ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ‘মনির’ (ছদ্মনাম)। ফুরফুরে মেজাজে সকাল সকাল ক্লাসে চলে এসেছে। গেটের কাছে আসতেই দারোয়ানের ইশারায় থামতে হলো। হাতে মেটার ডিটেক্টর নিয়ে প্রস্তুত দুই সিকিউরিটি গার্ড। তাড়াহুড়ো করে আসায় আইডি কার্ড আনতে ভুলে গেছে। তাই কোন ভাবেই তাকে ঢুকতে দেয়া হলো না। ক্লাসের প্রিয় এক শিক্ষক সুপারিশ করার পরও তাকে বাইরেই থাকতে হলো। হিসাব শাখা ও অন্যান্য বিভাগগুলোতেও স্টাফদের সঙ্গে প্রায়ই ঘটে শিক্ষার্থীদের নানা কথা কাটাকাটির ঘটনা। এ এক ভিন্ন পরিবেশ।

এসব প্রতিষ্ঠানের দারোয়ান-পিয়ন-নাইটগার্ডরা মালিকদের এক ধরণের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের আচরণ এক দিকে যেমন চরম খারাপ। অন্যদিকে লাখ টাকা খরচ করে পড়ালেখা করলেও সেই শিক্ষার গ্রাহক হিসেবেও ন্যুনতম মর্যাদাও তারা পায় না। শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নয়, ঢোকে চিড়িয়াখানায়! মুক্তি বুদ্ধি চর্চার সুযোগ কতটা তাহলে থাকবে এসব প্রতিষ্ঠানে? অথচ নাম বিশ্ববিদ্যালয়!

আচরণের সৌজন্যতা নেই বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিতদেরও। লক্ষ্য করলেই চোখে পড়বে শিক্ষার্থীরা এদের স্যার সম্বোধন করতে বাধ্য হয়। স্যার না বললে ‘তাঁদের’ চোখ কপালে ওঠে। আড়চোখে দেখে নেয় ‘কে এমন বেয়াড়া’? তার অর্থ দাপ্তরিক কাজের জন্য যাদের নিয়োগ দেয়া হয়, তাদেরও ঠিকমত প্রশিক্ষণ বা নির্দেশনা দেয়া হয় না। যতটুকু দেয়া হয়, তা হলো কাকে কত রকম প্যাচে ফেলে জরিমানা আদায় করা যায়, কাকে কতটা শাসন করে নজরদারির মধ্যে রাখা যায়, এসব নিয়ে।

সময়ের প্রয়োজনেই গড়ে উঠেছে বেসরকাররি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। লাখো শিক্ষার্থীর স্রোত প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে। সামাল দিতে পারছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। নেই পর্যাপ্ত সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সঙ্গে আসন সংকট, লেজুড়বৃত্তির নোংরা রাজনীতি, সেশন জট, আবাসন সংকটসহ নানা সমস্যা লেগেই আছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে। তাই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার চাহিদার উত্তাল ঢেউ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। তাই বাধ্য হয়েই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয় সরকার।

এই সুযোগ পেয়ে বসলো বিজনেস টাইকুনদের। কেউ কেউ নিজেরা উচ্চশিক্ষিত হলেও অনেকেই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। অন্তত বলাই যায় সুশিক্ষিত নয়। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে সুপ্রশিক্ষিত মনোভাব। উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে আবার ব্যবসার মনোভাবতো আছেই। তাই বেসরকারি এসব বিশ্ববিদ্যালয় এখন লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

যারা শিক্ষার আলো জ্বালাবার শ্লোগান দিয়ে মাঠ কাপাচ্ছেন, সেই তাদের অবস্থাই কি? তারা মূলত এক ধরনের রাজ্য বানিয়ে নিয়েছেন, যার রাজা উদ্যোক্তা নিজে, সেনাপতি তার ছেলে কিংবা ভাই, উজির ভাতিজা কিংবা স্ত্রী ইত্যাদি। অর্থাৎ একই পরিবারের সদস্যরাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে।

নতুন একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম, বিশ্ববিদ্যালয় মালিকদের মধ্যে এক ধরনের ‘ভিভিআইপি’ প্রটোকল নেয়ার প্রবণতা। তারা যে লিফটে উঠবেন, সেই লিফট রিজার্ভ রাখা হয়। সেখানে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই। তারা যে বারান্দা দিয়ে হাঁটবেন, সেই বারান্দার দিকে ভুল করে হলেও উকি দেয়া যাবে না, পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া তো দূরের কথা। যখন যে ভবনে যাবেন, সেখানে যেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের এক ধরণের মহড়া দিতে দেখা যায়। যেন প্রাচীণ কালের সেই জমিদার বা ব্রাহ্মণ মশাইদের সময়। তিনি আসছেন, সবাই জুতো খুলে হাতে নাও। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকো। কেউ যেন চোখে চোখ রেখে না তাকায়। তাকিয়েছো তো, ব্রাহ্মণের জাত গেল। সাতবার গঙ্গাজলে ধুয়ে না দিলে আর তা পবিত্র হচ্ছে না।

এই যদি হয় শিক্ষা উদ্যোক্তাদের মানসিকতা আর তাদের প্রতিষ্ঠিত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থী যারা বেসকরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে পড়তে বাধ্য হন, তারা কি শিখবেন? শিক্ষা ক্ষেত্রের উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি যে মহান হওয়ার চেষ্টায় মগ্ন, আপনার এমন বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা ফাঁস হয়ে গেলে তখন কোথায় মুখ লুকাবেন মশাই?

সাজিদ রাজু
সংবাদকর্মী