ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

পরদিন অর্থাৎ ২২শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ রাতের অন্ধকারে নির্মিত হলো দেশের প্রথম শহীদ মিনার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি মাওলার উদ্যোগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র বদরুল আলম ভিক্টোরিয়া পার্কে সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিস্তম্ভের আদলে প্রথম শহীদ মিনারের নকশা করেন।

৫ফুট উঁচু ও ৬ ফুট প্রস্থ স্তম্ভ প্রথম শহীদ মিনারটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের মির্জা মাজহারুল ইসলামের ঘরে বানানো হয়। (১)
ঐ রাতেই শহীদ শফিউরের পিতা অনানুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন।
স্তম্ভে বদরুল আলমের আঁকা দুটি পোস্টার ছিল যাতে লেখা ছিল”:- “স্মৃতিস্তম্ভ” এবং “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই।”

পুরনো ঢাকার পঞ্চায়েত কমিটির পিয়ারু সর্দার ইট, বালু ও সিমেন্ট দিলে বর্তমান শহীদ মিনারের স্থানে
১০ ফুট উচ্চ ও ৬ ফুট চওড়া স্তম্ভটি হোস্টেলের ছাত্ররা নির্মাণ শ্রমিকদের সহায়তায় শহীদ মিনারটি তৈরি করে। (উইকিপিডিয়া)

২৩শে ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক আবুল মনসুর নামকরণ করেন ‍‍‍‍‍‍‍‍‍’শহীদ মিনার’। নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করার প্রতিবাদে এইদিন দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়।
ঐদিন-ই APCA ২৫ই ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের ডাক দেয় ।

২৪শে ফেব্রুয়ারি আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম সামসুদ্দিন ‘শহীদ মিনার’ আবারও উদ্বোধন করেন।

হরতালের পরদিন ২৬শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ বুল-ডোজার দিয়ে ভেঙ্গে দেয় ভাষা শহীদ স্মরণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার।

ভাষা আন্দোলন ক্রমশ: রূপ নিলো স্বাধিকারের আন্দোলনে।

এরই মধ্যে রচিত হয়ে গেছে একুশের কালজয়ী গান, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি”।
এটি প্রথমে কবিতা আকারে লিখেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। কবিতাটি ১৯৫৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে সংকলনে প্রথম প্রকাশিত হয়।
তৎকালীন সরকার সংকলনটি বাজেয়াপ্ত করে। পরবর্তীতে কবিতাটিই কালজয়ী গানে পরিণত হয়। গানটিতে প্রথম সুরারোপ করেছিলেন আব্দুল লতিফ।
পরবর্তীতে আলতাফ মাহমুদ গানটিতে সুরারোপ করেন।

*****
১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকার উপলব্ধি করতে পারলো বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখা যাবে না, বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই বছরের ৭ই মে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিতে এসেম্বলিতে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মত পাকিস্তান সরকারের ইতিবাচক/পরোক্ষ মনোভাবের মধ্য দিয়ে সারাদেশব্যপী শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
২৬শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়ে বিধান সভায় আইন গৃহীত হয়।
২৩শে মার্চ, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানের পরিবর্তন করা হয়।

সুদীর্ঘ আন্দোলন, বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতির প্রাণের দাবী প্রতিষ্ঠিত হলো।
ভাষা আন্দোলনের সকল লড়াকু সেনানী, আর আত্ম-উৎসর্গকারী সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। “আমরা তোমাদের ভুলবো না”।

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মিনারটি প্রায় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

বাংলা ভাষাকে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার পরে ১৯৫৭ সালের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু হয় স্থপতি হামিদুর রহমান, নভেরা আহমেদের তত্ত্বাবধানে
(মূল ডিজাইনে দেয়াল সংলগ্ন ১,৫০০ -স্কয়ার ফুট মুরাল (ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য) ছিল (যা আমি নিজেও দেখেছিলাম)।
১৯৬৩ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ঐ বছর শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম শহীদ দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে উদ্বোধন করেন।

*****
স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকবার শহীদ মিনারের সংস্কার করা হয়েছে। মূল বেদী বড় করা হয়েছে ফলে মুরালগুলো ঢাকা পড়ে গেছে।
আজকের শহীদমিনারের রাস্তা সংলগ্ন যে সীমানা প্রাচীর এক সময় এখানে কাঁটা তারের বেড়া ছিল।
কাঁটাতারের বেড়াকে ছুঁয়ে নর্দমা ( ড্রেন ) প্রবাহিত ছিল যা মিনারের সৌন্দর্যকে অনেকটাই ম্লান করেছিল। রাস্তার ঠিক বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ এবং
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের সামনেও একই রকম উন্মুক্ত ড্রেন ছিল(যা এখনও আছে।)
যেই রাস্তাটি শহীদ মিনার ঘেঁষে চলে গেছে সেটি সময়ের সাথে সাথে প্রশস্ত হয়েছে।
আজকের প্রজন্ম শহীদের স্মরণে তৈরি করা চমৎকার স্থাপত্য মুরালগুলো শহীদ মিনারের বেদীতে কখনোই দেখতে পাবেনা ভেবে একটু খারাপ লাগছে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পর্ব-১
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পর্ব-২

সূত্র ও ছবি:
(১)। মিসেস বদরুল আলম
তালুকদার মনিরুজ্জামান, হাসান জহির, ইন্টারনেট