ক্যাটেগরিঃ ব্লগ


অছিউদ্দীন। বাবা সামসুদ্দীন। পেশায় দর্জি। কেরানীগঞ্জ থানার আব্দুল্লাহপুর(ভাওর ভিটি)বাস স্টেশনের পূব দিকে বাড়ী।
পেশায় দর্জি হলেও বাবা ছেলেকে পড়ালেখা করিয়েছিলেন। বিভিন্ন স্থানে লজিং থেকে ডিগ্রী পাশ করেন।

১৯৭০ এর নির্বাচনে খাজা খায়রুদ্দীন হারিকেন মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের দল আওয়ামীলীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে।
অছিউদ্দীন তখন খাজা খায়রুদ্দীনের পক্ষে। ভেবেছিল পূর্ব-বাংলার বাঙালিদের স্বায়ত্ত-শাসন রুখে দেবে!
সে সময় খাজা খায়রুদ্দীন তথা নবাব পরিবার ইসলামের তল্পি বাহক ছিল(সব নবাব নয়)।
নির্বাচনে অপূর্ব এক শ্লোগানে জনতা নির্বাচনী এলাকা প্রকম্পিত করে রেখেছিল,
“হারিকেন জ্বলে পায়xনার তলে
নৌকা চলে বুড়িগঙ্গার জলে “!


একথা সবারই জানা যে ১৯৭০ এর গণপরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দলের প্রতি দেশের আপামর জনতা তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বিপুল ভোটে দিয়ে মুজিব কে নির্বাচিত করে,
ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পশ্চিমারা টালবাহানা শুরু করে।
মাটি চাই, মানুষ নয়’ নীতিতে বিশ্বাসী শাসকগোষ্ঠীর আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্মম গণহত্যা চালায়।

পাক হানাদার বাহিনীর দোসরদের অনেকেই তখনও স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধি (ইউনিয়ন/থানা পর্যায়ে) এদের অধিকাংশই জিন্নাহ টুপি পড়ত, অন্তরে পাকিস্তানকে লালন করত।
যতটুকু জেনেছি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর এদের অনেকেই খাজা খায়রুদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করে এবং পরামর্শ চায়। নিজেদের সুরক্ষিত এবং পাকিস্তানের মত সু-সজ্জিত দলের সাথে “কতিপয় মুক্তি”(!!)কখনও পারবেনা বলে সবাইকে হানাদার বাহিনীর সাথে থাকতে পরামর্শ দেন তিনি।

গঠিত হয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। আমাদের অছিউদ্দীন আলবদর বাহিনীর একটি ইউনিটের কমান্ডার হন। (তথ্যটি পাঠকের কাছ হতে নিশ্চিত হতে চাইছি)
অছিউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বিক্রমপুরের সিরাজদিখান, শ্রীনগর, মুক্তারপুর ইত্যাদি এলাকায় লুটপাট-অগ্নিসংযোগ এবং অনেক অপরাধের হোতা ছিল।

(হিন্দুদের লাশ)

দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ সেদিন বৃথা যায়নি।

স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে ফিরে এসে তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। অছিউদ্দীন আত্মগোপন করে।
অছিউদ্দীনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী (তাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন এমন একজন জানিয়েছেন), “স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে (সম্ভবত
তাঁর মামলা নং ছিল: ১৩।)
অছিউদ্দীন পালিয়ে চলে যায় পাবনা এলাকায়। সেখানে কোন এক গাঁয়ের বিধবা মহিলাকে মা ডাকে। জানায় তার আত্মীয়পরিজন কেউ নই। যুদ্ধের সময় মারা গেছে!
বাবার পেশা হতে দর্জি কাজে হাতেখড়ি ছিল।
অছিউদ্দীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সেলাই এবং সরবরাহ শুরু করে। খুলনা, যশোর ইত্যাদি এলাকায় তার তৈরি পতাকা বিক্রি হত।
অছিউদ্দীন নিজেও পতাকা ফেরি করে বিক্রি করত।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে অছিউদ্দীন টঙ্গি এলাকার আজমপুরে
পুরনো মাছ বাজারের শেষ মাথায় একটি মুদি দোকান খুলে বসে।
এসময় তার কাছে বিভিন্ন ধরনের মানুষ আসতো বলে তিনি জানান। কর্মচারীদের ২/১ ঘণ্টার জন্য ছুটি দিয়ে অছিউদ্দীনরা গোপন সলাপরামর্শে বসত।”

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নির্মম ভাবে হত্যা করার প্রায় বছর খানেক পর অছিউদ্দীন ঢাকায় ফিরে আসে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে শুকনো মরিচ, হলুদ, আদা ইত্যাদি কাঁচামাল ক্রয় করে ঢাকার শ্যামবাজারে বিক্রয় শুরু করে। পরে তার বাবাকেও ব্যবসায় নিয়োজিত করে।
বছর খানেক পর তার নিজ গ্রামে ফিরে আসে। ১৯৭৭ কিম্বা ১৯৭৮ এ কেরানীগঞ্জ থানার সোনা কান্দা গ্রামের ফতোয়াবাজ এবং মাওলানা মেহেরুল্লাহর মেয়ে ফাতেমাকে বিয়ে করে।
২টি কন্যা সন্তান এবং একটি পুত্র সন্তানের পিতা হন।

বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে প্রাণের ভয়ে সে আবারও এলাকা ছাড়ে।
অছিউদ্দীন ছদ্মবেশ ধারণ করে বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে ভোজ্য-তেল, নারিকেল তেল বিক্রি শুরু করেছিল।

দুই বছর আগে অছিউদ্দীন পরপারে পাড়ি দিয়েছে সবার অগোচরে। শেষ জীবনে চরম আর্থিক কষ্টে তার দিন কাটে।

অছিউদ্দীনের মত তালিকা ভুক্ত ৩ লাখ ৪০ হাজার রাজাকার-আলবদর-আলশামস এবং যুদ্ধাপরাধীরা একটি মাত্র সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় পার পেয়ে গিয়েছিল।
আমরা কজন অছিউদ্দীনের খবর রেখেছি! অনেকেই হয়ত আমাদের চারপাশেই এরা আছে নতুন ছদ্মবেশে!
বিজয় দিবসের দ্বারপ্রান্তে এসে দেশপ্রেমিক সকলের উদ্দেশ্যে বলি,

“আসুন এদের প্রতি ঘৃণা ছুড়ে দিই”।

পাদটীকা: এই লেখাটি অন্তত ২জন বয়োবৃদ্ধের কাছ থেকে শোনা। একজন রিয়াদে কর্মরত। অছিউদ্দীন তাঁদের বাড়িতে লজিং থাকতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ৭ম শ্রেনীর ছাত্র ছিলেন। একমাত্র মামলা নং, দিন তারিখের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি।

ছবি: ইন্টারনেট।