অভিভাবক কিম্বা বন্ধুদের কাছে সহজেই ধরা পড়বার ভয় থাকেনা।

আমাদের প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্র ভারত। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। সেই ভারতে একটি বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক উৎপাদিত ফেন্সিডিল সিরাপ নিজ দেশে বিক্রয় এবং বিপণন না করলেও শুধু মাত্র বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে (বিপ্লব পূর্ববর্তী বর্ধিষ্ণু চীনকে ধ্বংস করার এক মাদক আগ্রাসন চালিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা; তারা গোটা চীনে আফিম এবং আফিম জাতীয় নেশার দ্রব্য সু-পরিকল্পিত ভাবে গোটা চীনে ছড়িয়ে দিয়েছিল।) বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ৩১টি জেলার ৫০টির বেশি রুট দিয়ে ফেন্সিডিল বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফেন্সিডিলের ব্যাপক চাহিদার কারণে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত: ৩২টি অবৈধ ফেন্সিডিল কারখানা গড়ে উঠার তথ্য পাওয়া গেছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানেও ভেজাল ফেন্সিডিল উৎপাদিত হচ্ছে। ফেন্সিডিল চোরাকারবারি সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, পুলিশ, RAB এর চোখ ফাঁকি দিয়ে কিম্বা তাদের সাথে যোগ- সাজিসের মাধ্যমে) আন্তঃনগর টেনে (বিশেষ করে ভৈরব জং, আখাউড়া ষ্টেশনে),সড়ক(বেনাপোল, দিনাজপুর, ব্রাষ্হ্মনবাড়িয়া, লাকসাম, কুমিল্লা) ও নৌ-পথে প্রতিদিন ৩০ লাখেরও বেশী বোতল বাংলাদেশে পাচার করছে।

আপনি যদি একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক কিম্বা সচেতন কোন নাগরিক হোন তাহলে নিম্ন লিখিত বিষয় সমূহ একজন আসক্তকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে:-

*লক্ষ্য করুন আপনার আর্থিক ভাবে সচ্ছল বন্ধুটি কিম্বা সন্তান প্রায়শই আর্থিক সংকটে পড়ে

*বৎসরের অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু বেলা করে বিছানা ত্যাগ করে কিম্বা ঘুমায়

*নিশাচরের ন্যায় রাত্র চলাফেরা করে অর্থাৎ বেলা পড়ে এলে বাইরে বেরোয় এবং ফেরে অনেক দেরীতে কিম্বা মাঝরাতে

*রাত্রি জাগা তার অভ্যাসে পরিণত হয়;এসময় তাকে ইন্টারনেট, নভেল পড়তে কিম্বা অন্যকিছুতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়

*ঘন ঘন ধূমপান, চা-কফি পান করতে দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে আসক্ত ব্যক্তিটিকে দুধ ও চিনির মাত্রা বাড়িয়ে পান করতে বেশি পছন্দ করে

*অযথা এবং অকারণে উত্তেজিত হয়ে পড়তে দেখা যায়

*অকারণে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলা শুরু করে

*আসক্ত ব্যক্তিটি পুরুষ হলে মেয়েলি বিষয়ে এবং মেয়ে হলে বিয়ে কিম্বা সংসারী হতে অনীহা দেখায়

*নির্লজ্জের মত ধার কর্জ করা শুরু করে, পাওনাদারদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়

*আপনার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে ভয়ে কুঁকড়ে যেতে পারে কখনও আগ্রাসী এবং রুক্ষ মেজাজি হতে পারে, মজার ব্যাপার হল একজন মাদকাসক্ত তার অভিভাবকের কাছে কখনোই তার মাদক গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেনা।

আগেই বলেছি আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা অংশ মাদকাসক্ত। আঁতকে উঠার মত তথ্য হল এই আসক্তদের মধ্যে সমাজের সকল শ্রেণীর পেশাজীবীরা-ই আছেন।
তাদের চাহিদা এবং নির্ভরশীলতার কারণে-ই মাদক চোরাচালানি, বিক্রেতারা বহাল তবিয়তে থাকেন।

(চলবে)

***
মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার রোধ: চাই সামাজিক আন্দোলন-১