ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

ইয়াবা:-
ইয়াবা একধরনের সিনথেটিক এমফেটামাইন ড্রাগস। মেথাএমফেটাইন ও ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে তৈরি এই ঔষধ গ্রহণে মানসিক উদ্দীপনা, উন্মাদনা, সাময়িক ক্লান্তি দুর করে এবং এর উত্তেজক উপাদানের কারণে তীব্র যৌন-কামনা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নিজেকে দীর্ঘক্ষণ নির্ঘুম এবং ক্লান্তিহীন রাখতে সক্ষম এই ড্রাগটি সর্ব প্রথম ব্যবহৃত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। জার্মান সৈনিকদের মানসিক বৈকল্যের হাত থেকে বাঁচাতে, তাদের ক্লান্তি দুর করে যুদ্ধের ময়দানে সক্রিয় রাখতে এডলফ হিটলার তৎকালীন জার্মান কেমিস্টদের এটি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এই জন্য ইয়াবাকে “নাজি স্পীড”ও বলা হয়। তথাকথিত এই ‘নাজি স্পীড’ মেথডকে কাজে লাগাতে থাইল্যান্ডে এই মাদকটি ৪০ বছরের বেশি আগে খোলা বাজারে বিক্রি করা হত, সে সময় এই ড্রাগসটি গ্যাস স্টেশনে কর্মরতরা, ট্রাক এবং লরি চালকরা নিজেদের নির্ঘুম রাখতে ব্যবহার করত। ইয়াবা’র উপর নির্ভরশীলতা ও মানবদেহের ওপর স্থায়ী ও ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বিবেচনা করা পরবর্তীতে থাই সরকার এই ড্রাগ টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়।

বাংলাদেশে এই ড্রাগসটি মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং লাওস দেশ তিনটির সমুদ্রপথ (তথাকথিত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল) এর চোরাচালান রুটের মাধ্যমে ইয়াবা তার সেবনকারীদের হাতে চলে যাচ্ছে। (বাংলাদেশে মূলত: ইয়াবা প্রবেশ করছে মায়ানমার হতে)। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ছাড়াও মাছের ট্রলার, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত এলাকা, খাগড়াছড়ির গহিন এলাকা দিয়ে ইয়াবা আসছে।
ইয়াবা লালচে,গোলাপি কিম্বা সবুজ বর্ণের চকলেট কিম্বা ক্যান্ডির ফ্লেভার যুক্ত হওয়ায় ব্যবহারকারীর আগ্রহ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়।

অনেকে শখের বশে কিম্বা বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে সাময়িক অ্যাডভেঞ্চারের আশায় ইয়াবা সেবন করে।বিকৃত যৌন-কাম চরিতার্থ করার জন্য সাথে থাকা সঙ্গী কিম্বা সঙ্গিনীকে যৌন-সম্ভোগের আশায় ইয়াবা সেবনে অন্যান্যদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

ইয়াবা সেবনে সাময়িক ঝুঁকি এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সমূহ:-

*রক্তচাপ বৃদ্ধি, রক্তনালীর স্থায়ী ক্ষতি

*অস্বাভাবিক হৃদ-স্পন্দন, হার্ট-এ্যাটাক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যু

*ঘুমের ব্যাঘাত, নার্ভের ক্ষতি, শরীরে কিছু চলাফেরার অস্তিত্ব টের পাওয়া, অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থা।

*কিডনি বিকল

*চিরস্থায়ী যৌন-অক্ষমতা যা কোন চিকিৎসায় ভাল হয়না।

*ফয়েলের মাধ্যমে সেবন করলে ফুসফুসের প্রদাহ (এ্যাডেমা/প্লুরাল এ্যাফিউশন) ফুসফুসে টিউমার এবং ক্যান্সার হতে পারে।

হেরোইন, মরফিন, প্যাথেডিন:-

শক্তিশালী পেইন-কিলার হিসেবে এ্যালোপেথিক চিকিৎসায় ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে হেরোইন মূলত: ১৮৯৮ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেরোইন ডায়ামরফিন (diamorphine) হিসাবে পরিচিত। ১৯৯০ সালের শুরু থেকেই এটি চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু করে। আফিম ফুলের (opium poppy) নিরযাস থেকে উৎপাদিত মরফিনকে ১৮৭৪ সালে প্রথম রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমএ হেরোইনে রূপান্তর করা হয়। এই আফিম হাজার বছর আগে থেকেই উৎপাদিত ও নেশার উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে বলে জানা যায়।

হেরোইন হিসেবে প্রস্তুতের পরপরই গোটা বিশ্বব্যাপী এর অপ-ব্যবহার ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এর আসক্তি এবং নির্ভরশীলতার কথা ভেবে-ই ১৯১৪ সালে হেরোইনকে নারকোটিক অ্যাক্টের আওতায় আনা হয় এবং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

পরিসংখ্যানে জানা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন আফিম অথবা ৫শ টন হেরোইন উৎপাদন হয়।বর্তমানে আফগানিস্তানে বিশ্বের ৯০ শতাংশ আফিম, ৮৫ শতাংশ হেরোইন ও মরফিন উৎপাদিত হয়ে আসছে। আফগানিস্তানের পরেই চীন, মিয়ানমার, মেক্সিকো, ইরান, পাকিস্তান, প্রভৃতি দেশে আফিম উৎপাদিত হচ্ছে।এছাড়া ভারত, নেপাল বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও বিচ্ছিন্নভাবে আফিম চাষ হচ্ছে।
আগেই বলেছি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসকে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বলা হয়। এই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল মাদক চোরাচালানিদের স্বর্গরাজ্য। এই রুট দিয়ে গোটা ইউরোপ, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য এবং চীন সহ গোটা বিশ্বে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। সারা বিশ্বে বছরে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের হেরোইন কেনা-বেচা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রূপে হেরোইন পাওয়া যায়।সাদা, কালচে বাদামি, হাল্কা বাদামি, মাটি বা ক্ষেত্র বিশেষে আলকাতরার মত গলিত অবস্থায়ও এটি পাওয়া যায়। যদিও সাদা রংয়ের পাউডারটি-ই আন্তর্জাতিক বাজারে বেশী প্রচলিত এবং সবচেয়ে বেশি দামি এবং এটিকে আসল হেরোইন বলা হয়।

বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অদক্ষতা,অপেশাদার মনোভাব, দুর্নীতি-গ্রস্ত প্রশাসন, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অকারযকর ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিরা বাংলাদেশকে হেরোইন সহ সকল মাদক চোরাচালানের রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে।

১৯৭০ ও ১৯৮০ সালের দিকে মিয়ানমার ছিল বিশ্বের প্রধান আফিম উৎপাদক। এক তথ্যে জানা যায় মিয়ানমার এবং লাওস দেশ দুটি মিলে ২০০৮ সালে ৪০ মেট্রিক টন হেরোইন তৈরি করেছে, যার পুরোটাই মিয়ানমারে রিফাইন হয়।

উৎপাদিত এই হেরোইনের একটা বড় অংশই বাংলাদেশ হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন পাচার হয়ে আসছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১ লাখেরও বেশী হেরোইন আসক্ত রয়েছে বলে ধারনা করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যত ধরনের মাদকদ্রব্যের অপ-ব্যবহার হচ্ছে হেরোইন, প্যাথেডিন আসক্তি মানবদেহে সবচেয়ে বেশী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিম্বা নির্ভরশীলতা বাড়ায় বলে জানা গেছে।

হেরোইন মূলত: শরীরের কেন্দ্রীয় স্নায়বিক সিস্টেমে আঘাত করে,আসক্ত ব্যক্তি শাররীক ও মানসিক ভাবে এই মাদকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর তাই একজন হেরোইন আসক্তকে নির্ধারিত সময় বা বিরতির পরপরই নেশা গ্রহণ করতে হয়।

নেশা গ্রহণের মধ্যবর্তী এই সময়টিকে মাদকাসক্তরা “বেরা”(উইদড্রল সিম্পটম)বলে থাকে। এসময় মাদকাসক্ত ব্যক্তিটির তীব্র মানসিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে, প্রচণ্ড উত্তেজিত ও ধ্বংসাত্মক হয়ে পড়ে, এছাড়া ঘন ঘন হাই তোলা, শরীরে জ্বালা-পোড়া, গা ব্যথা(মাংসপেশি ও গাঁটে ব্যথা), শরীরে প্রচণ্ড খিঁচুনি দেখা দিতে পারে, তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে। নেশা গ্রহণে মরিয়া হয়ে উঠা আসক্ত ব্যক্তিটি এ সময় নেশার টাকা জোগাড়ে যে কোন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা গেছে মা, বোন কিম্বা আত্মীয়ার কান ছিঁড়ে তার কানের দুল নিয়ে পালিয়েছে, নেশার টাকা না দেয়ায় পরিবারের সদস্যদের খুন করার মত অহরহ ঘটনা আমরা খবরের কাগজে পড়ছি।

হেরোইন আসক্তির কুফল:-

* শারিরীক এবং মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া

* অপরাধ প্রবণ হওয়া; চাঁদাবাজি, অপহরণের মত সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়া

* সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, তথা পরিবারের বোঝা হয়ে পড়া

* সব ধরনের বিশ্বাস যোগ্যতা এবং গ্রহণ যোগ্যতা হারানো

* শিক্ষা, চাকুরী কিম্বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমাজের জন্য বাড়তি বোঝা হিসেবে বেঁচে থাকা

পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:-

* ফুসফুসে ক্যান্সার, টিউমার

* হৃদরোগ, মাত্রাতিরিক্ত সেবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধে মৃত্যু

* কিডনি বিকল

* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাংসপেশিতে পচন, নিউমোনিয়া

* লিভারে প্রদাহ, এ্যাবসেস, লিভার সিরোসিস, হেপাটাইটিস

* এইচ আই ভি(এইডস) সংক্রমণ

(চলবে)

***
মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার রোধ: চাই সামাজিক আন্দোলন-১
মাদকাসক্তির ভয়াবহ বিস্তার রোধ: চাই সামাজিক আন্দোলন-২