ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন


সৌদি আরবে ঈদের জামাত পড়তে হলে ফজরের নামায পড়েই মসজিদে ছুটতে হয়, যেগুলো অনেক অনেক দূরে অবস্থিত।

আমি বাঙালি অধ্যুষিত আরবাইন নামক স্থানে ফজরের পরপরই চলে গেলাম। জামাত কয়টায় হবে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পেলাম না।
কেউ বলে সাড়ে ছটায়, কেউ সাতটায়। ঘড়িতে দেখি মাত্র সাড়ে পাঁচটা বাজে। সারারাত ঘুমোইনি। ঝিমুনি আসছিল। ঝিমুনি কেটে গেল ২৭/২৮ বছরের এক বাঙালি যুবকের আকুতি দেখে! সাহায্য চাইছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। সে যা বলল তার সারমর্ম করলে বিষয়টা এমন যে, কোন এক কনস্ট্রাকশন কোম্পানির লেবার, কাজ করতে গিয়ে উঁচু স্থান থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছে এবং পায়ে স্টিলের পাত লাগানো, কোন কাজ করতে পারেনা। বেকার। সে ভিক্ষাটাও ঠিক মত করতে শিখেনি। বলল, “ভাই, আপনারা যে যা দিবেন নামাজের পর দিবেন, আমি দরজায় বসব।”
চারপাশে বেশ গুঞ্জন শুরু হল। কেউ বলে, “আরে মিয়া এখনই যা পান নিয়া যান, মসজিদের কত্তোগুলা দরজা, কে কোনহান দিয়া বাইর হইব ঠিক আছে না কি!”
কেউ, “বলে ভণ্ডামি, পা ভাঙছে? এইটা তার ব্যবসা, কেউ বলে ভাঙে নাই ইচ্ছা কইরা এমনে হাঁটতাছে”।
শুরু হল চারপাশে আলোচনা। “আমরা কি সুখে আছি, আমাদের দুঃখ কষ্ট দেখার কেউ নাই।”
এমবাসিতে ঢুকলে দুর দুর কইরা তাড়ায়া দেয়, সব কয়টা চোর ইত্যাদি ইত্যাদি।
কেউ বলে, “বাঙালির তো পুরা মিডল-ইষ্টেই বদনাম! যত অপরাধ এই দেশে হয় তার অধিকাংশই বাঙালিরা করে থাকে।”
কেউ বলে,”নেতা নেত্রীরাই এসব চোর-বাটপারদের লালন, পালন করে, তাঁদের আচরণ বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।”
আমার পাশে যারা ছিল আমি তাঁদেরকে বললাম, “ভাই ছেলেটি কিন্তু সত্যিই অসহায় এবং তাঁর পা যে ভেঙেছে সেটাও ঠিক।”
সবাই চেপে ধরল, “আপনে কি কইরা বুঝলেন, আপনে কি ডাক্তার, আপনার লগেই থাকে?”
হতাশা চেপে না রেখেই ভ্রু কুঞ্চিত করে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম,” এ দেশে কারা ভিক্ষা করে?”
সবাই সমস্বরে জবাব দিল, “পাকিস্তানিরা ফাস্ট। সেকেন্ড হইল ইন্ডিয়ান।”
আবার শুধালাম,” তারা যখন ভিক্ষে করতে আসে তাদের হাতে থলে বা পলিথিন ব্যাগ থাকে কি না?”
“হুম থাকে”। জবাব এলো সাথে সাথেই।
“তাহলে ভাল করে লক্ষ্য করে দেখুন ছেলেটার মুখ কেমন ফ্যাঁকাশে সাদা হয়ে গিয়েছে!! এই যে ফ্যাঁকাসে গায়ের রং তার অন্যতম কারণ হলো সে বাসা ছেড়ে বের হয়না, এখন গ্রীষ্মকাল এই গরমে তার মুখে রৌদ্রে পোড়া একটা ছাপ থাকতো।
তাছাড়া যুবকটির চোখে মুখে গভীর অসহায়ত্ব লক্ষ্য করে দেখুন।”
আমার পাশে একজন ৪৮/৪৯ বছরের দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক বসে এতক্ষণ কথা শুনছিলেন। আমায় বললেন, “ভাই কি বলব আমাদের দেশে যা শুরু হয়েছে, মানুষের ঈমান আমানের জোর কমে গেছে। আল্লাহ-ভীতি নাই, পাপী ও গুণাহগারীদের বিরুদ্ধে তাঁর শাস্তির কথা কেই স্মরণ করে না।”
আমি আগ্রহী হয়ে তার কথা শুনছি। ভদ্রলোক বলে যাচ্ছেন, “এর জন্য প্রত্যেক মুসলমানের ঈমান ও আক্বিদায় বিশ্বাস থাকতে হবে, দাওয়াত দিতে হবে।
ইসলামের শত্রু সরকার ও দলকে সমর্থন দেয়া যাবেনা, নারী নেতৃত্ব আমাদের লজ্জায় ফেলে দেয়, আমাদের দেশে কি একজন পুরুষ নাই!”
“খাইছে! আমার পাশেই রাজাকার বসে! ওমোর আল্লাহ!”
খোঁচা দিয়ে তার পেটের কথা বের করার একটা তাগিদ ভিতরে ভিতরে!
সে বলল, “আজকে দেশে একদলীয় সরকার কায়েম হয়েছে, দেশের মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, আইন শৃঙ্খলার অবনতি সব মিলিয় ফুঁসে আছে।
এক মাত্র বিএনপি পারে এই সরকারের গদি টলমল করে দিতে। বিএনপি ইচ্ছে করলে সরকারকে গদি ছাড়া করতে পারে। কিন্তু তারা করতে পারছে না।দলে ত্যাগী নেতা নেই, ছিন্নমূল পর্যন্ত সংগঠন অত্যন্ত দুর্বল, বাঘা বাঘা গুলো জেলে, বাকি নেতারা হয় মামলার ভয়ে না হয় পুলিশের প্যঁদানির ভয়ে রাস্তায় নামেন না।
মঈনউদ্দীনরা বিএনপিকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে…”

“ভাই আপনার বাড়ী কোথায়?”
“মাদারীপুর”
“মাদারীপুরের লোক হয়ে জামায়াতের তালিম কোথা থেকে পেলেন?”
লোকটি ঈষৎ চমকে জানতে চাইল,” আমি জামাত করি সেটা কি করে বুঝলেন!”
জানালাম, ” ইসলাম, দাওয়াত, ঈমান আক্বিদার কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে যারা রাজনীতি করে তাদের ভাষা আর আপনার ভাষা এক!
তাছাড়া নারী নেতৃত্ব নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন তাও প্রমাণ করে আপনি জামাত করেন। অথচ আপনারা এক সময় দুই নারীর সহানুভূতির সুযোগ নিয়ে দলকে শক্তিশালী করেছেন! তলে তলে এতো বিদ্বেষ কেন মামা!!”

“ঠিক ধরেছেন, আমি ১৯৮৬ সালে কামরাঙির চর পাবনা বাড়ি নামক একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। তখনই দাওয়াত পাই।” জবাব এলো।
জানতে চাইলাম, “নিজামী সহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের সাজা হয়ে যাচ্ছে, আপনারা নিজেরা চুপ থেকে এটা কেন আশা করছেন বিএনপি একটা নির্বাচিত সরকারকে
চাইলেই উৎখাত করে দিতে পারে? আপনারাও তো ৪ দলীয় জোটে আছেন, আপনাদের নেতারা কি পরিকল্পনা করছেন?”
” হাজার হাজার মুজাহিদ তৈরি হয়ে গেছে, শুধু হুকুমের অপেক্ষায় আছে। আরেকটা কথা জেনে রাখুন সারা দেশে আমাদের ভোটের শতকরা অংশের পরিমাণ কম নয়।”
ব্যঙ্গাত্মক হাসি সামলে না রেখেই সরাসরি বললাম, “এতোই যখন পারেন তখন এটা কেন আশা করছেন বিএনপি আন্দোলন শুরু করবে আর আপনাদের তথাকথিত মুজাহিদগন
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবে? ইসলাম ধর্মের কোথায় এ ধরনের জিহাদের কথা বলা হয়েছে? ”

“আপনারা হয়ত জানেন না আওয়ামীলীগ অনেক ভুল করছে, সামনে আরও করবে, আর আমরা একক লড়াইয়ের জন্য এখনও প্রস্তুত নই। তাই রাজাকার অপবাদ নীরবে সয়ে যাই।”
তার কথা শেষ হবার আগেই ঈদ জামাতের তাকবীর শোনা গেল, নামাজে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জিজ্ঞেস করলাম, আমি সাইফ ভূঁইয়া। আপনি?
ইদ্রিস। মোহাম্মদ ইদ্রিস।

***
কানাডা থেকে দি বেঙ্গলি টাইমস এ প্রকাশিত