ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

গোটা বিশ্বে প্রতি ১২ জনে একজন! আপনিও হতে পারেন তাদের অন্যতম!

বর্তমান বিশ্বে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক ভাইরাস “হেপাটাইটিস”এর যত দ্রুত সংক্রমণ ঘটছে তার ভয়াবহতা এইডসের চেয়েও ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ নিয়ে গোটা মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হেপাটাইটিস বা লিভারের একিউট এবং ক্রনিক সংক্রমণের জন্য দায়ী লিভার ভাইরাসগুলো হচ্ছে হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, হেপাটাইটিস-ডি এবং হেপাটাইটিস-ই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে দুই বিলিয়ন বা ২০ কোটি লোক এই সমস্ত ক্ষতিকারক ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার। এদের মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন লোক ক্রনিক সংক্রমিত। প্রতিবছর সারা বিশ্বে শুধু হেপাটাইটিস বি ও সি’র সংক্রমণে মারা যাছে সাড়ে ১০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগ নাগরিক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি বাহক। এতেই বোঝা যায় কি ভয়াবহ থাবা বিস্তার করে ভাইরাসগুলো একের পর এক প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে!

হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ কি করে হয়:
অনিরাপদ যৌনতা/অবাধ যৌনতা, একই সিরিঞ্জ, সুঁই বারবার ব্যবহার করা, শরীরে উল্কি আঁকা, স্যালুনে ব্যবহৃত ক্ষুর, রেজর, ব্লেড, কাঁচি হতে হাসপাতালে হেপাটাইটিস বি আক্রান্তদের পরিচর্যার কারণে, ডেন্টিষ্টের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত(অনিরাপদ) যন্ত্রপাতি, সিরিঞ্জ এ মাদক নেয়া, হেপাটাইটিস ‘বি’ বাহকের সিগারেট, লালা, তার সংস্পর্শে থাকা,
আক্রান্তের রক্ত নেয়া, নবজাতকের আক্রান্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে মায়ের বুকের বুকের দুধ থেকে,যদি মা হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমিত থাকেন।
(বাবা মায়ের যেকোনো একজন আক্রান্ত থাকলে তাদের নবজাতক আক্রান্ত হতে পারে)

হেপাটাইটিস ‘বি’ এর উপসর্গ:
খুব সহজে বোঝা যায়না ঠিক কবে ভাইরাসটি মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছে. দীর্ঘদিন বসবাস করে কোনরকম উপসর্গ ছাড়াই। এক সময় মাথা ব্যথা, ফ্লু, শীত শীত ভাব,গায়ে প্রচণ্ড জ্বর, জন্ডিস, লিভার এবসেস, বমি, পেটের ডান দিকে প্রচণ্ড বা হালকা ব্যথা বোধ থাকতে পারে।

রোগ নির্ণয়:
উপসর্গ গুলো দেখে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন। রক্তের HBsAg পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। এছাড়াও উপসর্গ দেখে, লিভারের Ultra Sound, HBsAg, SGOT, ALT, BILLIRUBIN , AST CT Scan ,Andoscopy ইত্যাদির মাধ্যমেও রোগের জটিলতা নির্ণয় করা হয়।

নিরাময় বা চিকিৎসা:
হেপাটাইটিস ‘বি’ এর শতভাগ সফল চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবিত ঔষধ গুলো ভাল ফল দিছে বলে গবেষকরা দাবি করলেও আপাত কোনও বিশ্বস্ত ঔষধ বাজারে আসেনি। হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্তের চিকিৎসা শুরু করবার আগে যেটা নিশ্চিত হতে হয় তা হল ভাইরাসের DNA (পরিমাণ ও ধরন) পরীক্ষা। DNA পরীক্ষা যদি পজিটিভ হয় তবে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নিশ্চিত হয়ে নেন আক্রান্ত রোগীর Portal Hypertention অথবা অন্য কোন জটিলতা আছে কিনা।

তার ফাইব্রোসিস পরিবর্তন বা সিরোসিস হয়েছে কিনা, এসোফেগাল ভ্যারিক্স (গলবিলের নিচের অংশে এক ধরনের রক্ত-বাহিত শিরা)এ কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা। সাধারণত লিভার এর পরিবর্তনের(সিরোসিস) সাথে সাথে এসোফেগাল ভেরিক্স গুলো বদলে যায়। রক্তের ক্রমাগত চাপে এই ভ্যারিক্স গুলো ছিঁড়ে গিয়ে রোগীর নাক-মুখ দিয়ে রক্তপাত ঘটতে পারে, এবং রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
উন্নত বিশ্বে ভ্যারিক্স চিকিৎসায় এক ধরনের কৃত্রিম রক্তনালী (Steosis) তৈরি করে লিভারের অকার্যকর অংশ থেকে রক্তনালী সরাসরি ভ্যারিক্স এ প্রবাহিত করা হয়।

বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশে EVL বা এসোফেগাল ভ্যারিক্স লাইগেশন পদ্ধতি চালু আছে। তুলনামূলক ভাবে যার খরচ অত্যন্ত কম। মাত্র ১০/১২ হাজার টাকায় ৩/৪ টি ভ্যারিক্স লাইগেশন করা সম্ভব।
এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর ডায়াবেটিক বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা জেনে নিয়ে রোগীর জন্য থেরাপি নির্ধারণ করবেন।

হেপাটাইটিস ‘বি’ এর চিকিৎসায় এখন মুখে খাবার টেবলেট বেরিয়েছে যা খুব বেশি ব্যয় বহুল নয়। কার্যকর চিকিৎসা হলো ইন্টারফেরন, পেগালিটেড ইন্টারফেরন আলফা ২-বি বা পেগাসিস। সাথে মুখে খাবার ঔষধ ল্যামিভুডিন, এডিফোভির আর সর্বশেষ সংযোজন টেলবিভুডিন,টেলিপ্রাভির ইত্যাদি। উন্নত চিকিৎসার আশায় আজকাল অনেকেই বাংলাদেশ ছেড়ে ব্যাংকক,ভারত কিম্বা থাইল্যান্ডে যান।
আসলে আমাদের দেশে মলিক্যুলার Biology, অণুজীব বিজ্ঞান গবেষণা এবং এ ধরনের রোগ নির্ণয়ের যে সমস্ত ল্যাবরেটরি আছে তা মানসম্মত নয় বিধায় অনেক রোগীকে তার PCR পরীক্ষার জন্য রক্ত ভারত-সিঙ্গাপুর প্রেরণ করতে হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ল্যাব এই টেস্টগুলো করছে তবে মোটেও নির্ভুল পরীক্ষা করতে পারছেনা।

আমাদের দেশের আলট্রা-সাউন্ড মেশিনগুলোর মান কিম্বা সনো-লজিস্টদের দক্ষতা এতই কম যে তারা সঠিক ভাবে রোগ নিরূপণ করতে পারেনা। এরপরেও বর্তমানে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ এর চিকিৎসায় ডাক্তার গন পাশ্চাত্যের তুলনায় ভালো ফল পাচ্ছেন।

হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত রোগীর জন্য কতিপয় টিপস:

যৌন সম্ভোগের সময় কনডম ব্যবহার করুন। কাচা সালাদ, ফল-মূল বেশি খাবেন। তেল-চর্বি যুক্ত খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। লাল মাংস খাবেন না। লবণ বা সোডিয়াম সল্ট একেবারেই খাবেন না। ভিটামিন বি, এন্টি-অক্সিডেন্ট যথা বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই যুক্ত খাবার বেশি খাবেন। প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটবেন। ব্যায়ামের অভ্যাস করবেন। দিনে একবেলার বেশি ভাত খাবেন না, দুই বেলা রুটি খাবেন। ধূমপান, মদ্যপান নিষিদ্ধ।
অযথা কোন Multivitamin খাবেন না। প্রচুর বিশ্রাম নিন। শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করুন।

পাঠকের উদ্দেশ্যে বলি, “আপনি আজ-ই HBsAG পরীক্ষা করে নিন। নিজের এবং পরিবারের সবার। যদি এখনও সংক্রমিত না হয়ে থাকেন তবে অতি দ্রুত হেপাটাইটিস-বি এর প্রতিষেধক টীকা নিন।
হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে প্রতিরোধ-ই একমাত্র উপায়।

কানাডা হতে “দি বেঙ্গলি টাইমস” -এ প্রকাশিত নিবন্ধ:
আপনি কি ১২ জনে ১ জন?