ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

দৃশ্যপট-০১
সকালের অফিস। সবাই এখনো এসে পৌঁছেনি। তখনো কোলাহল মুখর হয়ে ওঠেনি নিউজরুম। আমার এক জন ঘনিষ্ট সহকর্মী ও বড় ভাই, তার কপালে চিন্তার ভাজ। কাল রাতে ঘুমাতে পারেননি। জানতে চাইলে বললেন, ফেসবুকীয় তর্ক হয়েছে রাতভর। তার পরিচিত একজন একটি পোস্ট দিয়ে বন্ধুদের মন্তব্য জানতে চেয়েছেন, পৃথিবীতি আসলেই নিঃস্বার্থ কিছু আছে কি না। যারাই নিচে মন্তব্য করেছেন, তাদের প্রায় সবাই একমত হয়েছেন, পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ বলে আসলেই কিছু নেই; এমনকি মায়ের ভালবাসাও। আমার সহকর্মী বড় ভাইটি সেসব মন্তব্যের সাথে এক মত হতে পারেননি। কারো কারো সাথে বাকযুদ্ধও হয়েছে। তার মতে, যে মা এত কষ্ট করে সন্তানকে তিলে তিলে বড় করেন, তাঁর কী এমন স্বার্থ থাকতে পারে?
কেউ কেউ বলেছেন, মা সন্তানের কাছে মা ডাক শুনতে চান। এটাই তার স্বার্থ। তাহলে যে ছেলেটি জন্ম থেকেই বোবা কিংবা অটিস্টিক। কোন রকমে বেঁচে থাকে, বোকা বোকা ভাব, বলতে পারে না কথা, চলতে পারে না দু’কদম। তাকে ছেড়ে তো মা এক বিন্দু সময় থাকতে পারে না! তাহলে এ সময় কি জবাব? এমন কি কোন কোন সময় সন্তাসের সারা জীবনের নিশ্চল জীবনের কথা জানার পরও যে বাবা-মা তাকে লালন পালন করে শিশুর মতই আদর যত্নে, কখনো ফেলে দেয়ার কথা ভাবতেও পারে না, তার বেলায় কি হবে? অথচ কোন কোন বন্ধু কি এক অদ্ভুত কারণে, কোন যুক্তিতে বলছেন, মা-ও নাকি স্বার্থ ছাড়া নড়েন না এক চুল!
দৃশ্যপট-০২ টেলিভিশনে একটি মিউজিক ভিডিও চোখে পড়লো। একটি প্রেমের গান। সেই গানে প্রেমিক আর প্রেমিকার চিঠি বিনিময়ের চিত্র। প্রেমিক সাইকেল চালিয়ে গ্রামের রাস্তায় আসছে। প্রেমিকা যাচ্ছে হেঁটে। দু’জনের সাক্ষাতে তারা চিঠির লেনদেন নেয় সেরে। এতটুকুতে কোন সমস্যা নেই। এমন চিত্র অনেক মিউজিক ভিডিও, সিনেমা, নাটকে আমরা দেখে থাকি। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল পোশাক। মেয়েটিকে পরানো হয়েছে হিজাব। আর ছেলেটির মাথায় টুপি, গলায় একটি আরবীয় বিশেষ ধরণের গিলাফ। সাধারণত মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কিংবা হুজুর বা বয়জ্যেষ্ঠ মানুষদের এমন গিলাফ। আমি গ্রামে বড় হয়েছি। একদম পাড়া গাঁ। সেখানে স্কুল আছে, আছে মাদ্রাসাও। কখনোই এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। ধর্মীয় এমন পোশাক তো দূরের কথা, গ্রামের রাস্তায় সাধারণ পোশাক পরেও ছেলে-মেয়েদের আড্ডা-গল্প চোখে পড়েনি। সেখানে এক ধরণের মূল্যবোধের চর্চ্চা করা হয়। বয়স্করা ছেলে-মেয়েদের এক সঙ্গে মেলামেশাকে ভাল দৃষ্টিতে দেখেন না বলেই হয়তো এমনটা দেখা যায়না। এর সঙ্গে শুধু ধর্ম নয়, গ্রামীণ সামাজিক সংস্কৃতিরও একটি সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে শহরে এমন ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তারপরও অমন পোশাকে কেউ প্রেম বা ডেটিং করতে বের হয়েছেন এমন ঘটনা বিরল। তাহলে মিউজিক ভিডিওতে এমন দৃশ্য কেন?
এর উত্তরও পেয়ে গেলাম। আমারি এক বন্ধুর কাছ থেকে। তিনিও আমার সঙ্গে ওই মিউজিক ভিডিও দেখছিলেন। দেখছিলেন আর নির্মাতার প্রশংসা করছিলেন। ব্যাপারটি তার কাছে ছিল চমকপ্রদ এক প্রগতিশীলতা আর আমাদের আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ। তার চিন্তাটা ছিল এমন, যাক এবার ভিন্ন কিছু দেখা গেল। মাদ্রাসার ছেলেমেয়েদেরও আমরা বাইরে বের করে আনতে পারলাম। এই ভিডিও দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। রাস্তা ঘাটে এমন দৃশ্যও চোখে পড়বে। এই ব্যাপারটি নিয়ে বেশ কয়েক জনের সঙ্গে আলাপে বুঝলাম, চিন্তাটি আসলেই ব্যতিক্রম। কেউ কেউ এটিকে উস্কানীমূলক হিসেবেও বর্ণনা করলেন। তাই কিছু কিছু মানুষের কাছে এটা ভাল লাগবেই। কারণ তারা মনেই করেন সমাজের বহু বছরের রীতি-নীতির বিরুদ্ধে যেয়ে কিছু করে দেখানোর নামই প্রগতিশীলতা। সেই ব্যতিক্রম খারাপ হোক কিংবা ভাল, সমাজের মূল্যবোধের বিরোধী কিংবা পক্ষের। তাতে তাদের কিছুই আসে যায় না। তারা নিজেরা আলোচনায় কিংবা সমালোচনায় যেভাবেই হোক, দৃশ্যপটে থাকেন, সেটাই তাদের চাওয়া।
প্রেক্ষাপট -০৩: ইদানিং একটি টিভি বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির ইন্টারনেট প্যাকেজ এর বিজ্ঞাপন। মা ও মেয়ে বিজ্ঞাপনের মডেল। দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে রাজধানীর হাতির ঝিলের কোন স্পটে শ্যুট করা। মা স্কুটি মোটর সাইকেল চালিয়ে এক জায়গায় থামেন। তার পেছনে মেয়ে। দুজনের মধ্যে আলাপ আলোচনা শুরুতেই ‘মা’ বলেন ‘এবারের ছেলেগুলো কিন্তু একদম….’ মেয়ে থামিয়ে দেন। মেয়েটি কিছুটা লজ্জা পায়। তারপর মা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘একবার ইনবক্স চেক করলে কি হয়? তারপর মেয়ের ইন্টারনেট নেই দেখে মা ইন্টারনেট প্যাকেজ শেয়ার করেন আর মেয়েকে অনুরোধের সুরে উপদেশ দেন, ‘নে ইন্টারনেট শেয়ার করে দিলাম, দেখনা লাইফ শেয়ার করার মতো ড্যাশিং কাউকে পাশ কি না!’
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সহকর্মী আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, আমাদের সমাজটা এখনো পশ্চিমা কায়দা কানুন শিখে উঠতে পারে নি। তাই আমাদের বাংলাদেশের মতো এমন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এমন পশ্চিমা ধাঁচের বিজ্ঞাপন বেমানান। অথচ কারা নির্মাণ করেন এমন বিজ্ঞাপন? মিডিয়াতে আবার প্রচারও হচ্ছে এসব। বিজ্ঞাপন নির্মাতা এবং মিডিয়াগুলোর রুচি নিয়েও প্রশ্ন তুললেন তিনি। তার বক্তব্য, সমাজে গুটিকয় মানুষ, বিশেষ করে উচ্চবিত্তদের একটি অংশ পশ্চিমা ধাঁচের জীবন যাপনের চেষ্টা করছেন। এতে আমাদের সমাজের মূল্যবোধ যেমন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ঘটছে নানা অনাকাঙ্খিত অঘটনও।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, সমাজের উচ্চ বিত্ত মানুষদের ছেলেমেয়েদের বখে যাওয়ার পেছনে এটাও একটা কারণ যে, তারা যখন চাওয়া-পাওয়ার প্রান্ত বিন্দুতে চলে যায়, না পাওয়ার আক্ষেপ থাকে না, কোন কিছুই আর পূরণের আকাঙ্খা থাকে না, তখন তারা নতুন কিছু চায়। তাই তো মোটর সাইকেল কিনে না দেয়াতে বাবা-মা’কে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারে ছেলে। তাইতো জঙ্গি হয়ে মানুষ হত্যা করতে পারে বখে যাওয়া তরুণরা। কেননা, জীবনের কি মানে, সমাজের কি রীতি-নীতি, শৃঙ্খলা তা কি তারা জানছেন ঠিক মতো? তাদের আর কতই দোষারোপ করা যায়? আমরা কি তাদের দিতে পারছি শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি সুন্দর সমাজ। অথচ তার বিপরীতে গুটিকয়েক মানুষ কি সামনে এগিয়ে চলার নামে উস্কে দিচ্ছি না অসুন্দরের ছাই চাপা আগুন? ভেবে দেখার সময় এসেছে।
সাজিদ রাজু
সংবাদকর্মী