ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

সবেমাত্র উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ। ভাবছিলাম রাঙামাটি পুলিশ লাইনে দুলাভাইয়ের ওখানে চলে যাব। দুলাভাই (চাচাত বোনের বর) পেশায় একজন ডাক্তার। একটা টিলার উপর বাসা। এত উপর থেকে তাকালে বিস্তীর্ণ অঞ্চল হালকা কুয়াশা চাদরে আবৃত মনে হয়! দূর পাহাড়ের দিকে তাকালে কেবলই মনে হয় ধোঁয়ার কুন্ডুলি উপরে উঠে যাচ্ছে! সামনেই নদী। তীরে বাধা সারি সারি সাম্পান। বাঁশ কেটে জড়ো করা হয়েছে নদীতে। দুরে কোথাও চালান দেয়া হবে। কিছুক্ষণ পরপর ইঞ্জিন চালিত সাম্পান ভট ভট শব্দে ধোঁয়া ছেড়ে আসছে-যাচ্ছে। মৃদু মন্দ ঢেউ-এ কাঁপছে লাল বালুকা রাশি,না আমি যাবই যাব!

বাবা পেশায় ঠিকাদার। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, অপারেশন এর যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। তিনি চাইতেন আমিও তাঁকে সাহায্য করি। বিদ্যুতের ৫০ হার্টজ/সাইকেল, এম্পেয়ার, কে.ভি.এ আমি বুঝি না!
একদিন ডেকে বললেন কোনো এক ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে যেন ভর্তি হই। বিদ্যুতের উপর ট্রেড কোর্স করি।

বাবার আদেশ অমান্য করার সাধ্য আমাদের পরিবারে কারোরই ছিলনা, আমারও না। অগত্যা ভর্তি হলাম। সপ্তাহে ৫ দিন ক্লাস আর একদিন দীনি ক্লাস। ঢাকা কলেজের মোটকা রতন, আনিস, শাহেদ (শাহেদ যুক্তরাজ্যে অধ্যাপনা করছে বলে শুনেছি) এসেছে, সিটি কলেজের আমি আর মিলন সবাই একই কোর্সে ভর্তি হয়েছি।

প্রতি বৃহস্পতিবার দীনি ক্লাস বাধ্যতা মূলক ছিল এবং পড়তে আসা সকল শাখার ছাত্রদের থাকতে হত। আমরা ক্লাস এ বেশ দুষ্টামি করতাম তাই আমাদের ৪ জনকে বসানো হত সামনের বেঞ্চিতে! টানা দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ক্লাস, সবটাই ইসলাম এর বেসিক বিষয়ের উপর। ক্লাস শেষে আলোচিত বিষয়বস্তু বুঝতে সমস্যা হলে দাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতে হত, চলত প্রশ্নোত্তর পর্ব। আমাদের পালা এলে চার চোখ একত্রে টিপে দিতাম। একসাথে বলতাম, “স্যার আমাদের কোনো প্রশ্ন নাই!”

কিছুদিন পর আমাদের এইচ.এস.সি ফলাফল বেরুলো। রতন মেডিকেলে, আমি আর আনিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক এবং ঘ ইউনিটে আবেদন করলাম। মিলন ২য় বিভাগ পেয়েছে সে আবেদন করতে পারল না।

ভোকেশনালে ক্লাস চলছে এর মধ্যে অধ্যক্ষ দ্বীন মোহাম্মদ আমার সাথে একান্তে কথা বললেন বেশ কয়েকবার। তার ইঙ্গিত আমি বেশ বুজতে পারছিলাম। একদিন দেখি ক্লাসে চাঁদা তুলছে। ১০ টাকা চাঁদা, জামাতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে! আমি বললাম চাঁদা দেব না। “কেন নয়?” “আমি জামাতকে ঘৃণা করি ৭১-এ তাদের ভূমিকার জন্য”। দেখলাম অনেকে চাঁদা দিচ্ছে, এমনকি মিলন পর্যন্ত। আমার ডাক পড়ল অধ্যক্ষের কক্ষে।

অনেক ভাবে বুঝতে চাইলেন। এদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন উস্কে দেয়াটা ছিল ভারতের রাজনৈতিক কূট-কৌশলের অংশ বিশেষ, তারা চাইছিল না পাকিস্তান কাশ্মীরের মত এখানে বসেও ভারতের সাথে সারা বছর বিরোধে, যুদ্ধে জড়িয়ে থাকে। ভারত চাইছিল পাকিস্তানকে হাজার মাইল দুরে পাঠাতে।
“আমরা ভীত ছিলাম তাই বিরোধিতা করেছিলাম।”

আমি সেদিন প্রথম চোখের সামনে রাজাকার দেখলাম! অধ্যক্ষ মহাশয় আমায় কয়েকটা বই পড়তে দিলেন। “আল্লার দিকে আহবান”,”নবী চরিত”,ইসলাম প্রচার এবং ইসলামী রাষ্ট্র কেন জরুরি ইত্যাদি।
বইগুলো পড়লাম না।

ভর্তি পরীক্ষার ফল বেরুলো। আমি ফার্মেসি, এপ্লাইড কেমিস্ট্রি, বায়ো-কেমিস্ট্রি,এপ্লাইড ফিজিক্স, মাইক্রো বায়োলজি বিভাগ ছাড়া যেকোনো ৫ টি বিভাগের একটিতে ভর্তি হতে পারব। আনিস চলে গেল এরাবিক এন্ড ইসলামিক স্টাডিজে। রতন ময়মনসিংহ মেডিকেলে।

এরই মাঝে মিলন আমার বাসায় এলো। বলল,”দোস্ত তুই আমার সাথে চিটাগাং চল।” আমি ভাবলাম বেশ ভালই তো এবার দুলাভাইয়ের বাসায় যাওয়া যাবে! সে যা বলল তা শুনে আমি থ!

আমাদের অধ্যক্ষ মহোদয় একটা চিঠি লিখে দিয়েছেন চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক আমির হোসাইন এর কাছে। তার পীড়া-পীড়িতে রাতের গাড়িতে চড়ে বসলাম। খুব সকালে চিটাগাং পৌঁছে হোটেল রুম এ ঘুম দিলাম। ১২টার পর রওয়ানা দিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। খুব সম্ভবত শাহ আমানত হল এর ২য় তলায় (হল ভবনটির পেছনে লাল পাহাড় দাড়িয়ে ছিল, এত বছর পর নামটি মনে পড়ছে না) পৌঁছে গেলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে চার/পাঁচ জনের একটি দল এলো।

পেন্ট উঁচু করে পড়া। একজনের দাড়ি আছে, মিলন আমায় দুরে রেখে চিঠিটি তাকেই দিল। ভদ্রলোক বললেন আসর নামাজের ওয়াক্ত হয়ে আসছে আসুন আগে নামাজ পড়ে নেই। অগত্যা নামাজ পড়লাম।
কুশলাদি জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের ব্যাগ-স্যাগ কোথায়?” তাকে বললাম, “হোটেল কক্ষে রেখে এসেছি”। তিনি কি যেন ভাবলেন বললেন, “অসুবিধা নাই”। চা এলো,মুড়ি ভাজা এলো,বিস্কুট এলো।
খাবার পর বললো চলেন। তার পিছু নিলাম। ক্যাম্পাস চত্বরে এসে দেখি বেশ কিছু কাঠ বডি বাস দাড়িয়ে। সবগুলোতে উপচে পরা ভিড়!
এই গুলো কখন এলো নিজে নিজে ভাবি। একটু আগেও তো ছিলনা !

বাসের সামনে একটা করে ব্যানার ” জশনে জুলুছে ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী” সীরাতুন্নবী তাফসির মাহফিল চিটাগাং শহরে। বাসগুলো সেখানেই যাচ্ছে। আমাদের জন্যই যেন বাসগুলো অপেক্ষা করছিল। ভদ্রলোক উঠতেই বাস ছেড়ে দিল। কেউ একজন স্লোগান দিল, “নারায়ে ……….,,জিন্দাবাদ”। আমি মনে মনে বলি, “মুর্দাবাদ..মুর্দাবাদ”।

ভদ্রলোক আমাদের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে। একবার মিলন একবার আমায় লক্ষ্য করছেন। মিলন বলল, দোস্ত শ্লোগান দে! এরা জানে কর্মীর রক্ত টগবগ করে ফোটে!” আমি ফিস ফিস করে বলি, “শালা তুই দে!”
“তাহলে তুই শুধু মূকাভিনয় কর,প্লীজ।” আমি মনে মনে বলি, “শালা তুই ঢাকায় আয় তোর কপালে খানা আছে”। আমি কেন স্লোগান দিইনি সেটা মিলন জানেনা, আমি জানতাম।

বাস শহরে আসতেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিলাম। শেষ বাসটি ধরে আমি তখন রাঙ্গামাটি পুলিশ লাইনের দিকে ছুটে চলেছি। ক্রমাগত পাহাড়ের চড়া বেয়ে বাস উপরে উঠে যাচ্ছে। নিচে গাড় অন্ধকার.।

পাদটীকা: মিলন ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। সম্মান এবং মাস্টার্সে ভালো করেছিল।
পরবর্তীতে বিসিএস দিয়ে জেলা প্রশাসক হয়েছিল (নামটি কল্পিত) চলবে…………..