ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

“সবাইকে দিয়ে সবকিছু হয়না। যে ভালো ছাত্র, সে ভালো নেতা হয়না, যে দেখতে অপরূপা সে অনির্বচনীয় কবি হয়না। আর যে কল্পনা বিলাসী সে সবল মানুষ হয়না। আবার কখনো হয়। বাদশাহ আকবরের মত জাহাঙ্গীর হলেন না, কাজী নজরুলের মত কাজী সব্যসাচী হলেন না। বাপ গুনে পুত্র আর শিক্ষক গুনে ছাত্র সব সময় হয়না।”

“পোস্ট অফিসের সাধারণ কর্মচারী লিঙ্কন এক সময় আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবাসী ব্যারিস্টার ফিরে এসে মহাত্মা গান্ধী হয়ে গেলেন।
হতে অসুবিধা নেই তবে সেই হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ ও ধারাবাহিকতা থাকতে হবে….”

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালি জাতির উপর শোষণ বঞ্চনা আর বৈষম্য সৃষ্টি করে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আমাদের দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল শুধু ইসলামের দোহাই দিয়ে,
বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা বলে!
“উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা” হিসাবে জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাঙালি আর বাংলা ভাষা-ভাষীদের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী
সব ক্ষেত্রেই এই বৈষম্য-ই একটি স্বাধীন,স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এক বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেদিন
সাড়ে সাত কোটি বাঙালির আজন্ম-লালিত স্বাধীনতার পথ প্রদর্শক হিসাবে নিজের আগমন জানান দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু তরুণ এবং যুবকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সম্পৃক্ত করার চিন্তা করেন।
ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ১০ দফা দাবী নিয়ে পূর্ববাংলা মুসলিম ছাত্রলীগ যাত্রা শুরু করে।
১০ দফা দাবীর অন্যতম যে দাবীগুলো ছিল :- অবৈতনিক-বাধ্যতা মূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন, শিক্ষা সংকোচন নীতির প্রতিবাদ, বিনা ব্যয়ে সামরিক শিক্ষার প্রবর্তন। সেনা, নৌ, বিমান সহ সেনাবাহিনীর সকল ক্ষেত্রে পূর্ববাংলায় স্থাপনা তথা সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং সেখানে বাঙালিদের নিয়োগ ইত্যাদির দাবীতে ৮ই জানুয়ারি স্বৈরাচার বিরোধী দিবস, হরতাল, বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
১৯শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ” URDU AND URDU SHALL BE THE STATE LANGUAGE OF PAKISTAN”
ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু সহ উপস্থিত হাজার কণ্ঠের সমস্বরে “NO” “NO” ধ্বনিতে প্রতিবাদ, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধু সহ ৬৫ জন নেতার গ্রেফতার। একই বছর ৯ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন-রত কম্যুনিস্ট কর্মী শিবেন রায়ের মৃত্যু।

বছর জুড়ে ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের “চরমপত্র” খ্যাত এম আর আখতার মুকুল, নুরুল হুদা কাদের বক্স, ছাত্রলীগের আহবায়ক দবিরুল ইসলাম গ্রেফতার হলে ঢাকা হাইকোর্টে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি “সর্বপ্রথম হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন” পরিচালনা করেন।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩রা মার্চ থেকে আন্দোলনরত নিম্ন পদস্থ কর্মচারীদের সমর্থন করার কারণে বঙ্গবন্ধু সহ ২৭ জন ছাত্র-ছাত্রী গ্রেফতার হন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে আইন অনুষদের ছাত্র বঙ্গবন্ধু’র আইনজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়। এর প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলন ছিয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে স্বৈরাচার বিরোধী দিবস পালিত হয়। ১৭ এপ্রিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারাদেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১৮-১৯ এপ্রিল ১৯৪৯ সালে ভিসি অফিসে ঘেরাও করে অবস্থান ধর্মঘটের কারণে বঙ্গবন্ধু সহ অনেকেই গ্রেফতার হন। ২০শে এপ্রিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারাদেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ছাত্রলীগ নেতার কাছে মুখ্য মন্ত্রীর পরাজয় ঘটে।
১৯৫৬ শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪ সালে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা রাজিউদ্দিন রাজুর নেতৃত্বে রাজপথ উত্তাল হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নর মোনেম খানকে কালো পতাকা প্রদর্শন করা হয়। ১৯৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে “জাগো বাঙালি জাগো” স্লোগানে কোটি মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে ছাত্রলীগ ১১ দফা দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়।

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ১৯৬৯ এর ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে বটতলায় প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ছাত্ররা সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নামে। ১৮ এবং ১৯ জানুআরি লাখো মানুষের ঢলে রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছিল, ১৪৪ ধারা ভেসে গিয়েছিল।
২১ জানুয়ারি অর্ধ দিবস হরতাল। ২২ জানুয়ারি সারাদেশে কালোব্যাজ ধারণ। ২৩ জানুয়ারি মশাল মিছিল। ২৪ সে জানুয়ারি অর্ধ দিবস হরতাল।
১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানে মন্ত্রীর গাড়িতে আগুন, ঘাতকের গুলিতে কিশোর মতিউর, আসাদ সহ অনেকে শহীদ হন।
১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা অনস্বীকার্য।

****
শিক্ষা,শান্তি, প্রগতি ছাত্রলীগের মূলমন্ত্র।

এই মন্ত্রে দীক্ষিত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পর সকল আন্দোলনে বিশেষ করে ১৯৮২-১৯৯০(মাঝে কিছু সময় ছাড়া) স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ঢাকসুর প্রাক্তন ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন ছাড়াও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দলটি রাজপথে ছিল দৃপ্ত-কণ্ঠ, আগুয়ান!
স্বাধীনতার স্বপক্ষের, গণতন্ত্র-মনা, প্রগতিশীল সকল দলের সাথে পাশাপাশি সহ-অবস্থান করে দলটি তৃনমূল পর্যায়ে অত্যন্ত সংঘটিত হয়েছে।

মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগের ঘৃণিত কর্মকাণ্ড দেখে উপরের কথাগুলো ইতিহাস থেকে টেনে না এনে উপায় ছিলনা।

“কিছুদূর পথ চলে সবাই এক এক করে বিচলিত হলেন। কেউ গাছেরটা খেলেন আবার তলারটা কুড়ালেন…একবার বললেন আধার ভালো, আবার বললেন আলোও ভালো..”

যাকেই জিজ্ঞেস করবেন চোখ বন্ধ করে সে বলে দেবে ছাত্রলীগ মানে হলো ধর্ষণের সেঞ্চুরি , বাধনের সম্ভ্রম, ইডেন কলেজের মেয়েদের পতিতা বৃত্তিতে বাধ্য করা, বিতর্কিত করা, টেন্ডার বাজি, চাঁদাবাজি, হত্যা, বিবদমান দুই গ্রুপের কোন্দলে খুনের উল্লাসে মত্ত একটি দল!
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগেও এরা লজ্জিত নয়, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর তাঁর মন্ত্রণালয়ের পুলিশের নাকের ডগায় বিরোধীদলের কর্মীদের মারধর, হল দখল, রাজপথ, ফুটপাথ থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু জবর-দখল প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কথা দেশের মানুষের কাছে এদের নতুন রূপে পরিচিত করেছে। “সোনার ছেলে” নামে এখন সবাই চেনে !
আজকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, BUET, KUET এর ঘটনায় যখন সারা দেশে তোলপাড়, নিন্দার ঝড় চলছে ঠিক তখনই JU তে পরীক্ষার হল থেকে তুলে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করা হলো জোবায়েরকে! যোবায়ের হত্যায় সারাদেশের মানুষ নির্বাক! সারাদেশের মানুষ এদের আচরণে বীতশ্রদ্ধ।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের গড়া দল জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা ছাত্র নামধারী মুষ্টিমেয় কিছু কুলাঙ্গার এসে মাড়িয়ে দিয়ে যাবে আমরা কি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখব? না এদের লাগাম টেনে ধরব?

“সব কিছু ছক করা আছে. নীল নকশার জাল ছড়িয়ে আছে. দেশজ বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের প্রলুব্ধ, বিভ্রান্ত ও বিপথ গামী করার আশ্চর্য সুন্দর পরিকল্পনা ভালো ভাবে বিন্যাস করা আছে। সেই সুগভীর পরিকল্পনার আবর্তের মধ্যে ঢুকতে বাধ্য জাতীয় নেতারা। যদি না ঢোকে তবেই মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যুর কমে বড় শক্তি কখনই সন্তুষ্ট হয় না।”

“বাংলাকে, বাঙালিকে, বাংলার পূর্ণ ইতিহাসের মহিমাকে এখন চিনে নিতে অনেক সাধ্য সাধনা দরকার। শেখ মুজিব যাকে হৃদয় দিয়ে বুঝেছিলেন এখন তাকেই বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে বুঝতে হবে। কাজটি অতি জটিল আর সহিষ্ণুতা ও সংযম প্রত্যাশী…..সে আশ্রয়কে মজবুত ও সংহত করবে কে?
আমি করব,তুমি করবে,সে করবে। করতেই হবে। নাহলে পুনরায় অন্ধকার ছুটে আসবে। আবার সিঁড়িতে উঠানে ও গৃহকোণে রক্ত গড়িয়ে পড়বে। সে রক্তের পরিমাপ করতে আবার অনেক দেরী হয়ে যাবে……”

উদ্ধৃতি: “এখনই প্রস্তুতি”.লেখক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ
ছবি: ইন্টারনেট