ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে পরিবেশের উপর নেতিবাচক কিছু প্রভাব পড়লেও প্রকল্পটি না সরানোর পক্ষেই  সরকার অটল থাকবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত সোমবার বিশ্ব ব্যাংকের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক পলা ক্যাবালেরো নেতত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।

মানে হচ্ছে সরকার সিদ্ধান্তে অনড় রাম পাল নিয়ে। পরিবেশবাদীরা তো আছেই সাধারন মানুষরা ও কিন্তু সোশাল মিডিয়ার কল্যানে দেখতে পাচ্ছি রামপাল এর চেয়ে সুন্দরবন বাঁচাও এর পক্ষে। আর লেখালেখি ও চলছে পক্ষে-বিপক্ষে।

বিভিন্ন বিশিষ্টজনের লেখার সুত্র ধরে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তাপীয় কর্মদক্ষতা বা ইফিসিয়েন্সি অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন প্রকার: সাব ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল ও আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল। সাব ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ন্যায় সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, পারদ, সিসা, আর্সেনিক মিশ্রিত বিষাক্ত ছাই ইত্যাদি নির্গত হয়।’

“সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দূষণের পরিমাণ মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়, যা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। এই বিদ্যুৎপ্রকল্প পরিচালনা করতে যে ধরনেরই টেকনোলজি ব্যবহার করা হোক না কেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চললে শব্দদূষণ হবেই, বিদ্যুৎকেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে। ফলে ঢাকার বুড়িগঙ্গার চেয়েও সুন্দরবনের পশুর নদে আরো ভয়াবহ দূষণ ঘটবে। শব্দদূষণ, পানিদূষণ, আলোদূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।”

“কয়লা ঢেকে পরিবহন করলে বা কিংবা কয়লাবাহী জাহাজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা হলেও জাহাজের কয়লাস্তূপ থেকে চুইয়ে পড়া কয়লা-ধোয়া বিষাক্ত পানি (বিলজ ওয়াটার), অ্যাংকরেজ পয়েন্টে কয়লা লোড-আনলোড করার সময় সৃষ্ট দূষণ, কয়লার গুঁড়ো, জাহাজ-নিঃসৃত তেল-আবর্জনা, জাহাজ চলাচলের শব্দ, ঢেউ, বনের ভেতরে জাহাজের সার্চ লাইটের তীব্র আলো, জাহাজের ইঞ্জিন থেকে নির্গত বিষাক্ত সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস ইত্যাদির ক্ষতিকর প্রভাব থেকেই যাবে নদীর উপর।”

সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নাগরিকদের সম্পর্কে রোববার প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। প্রতিমন্ত্রী বলেন- প্রতিবাদকারীরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য, প্রমাণ ও যুক্তি ছাড়াই তাদের বিরোধিতা ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই বক্তব্য প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ’প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য একেবারেই সত্য নয় এবং তা আন্দোলনকারী নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত অপপ্রচারের শামিল। আমি তার ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসত্য বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করছি ও তা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি। কেবল সুলতানা কামাল নয় আরো অনেক বিশিষ্টজন এর বিপক্ষে মত প্রকাশ করছেন।

আনু মুহাম্মদ বলেন, “তবে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে যখন এত সব কথাবার্তা চলছে তখন বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কেন কথা হচ্ছে না।”

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে কেউ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে গেলেই দেখতে পাবেন পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ উদাহরণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশের কৃষিজমি কয়লাদূষণে রীতিমতো কালো রঙ ধারণ করেছে, মাটির নিচের পানির স্তর নেমে গেছে, ছাইয়ের পুকুরে গাদা করে রাখা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে, ফসল ও মাছ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’

“তাছাড়া বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র রামপালের তুলনায় অনেক ছোট আকারের এবং বড়পুকুরিয়ার পাশে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর বিশ্ব ঐতিহ্য বনাঞ্চল নেই। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট, যার মধ্যে আবার কার্যত ১২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিটই কেবল চালু থাকে। অথচ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। ফলে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফলে তার ১০ গুণেরও বেশি ক্ষতি হবে।”

সুন্দরবনের ভেতরে বয়ে চলা নদীতে যে দূষণ সৃষ্টি হবে সে প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সাধারণ নৌযান চলাচলের ফলেই সুন্দরবন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন। তাহলে দূষণকারী কয়লাভর্তি বড় বড় জাহাজ চলাচল করলে কিংবা সেই কয়লাভর্তি জাহাজ যদি কখনো ডুবে যায় তখন সুন্দরবনের কী অবস্থা হবে, তা চিন্তা করাও ভীতিকর।’ তাহলে পরিবেশ এর জন্য হুমকী কিনা এ প্রকল্প সেটা আসলে বুঝতে বুদ্ধিজীবি হতে হয় না।

সুন্দরবন শুধু একটি বন মাত্র নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক ইকোপার্ক। আমাদের দেশে হাতেগোনা যে কয়েকটি পর্যটন সাইট আছে সুন্দরবন তার অন্যতম। প্রতি বছর দেশি-বিদেশি কয়েক লক্ষ পর্যটক এর অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে। ভ্রমণপিপাশুদের ক্ষুধা মিটানোসহ যা আমাদের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। উপকূল তীরবর্তী অবস্থানের কারণে এটি আমাদের জন্য একপ্রকার প্রাকৃতিক দেয়াল হিসাবে কাজ করছে।

সুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও শিক্ষা ঐতিহ্য বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। জাতিসংঘের জলাভূমি বিষয়ক সংস্থা রামসার কর্তৃপক্ষ সুন্দরবনকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্ববাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও বিশেষ শ্রেণির ডলফিনের জন্য বিখ্যাত এ সুন্দরবন। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মানুষ, জলযান, যত বেশি চলাচল করবে সুন্দরবনের ভেতরে বাস করা সব প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য তা বিপজ্জনক হবে, এ চিন্তায় ইউনেস্কো, জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি নানা সংস্থা ও ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনকে রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছে বেশ ক’বছর ধরেই।এর মধ্যে এ প্রকল্প তো আছেই ওরিয়ন গ্রুপ বিশাল এলাকা ভরাট শুরু করেছে সেটা আটকাবে কে?

আর অবস্হা দৃষ্টে মনে হচ্ছে রামপাল একটা কনফিউশন তৈরী করেছে সাধারন মানুষদের মধ্যে সরকার দলের সমর্থকদের মধ্যে যারা কট্টরপন্হী তারা এটার পক্ষে বলা বা প্রচরনা করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু যারা এর বিরোধীতা ক রছেন তারা সকলে সরকার বিরোধী এটা ভাবার কোন কারন নেই এরা সাধারন মানুষ হয়তো সাহস করে কিংবা আগ্রাসী হয়ে এদের বেশীরভাগই কোন আন্দোলন এর সাথে নিজেদের কে কারন অহেতুক নিজেকে ঝামেলায় কেউই জড়াতে চায় না।

এই জাতীয় মানুষগুলো তাদের ফেসবুকে ভাইরালের মতো একটা লেখা শোয়ার করছেন বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের টাইমলাইনে-

আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের একজন ‪নাগরিক এবং সংবিধানের ৭ এর (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের ‪মালিক। আমি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তীব্র ‪ প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিদ্যুৎ আমিও চাই কিন্তু ‪সুন্দরবন ধ্বংস করে আমার বিদ্যুৎ-এর দরকার নাই। আমার এ প্রতিবাদ আমলে নিন।’- এমনটা লিখে শেয়ার দিচ্ছেন।

এদের মানসিক অবস্হাটা সরকারকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে, নেয়া উচিত, সোশাল মিডিয়া বর্তমানে অনেক শক্তিশালী, আর সরকারের উচিত প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে কি কি লাভ আমাদের সেটা জনগনের কাছে পরিস্কার করা।
তবে যত যুক্তি তর্কের আসরই বসুক।

বিশ্বব্যাপী সুন্দর বন একটাই, যার একটা অংশের মালিকানা আমাদের বাকী অংশ ভারতের হাতে, আমরা সেভেন ওয়ান্ডার অফ দ্যা ওয়াল্ডে সুন্দরবন এর জন্য পরচারনা চালালাম ভোট দিলাম, আর এ প্রকল্পের কারনে যদি রয়েল বেঙ্গল টাইগার এর একটা ও আমাদের হাতে না থাকে তবে আমদের বাংলার বাঘ শব্দটাই পর হয়ে যাবে, বাঘের গ্রর্জনে মাশরাফী বাহীনি বিশ্ব ক্রিকেট কে আতন্কে ফেলে দিয়েছে তা কখনোই লেখা বা বলা যাবে না কারন সুন্দর বন আমাদের যতটুকু অধিকারে থাকবে সেটিতে বাঘ থাকবেনা থাকবে বিদ্যুতের খাম্বা,কালো কয়লার স্তুপ আর বিষাক্ত ধোয়া, যেখানে নিংশ্বাস নেয়ার মতো কোন বাঘ হয়তো আর বেচে থাকবেনা।