ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ একটি নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের নলের জোরে উৎখাত করে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হন এক বিশ্ব বেহায়া এরশাদ। তৎকালীন আওয়ামী লীগের মুখপাত্র শেখ সেলিমের “দৈনিক বাংলার বাণী” সামরিক শাসনকে স্বাগত জানিয়ে পরদিন খবর ছাপে। যার শিরোনাম ছিল,

“কালো রাত্রির অবসান”। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেদিন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আই এম নট আন-হ্যাপি!” জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এরশাদের প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি বিদায় নেবেন। তিনি তা করেন নি।
তাঁকেও ক্ষমতার লোভে পেয়ে বসে। শুরু করেন দল বদল আর পালটি মারা নেতাদের ভাগিয়ে এনে নতুন দল করার প্রক্রিয়া।
আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা মিজানুর রহমান চৌ, বর্তমান অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শাহ মোয়াজ্জেম এর মত নেতারা সেইদিন দলত্যাগ করে, বি এন পি হারায় তাদের অনেক বর্ষীয়ান নেতা।
অন্যদিকে সচেতন ছাত্র সমাজ সামরিক শাসন মেনে নেয়নি শুরু থেকেই।

গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তাঁরাই সর্বপ্রথম সামরিক আইন অমান্য করে মূলতঃ বিতর্কিত শিক্ষানীতির বাস্তবায়নের প্রতিবাদে, ১৪৪ ধারা অমান্য করে।
১৯৮৩ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে খুনির পেটোয়া বাহিনীর হাতে আয়ুব, জাফর, দীপালী সহ ৪৫-৪৯ জন ছাত্র ছাত্রীর রক্তে খুনীর হাত রঞ্জিত হয়।
এ মাসেই শেখ হাসিনা, মেনন, জলিল, সাহারা, মতিয়া সহ হাজার ছাত্রনেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
গুলিস্তানে ছাত্র মিছিলে ট্রাক চাপা দিয়ে পিষে মেরে ফেলা হয় বেশ কজন ছাত্র নেতা এবং কর্মীকে।
শুরু হয় স্বৈরাচার উচ্ছেদ আন্দোলন। ছাত্রদের মাঝ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, “স্বৈরাচার উচ্ছেদ না করে ঘরে ফিরব না”।

সেসময়ের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন মান্না, আক্তারুজ্জামান, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন,মোস্তাক আহমদ, সামসুজ্জামান দুদু,আসাদুজ্জামান রিপন, নিলু, নুরুল ফজল বুলবুল, মুকুল বোস, আব্দুল্লাহ আল মামুন(ব্যারিস্টার) এডভোকেট আবেদ রাজা, এডভোকেট মঞ্জিল মোর্শেদ, জাহির উদ্দিন স্বপন, জাহাংগির সাত্তার টিন্কু, শফি আহমেদ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ,শিরিন সুলতানা, নাজিম উদ্দিন আলম, নিরু-বাবলু, খায়রুল কবির খোকন, আমান উল্লাহ আমান প্রমুখ।

এসময় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে ঘোষণা দেয়, “স্বৈরাচারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়, যারা এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে তারা জাতীয় বেইমান।”

আন্দোলন বেগবান হয়। ঢাকা থেকে সর্বত্র ছড়িয়ে পরে এরশাদ বিরোধী বিক্ষোভ।
একে একে রাজপথে জীবন উৎসর্গ করে সেলিম, দেলোয়ার, বাবুল, ফাত্তাহ, রাওফুন বসুনিয়া,,,,অনেকে দুঃসহ কারাবরণ নির্যাতনের শিকার হন।

বিদেশের চাপে এরশাদের একটি নির্বাচন দেখানো অত্যন্ত জরুরী ছিল। আন্দোলনরত দলগুলো জানত সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব নয়।
একেবারেই শেষ সময়ে রাতের আধারে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জামাতের সাথে গাঁট ছড়া বেধে নির্বাচনে অংশ নেবার ঘোষণা দেয়!
বি এন পি নির্বাচন বয়কট করে।

১৯৮৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল দেশের কলঙ্কিত নির্বাচনের অন্যতম একটি নির্বাচন। আজকের সাকা চৌ,তার সহোদর গিয়াস কাদের চৌ চিটাগাং এর হেভি ওয়েট
প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌকে পরাজিত করে জাতীয় পার্টির টিকেটে সংসদে আসেন।
রাতের আঁধারে জামাতের সাথে নির্বাচনে কেন অংশ নিয়েছিল সেই ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যতম বড় শক্তির দলটি আজও দেয়নি।

জামাতের পাশাপাশি সংসদে বসে, ৭১-র যুদ্ধাপরাধীদের নেতা, আমির গোলাম আজমের পা ছুঁয়ে সেদিন আশীর্বাদ চাওয়ার পেছনে কোন রাজনৈতিক দর্শন কাজ করেছিল(!!) তা বুঝতে না পারলেও শুধু চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক দল শিবির ১৯৮৬ সালের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে!
বামপন্থী দলগুলো এটা মেনে নিতে পারেনি।

অনিবার্য পতনের মুখে এরশাদ “লাইভ পেয়ে গেল”(সেদিন ৯৬ ঘণ্টার হরতাল ছিল)
এরশাদের সাথে সখ্যটা বেশিদিন টিকলো না। তারা সংসদ ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

আন্দোলন তুঙ্গে উঠলো নভেম্বরে শহীদ নূর হোসেন বুকে পিঠে ” গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক” কথাটি লিখে খুনিদের টার্গেট প্রাকটিসের শিকার হলো নভেম্বর এর ১০ তারিখ।
দুর্বার জনতা তখন ঢাকা মুখী। সব কিছু অচল। এমনি এক সময়ে খুনিরা কেড়ে নিলো ডাঃ মিলনের প্রাণ।
শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের পতন হলই।
ঢাকাবাসীর সেদিনের উচ্ছ্বাস যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে, আমরা ৭১ দেখিনি। আমাদের কাছে এটাই ছিল ৭১ এর যুদ্ধ জয়ের মত!”
জনতা বিমান বন্দর মুখি! খুনিরা যাতে দেশ ছেড়ে না পালাতে পারে। রেডিয়োতে একটু পর পর তিন-দলের বিবৃতি।
গায়ের পশম শিউরে উঠা!
**************
স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালির স্বপ্ন ছিল শোষণ, বঞ্চনা, অধিকার আদায়ের স্বপনে বিভোর আর আত্ম-নির্ভরশীল একটি জাতির।
**************
১৯৮২-১৯৯০ আন্দোলনরত লাখো জনতার স্বপ্ন ছিল সকল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একাত্মতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
**************
এরশাদ এখন দিবা স্বপ্নে বিভোর, খুনীর সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষমতাসীনদল আরেকটি নির্বাচনী বৈতরনী পেরুতে চায়!
**************

পাদটীকা: আমার মত যত টোকাই দীর্ঘদিন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে ছিল তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া শিক্ষা জীবন, সময় গুলো ফেরত চায়,
জানতে চায় চারপাশে আজ শত শত কাকের আমদানি কোত্থেকে হয়েছে! এদের কোনদিন রাজ পথে দেখা যয়নি! যারা আন্দোলন সংগ্রামে ত্যাগী তারা কোথায়?
সুলতান মোহামদ মনসুররা আজ কোথায়?
কেন তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুল কাদের, আব্দুল জলিল, আমির হোসেন আমু’রা নয় মন্ত্রিত্ব পায় এমন লোকজন যারা রাজপথ কি তা কোনদিনই উপলব্ধি করতে পারেনা?
চারপাশে উপদেষ্টা এরা করা? এদের কি দায় দলের প্রতি, দেশের প্রতি?

(মূল লেখাটি হতে সংকলিত)