ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

শিশুদের চঞ্চলতা কার না ভাল লাগে? চঞ্চল প্রজাপতির মতো হাসিতে খুশিতে মেতে থাকা শিশু তো বাড়ির সৌন্দর্য্য। এই শিশুই ধীরে ধীরে বড় হয়, লেখা-পড়া শিখে মানুষ হয়। তাকে ঘিরেই বাবা-মা কত স্বপ্ন আঁকেন, কত স্বপ্নের জাল বুনে যান আপন মনে! এই শিশুরাই একদিন বড় হবে, নেতৃত্ব দেবে পুরো জাতির।

পৃথিবীর উন্নত দেশ গুলোতে শিশু যত্নের বিষয়ে দেয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। তাদের লেখাপড়ার পরিবেশ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পাশাপশি খাদ্যের গুণ ও মানের ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। কেননা খাদ্যই তো পুষ্টি যোগায়, শক্তি যোগায়, যোগায় বেড়ে ওঠার সব উপাদান-উপকরণ।

কিন্তু আমাদের দেশে আমরা এসব কি দেখছি? দেখছি ঠিক এর উল্টোটা। এই তো দুদিন আগের কথা। দিনাজপুরে কেমিক্যাল মেশানো লিচু খেয়ে মারা গেল ১৪টি হাসিখুশি প্রাণ। এদের সবার বয়স ২ থেকে ৬ বছরের মধ্যে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) বিশেষজ্ঞরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন যে, ফলে মেশানো বিষ খেয়েই তাদের মৃত্যু হয়েছে।

এখন বাজারে প্রায় সব শাক-সবজি ফলমূল যেমন টমেটো, পেঁপে, কলা, আঙ্গুর, আপেল,কমলাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয়। ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কপার সালফেট, কার্বনেট ধোঁয়া, পটাশের লিকুইড সলিউশনসহ নানা উপাদান ব্যবহার করছে। ফল গুলোকে টাটকা ও তাজা রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিন। আইসিডিডিআরবি জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী এস কে রায়ের এক প্রবন্ধ থেকে জানলাম, মিষ্টি, দই, ছানা, সস, ডালডা, সয়াবিন ও আইসক্রিমের মতো পণ্য ডিসিসি’র গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৭৬ ভাগ খাবারেই রয়েছে ভেজাল । এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত প্যাকেটজাত খাদ্য যেমন ফলের রস, জ্যাম, জেলি, আচার-চাটনিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা রকম রং। আর রাসায়নিক বিষ মেশানো এসব খাবার খেয়ে মানুষ দীর্ঘ মেয়াদি নানারকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসব কেমিক্যাল সহ্য করতে না পারা শিশুরা। তাইতো লিচুর মতো শিশুদের এতো প্রিয় একটি ফল খেয়ে মারা যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম। ফল খেয়ে এতোগুলো শিশু মৃত্যুর খবর কি এর আগে কেউ শুনেছে কোথাও?

চীন-থাইল্যান্ডসহ বিশ্বর উন্নত দেশগুলোতে খাবারে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় কঠোর ব্যবস্থা। দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি। এই তো কিছু দিন আগের কথা, চীনে গুড়ো দুধে মেলামিন মেশানোর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দুই জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগে মেলামিন মেশানো খাবার খেয়ে চীনে মারা গিয়েছিল ৬ শিশু। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কমপক্ষে তিন লক্ষেরও বেশি শিশু। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল চীন থেকে শিশুখাদ্য আমদানি করে এমন দেশের শিশুরাও। এর পরই সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীন থেকে শিশু খাদ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল।

আমাদের দেশেও ভেজাল প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। চালানো হয় ভেজাল বিরোধী অভিযান। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও দেখেছি। কিন্তু তাতে কি এসব বন্ধ হয়েছে। এসব বন্দ করতে হলে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই সাহসী পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেছিলেন মৃত্যুদণ্ড। কোন কোন ক্ষেত্রে রাখা হয়েছিল যাবজ্জীবন থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধানও। তবে সে আইনে কারো কোন দিন সাজা হয়েছে বলে জানা নেই।

এর পাশাপাশি আরো যে সব আইন রয়েছে তা দিয়ে যে ভেজাল প্রতিরোধ সম্ভব নয়, এই সহজ কথাটা বুঝতে কাউকে মহাজ্ঞানী হবার দরকার নেই। মানুষ এতো দিনে তা টের পাচ্ছে হাড়ে হাড়ে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মতো অপরাধের মাত্রা যত বড়, সে তুলনায় বর্তমান প্রচলিত আইনে শাস্তির মাত্রা খুবই সামান্য। আমাদের আইনে খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তাহলে যারা খাবারে বিষ মিশিয়ে নীরবে খুন করে চলেছে পুরো জাতিকে, তাদের শাস্তি কি হওয়া উচিত? ফরমালিন মেশানো খেজুর, আঙ্গুর, লিচু বা মাছ খাওয়ানোর মানে তো শিশুর মুখে বিষই তুলে দেয়া।

শিশুদের নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নানা উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময়ই শুনি। তিনি শিশুদের খুব ভালবাসেন, তাদের খুব পছন্দ করেন এমন সুনামও আছে। এই তো কিছুদিন আগে, প্রধানমন্ত্রী কণ্যা সায়মা ওয়াজেদ অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করে গেলেন, এখনো কাজ করছেন। যে শিশুরা আমাদের ভবিষ্যত, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের আদরের ধন, সেই শিশুরাই মারা যাচ্ছে বিষ মেশানো খাবার খেয়ে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা, প্লিজ এদের বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করুন।
সাজিদ রাজু, বার্তাকক্ষ সম্পাদক, সময় টেলিভিশন।