ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
বৃহস্পতিবার মানেই ছিল স্বপ্নের, আনন্দের। বৃহস্পতিবারের স্কুল ছিল আকর্ষণীয় অন্য দিনগুলো চেয়ে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোকে কোমাননীয় ন স্যারের ক্লাস আগে, কারটা পরে, টিফিনের আগে ও পরে কার কার ক্লাস অনেক চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ক্লাসঘরে পৌছানোর তাড়া বা আলস্য অনুভব করতাম। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বৃহস্পতিবার। কেননা, ওইদিনই স্কুলের নিচ তলার লাইব্রেরি রুমটি থাকতো খোলা। আনিস স্যার একটা বাঁধাই করা খাতা নিয়ে বসে থাকতেন। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীম উদদীন, শরৎ, সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমদসহ শিশু বয়সের নাম জানা না জানা অসংখ্য কবি লেখকের কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্পের বই থাকতো তার চারপাশ দিয়ে থরে থরে সাজানো। ঘণ্টা পরার সাথে সাথে ব্যাগ নিয়ে এক দৌড়ে সেই ঘরে।
যদিও একটা বেশি বই নেয়া যেত না, তার পরও যতক্ষণ সময় পাওয়া যেত, নিজের পছন্দের বইটি আলাদা করে রেখে অন্যগুলো নেড়েচেড়ে দেখতাম। সপ্তাহে ওই একদিন মাত্র খোলা হতো লাইব্রেরির ঘর। এক সপ্তাহ পর আগের বইটি জমা দিয়ে আবারো নতুন বই নেয়ার হাতছানি। সেই দিনগুলো যে কি আনন্দের ছিল বোঝানো যাবে না।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বর্তমানে বেশিরভাগ স্কুলের লাইব্রেরি ঘরই নেই। যাদের লাইব্রেরি আছে, হয় সেখানে বসে বড়ার ব্যবস্থা, বাসায় বই নেয়া যায়না। অথবা সারা বছর বইগুলো থাকে তালাবদ্ধ অবস্থায়। ময়লার আস্তরণ পড়ে, বৃষ্টির পানি পড়ে, তেলাপোকা-উইপোকায় কেটে সেই বই নষ্ট হয়। এক পাতা একপাতা করে কেটে ভেতরে নকসা কেটে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। অথচ বুদ্ধিজীবীরা হতাশ হন, এখনকার যুগের ছেলে-মেয়েরা কেন দিন দিন বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে? কেন হলি আর্টিজান, শোলাকিয়ার মতো আত্মঘাতি হামলা চালাচ্ছে? কেন সাইবার অপরাধের দিকে দিনকে দিন অগ্রসর হচ্ছে? এসব নানা প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছে, কিন্তু কোন উত্তর মিলছে না।
অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে না হলেও, প্রায় সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটা লাইব্রেরি অথবা একটা বই সমেত আলমারি বা বুকসেল্ফ অবশ্যই আছে। শিক্ষকদের মধ্যে যে কোন একজনকে এই লাইব্রেরি চালানোর একটু দায়িত্ব দিলেই হয়। বেশি না সপ্তাহে মাত্র এক দিন। যেন শিক্ষার্থীরা একটা মাত্র দিন এই লাইব্রেরির বই এর সন্ধান পেতে পারে। বই আছে, শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী বা বই পড়ার পাঠক আছে। শুধু দরকার একটুখানি উদ্যোগ, এক টুকরো ভালবাসা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
আর সরকারেরও অবকাঠামোর অভাব নেই। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মতো বিশাল একটা সরকারি অফিস আছে, তাঁর লোকবল আছে, পর্যাপ্ত বই আছে। আপনাদেরও দরকার একটু সদিচ্ছা। আপনারা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যে যেখানেই থাকুন না কেন, মনে রাখবেন আপনার আসনটি আপনার জন্য চিরস্থায়ী নয়। আপনাকে একদিন সরে দাঁড়াতেই হবে ওই দায়িত্বশীল পদ থেকে। তাই আপনার শূণ্যস্থান যেন আরো ভাল, যোগ্য, দায়িত্বশীল ব্যক্তি পূরণ করতে পারে, সে দায়িত্বটাওতো আপনারই। তা না হলে দেশটা এগোবে কিভাবে? তাই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, সংস্কৃতি মন্ত্রী, সম্মানিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানবৃন্দ, প্লিজ একটু সজাগ হোন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে অবহেলা করবেন না।
সাজিদ রাজু
গণমাধ্যমকর্মী