ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

২৬ জুন আর্ন্তজাতিক মাদকবিরোধী দিবস। আমরা মহা ধুমধামে দিবসটা পালন করি। পত্রিকার পাতা জুড়ে থাকে ক্রোড়পত্র, সভা-সেমিনার সিম্পোজিয়ামে ঘোষণা করা হয় মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ বা যুদ্ধ। তারপর দুয়েকদিন পরে আবার ভুলে যাই যথারীতি। সরকারী হিসাবে দেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা- ৫০ লাখের অধিক আর বেসরকারী হিসেবে তা ৭০ লাখেরও বেশী ,যাদের বেশীর ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর। তারা মুলত যুবশক্তি, তারা এদেশের ভবিষ্যত হিসেবে বিবেচিত। এই রকম ঘুণে ধরা ভবিষ্যত আমাদের জন্য বয়ে আনবে অন্ধকার। ভয়ের কথা, শিশু কিশোরদের মধ্যে ইতিমধ্যে ছডিয়ে পড়েছে মাদকের থাবা। যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের ১০ শতাংশই শিশু। নিদিষ্ট কোনো পেশাজীবী নয় বরং সকল পেশার মানুষই জড়িয়ে যাচ্ছে পংকিলতার এ আবর্তে৤
হেরোইন ,ইয়াবার মতো মারাত্নক জীবনবিনাশী মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে সারা দেশ জুড়ে। দেশের ৫৫ টি পয়েন্ট মাদকের জন্য সবচেয়ে বেশী ঝুকিপূর্ণ। যে সব পয়েন্ট দিয়ে অবাধে ভারত থেকে দেশে প্রবেশ করছে ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নানা জাতের ইনজেকশন আর মায়নমার থেকে আসছে ইয়াবা ৤
গত ১০ বছরে মাদক সংক্রান্ত মামলার পরিমান বেড়েছে চারগুন। গত ছয় বছরে দেশ ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৯৬ টি মামলা হয়েছে । তার মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৭৫ টি মামলা হয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রন আইনে (তথ্য-দৈনিক সমকাল) । শতকরা হিসেবে দেশে যত মামলা হয় তার ১৩ শতাংশেরও অধিক মাদক সংক্রান্ত মামলা। দেশে সাধারণত বেশীরভাগ মানুষ হয়রানির শিকার হলেও মামলা থেকে দূরে থাকার চেষ্ঠা করে। সে হিসেবে যে পরিমান ঘটনা ঘটে ঠিক সে পরিমান মামলা হয় না। তার মানে পরিসংখ্যানে যা উঠে এসেছে ঘটনা তারচেয়েও ভয়াবহ।
যারা ভুক্তভোগী কিংবা যারা মাদক সেবনকারী তারা সাধারণত মাদক বিষয়ে মামলা করে না। মামলা করে পুলিশ কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর এর লোকজন। মামলা হয়, অভিযান পরিচালনা করে হাতে নাতে মাদক সহ গ্রেফতারের পর। মাদক ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই জানে বলে ওদের গ্রেফতার করা যায় না কিংবা বলা যায় গ্রেফতার করা হয় না। ৤
যদি সত্যিকার অর্থে মামলা করা হতো তবে শুধু মাদক মামলার পরিমান নিসন্দেহে অন্য সকল মামলার যোগফলেরও অধিক হতো৤ তাছাড়া, সরাসরি মাদক মামলা ছাড়া মাদক ক্রয়ের টাকা সংগ্রহের জন্য চুরি ,ডাকাতি ,ছিনতাই সহ যে সব অপরাধ সংগঠিত হয় তা আমলে আনলে মাদক অপরাধই এখন শীর্ষে। যে পরিবারে একজন মাদকাসক্ত ব্যাক্তি থাকে সে পরিবারের লোকজন কি পরিমান সমস্যার মধ্য দিয়ে কাটায় তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবে না
টোকেনের মাধ্যমে সীমান্ত থেকে বিভিন্ন উপায়ে মাদক ঢাকাসহ সারাদেশে ঢুকে পড়ে সুকৌশলে । মাদক পরিবহনে কী কী অভিনব উপায় অবলম্বন করা হয় তা আমরা মাঝে মধ্যে পত্রিকায় দেখি। আর সহজে বহন যোগ্য বলে হেরোইন কিংবা ইয়াবা সহজে ধরাও পড়ে না, সোর্সের কল্যানে যাও এক আধ চালান ধরা পড়ে সেগুলো নিতান্তই অল্প।
ধরা পড়া চালান আবার সরকারী মালখানা থেকে বিক্রি হয়ে যায় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে কিংবা সোর্সের মাধ্যমে তা বাইরে সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ৤
মোদ্দা কথা হলো, মাদক এখন দেশের এক নম্বর সমস্যা , দ্রব্য মুল্য , বিদ্যুৎ ,কিংবা অন্য যে কোন সামাজিক সমস্যার চেয়ে মাদক অনেক বড় সমস্যা, সেটা আমারা যতই আড়াল করে রাখার চেষ্ঠা করি কোন লাভ নেই। এ আড়াল করার প্রক্রিয়া শুরু হয় মাদকাসক্ত ব্যাক্তি থেকে। তার কাছে যদি জানতে চান সে কখনোই বলবে না যে সে মাদকাসক্ত, কিংবা তার পরিবারের কারো কাছে জানতে চান তারাও সামাজিকতা ও পরিবেশের কথা বিবেচনায় স্বীকার করবে না যে তাদের পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত। জানতে চাইলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা থাকবেই কিন্ত এভাবে আড়াল করে রেখে ক্ষত যখন গ্যাংগ্রিন এর রূপ ধারণ করে তখন আমারা সচেতন হই, তখন আর কিছুই করার থাকে না।
এ সম্যসার সমাধানে রাষ্ট্রকে যেমন ভূমিকা পালন করতে হবে তেমনি পরিবারকে এর চেয়ে বেশী ভূমিকা পালন করতে হবে। সমস্যার মূল উৎপাটন করতে হবে পরিবার থেকে । সাধারণত সে সব পরিবারের সন্তানেরা বেশী মাদকাসক্ত হয়, যেখানে পারিবারিক বন্ধন এর কম মর্যাদা দেয়া হয় । সামাজিক মুল্যবোধ, রীতিনীতি , ধর্মীয় অনুশাসন মাদাকাসক্তি ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। খোলাখোলি আলোচনা করে সম্যস্যার গভীরে পৌঁছতে বাবা মাদেরকেই গুরুত্বপূর্ন এবং মুখ্য ভুমিকা পালন করতে হবে । ভাবতে শিখতে হবে মাদকাসক্তি ও অন্যান্য ব্যাধির মতো নিরাময়যোগ্য একটা ব্যাধি, এটা নির্মূলের দায়িত্ব সকলের । সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করে যেতে হবে এ ব্যাধি নির্মূলে। তা না হলে এ মহামারী থেকে আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মকে আপনি নিজেই রক্ষা করতে পারবেন না ৤(নতুন দেশ 3য় বর্স ষংখ্যা 03 এ প্রকাশিত)