ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

১৯৮০ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় মার্ক এঞ্জেলোর নেতৃত্বে নদী বাঁচাও আন্দোলনের সূচনা হয়। এরপর ২০০৫ সালে বিশ্ব নদী দিবস জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ রবিবার দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। ‘অভিন্ন নদীতে অভিন্ন অধিকার’ স্লোগানে বাংলাদেশে এবারের নদী দিবস উদযাপিত হচ্ছে।

৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশ বাংলাদেশকে এক সময় বলা হত নদীমাতৃক দেশ। দেশ জুড়ে বয়ে চলা ২৩০টি নদীর বুক চিরে একসময় সারাদেশ ব্যাপী নৌকা-লঞ্চ-স্টিমারের আনাগোনায় মুখরিত ছিল।

নদী তীরবর্তী অনেক অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল পণ্য উঠানামার বন্দর। বর্ষায় নদীগুলো যখন পানিতে টই-টম্বুর তখন গেরস্তের ঘরে উঠত পাকা আউশ ধান, সোনালী আঁশের পাট বিক্রির ধূম পড়ে যেত।

কৃষকের হাতে তখন নিরবচ্ছিন্ন সময়। শুরু হতো বৌ-ঝিদের বাপের বাড়ীতে নাইওর আনা নেয়া।

থই থই পানিতে ভরা বিলে থোকায় থোকায় শাপলা ফুটে থাকত। পানকৌড়িদের ডাকে বিলে আছড়ে পড়ত অদ্ভুত শব্দ। গায়ে শিহরন জাগাত। কিশোর কিশোরীরা দলে দলে ডেঁপ কুড়াতে, নাইতে নেমে যেত। জেলেরা স্রোত মুখে নানা রকমের জাল দিয়ে, চাই পেতে মাছ ধরত। শুকনো মৌসুমে মাছ ধরবে বলে নতুন জাল বুনত। স্বাধীনতার অল্প ক’বছরের মধ্যেই চাল-চিত্র পাল্টে যেতে থাকে।

আজকের শীর্ণকায়া নদীগুলো শুধুই কালের সাক্ষী হয়ে মানচিত্রের বুকে ক্ষীণ রেখা হয়ে আছে। এর জন্য কে দায়ী?

১। আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশের আগ্রাসী মনোভাব আমাদের নদীগুলোর অপ-মৃত্যুর অন্যতম কারণ। দেশটি দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর ৪৭টির উজানে অযৌক্তিক ভাবে দুই শতাধিক বাঁধ নির্মাণ করেছে । এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফারাক্কা বাঁধ। এই সমস্ত বাঁধের কারণে এবং দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন চুক্তির প্রতি ভারতের অবজ্ঞা প্রদর্শন, প্রাপ্য পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান না করায় দেশে এখন ভরা বর্ষা মৌসুমেও নদীগুলো পানিশূন্য থাকছে।

তিস্তার পানি দেশটি একতরফা ভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে তিস্তা চুক্তি এজেন্ডায় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির বাধার কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি এটা ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর হুমকিতে পরাস্ত হয়েছিলেন কি-না তা মাওলানা ভাসানীর মত লং-মার্চ করা (ফারাক্কা অভিমুখে) নেতা বেঁচে থাকলে বলতে পারতেন।

এছাড়াও ভারত টিপাই মুখে বাধ দিয়ে সংশ্লিষ্ট নদী গুলোকে আরও এক দফা পানিশূন্য করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। দেখার কেউ নাই।

২। অধিকাংশ নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে গিয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট, সেতু নির্মাণের কারণে নদীর গতিপথ বদলেছে। এক কথায় বলা যায় যত্রতত্র বাঁধ, পোল্ডার ও এমব্যাংকমেন্ট নির্মাণ নদীগুলোর গতিপথ বদলে দিয়েছে। এছাড়াও শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখার জন্য যে সমস্ত খাল, ডোবা, বিল, হাওর ছিল তা বিলীন হয়ে গিয়েছে কিম্বা ভূমি-দস্যুদের কবলে পড়ে ভরাট হয়ে গিয়েছে।

৩। অপরিকল্পিত শিল্প, কল-কারখানার অনুমোদনের কারণে এবং এসব শিল্প, কল-কারখানার বর্জ্য ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বা পরিশোধন না করে সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ করার কারণে।
ক্যামিকেল বর্জ্য, পলিথিন এবং আবর্জনা নিক্ষেপ করে নদী দূষণ করা হচ্ছে।

৪। মানুষের লোভের কাছে পরাস্ত হয়েছে আমাদের নদীগুলো। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বংশী, তুরাগ নদীর মত অনেক নদী অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে যাচ্ছে। ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধের দুই পাশ বালু উত্তোলনকারী ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গুলোর হাতে দখল হয়ে গেছে।

নদী গুলো রক্ষা করতে হবে। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। বর্তমানে ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর যেভাবে নীচে নেমে যাচ্ছে তাতে আগামীতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা, বন্যা মহামারী, খরা দেখার জন্য আমরা তৈরি হবো নাকি নদীগুলো রক্ষায় সোচ্চার হব, “ভাবনাটি আপনার”।

***
বুড়িগঙ্গা জবর দখল নিয়ে এই ব্লগে আমার আরেকটি লেখার লিংক দেখুন।
শহর রক্ষার বেড়িবাঁধ: যেখানে সীমান্ত তোমার সেখানেই দখল আমার

***
ছবি: ইন্টারনেট