ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

কয়েকবছর আগে কলকাতার একটি পত্রিকায় সুরকার-গায়ক কবীর সুমন ‘মন-মেজাজ’ শিরোনামে কলাম লিখেছিলেন। পরে সেই লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ হয়েছিলো। ওই সময় একটি ঘটনা লিখেছিলেন এক সময়ের সুমন চাটুজ্জে।

কোনও এক এফএম রেডিও স্টেশনের জন্য একটি শুভেচ্ছা বার্তা রেকর্ড করার অনুরোধ করা হয়েছিলো তার কাছে। সেই বার্তাটি ছিলো বাংলায় তবে রোমান হরফে লেখা। নিজস্ব ঢঙে বেশ জমিয়ে ছোট্ট একটা কলামে সেই কথাই লিখেছিলেন তিনি।

ভারতের পশ্চিমবাংলায় বাংলা নিয়ে কী হচ্ছে, না হচ্ছে সেটা নিয়ে কথা বলাটা কতটুকু সমীচীন তা বুঝতে পারছি না। বাঙালি অধ্যুষিত রাজ্য হলেও পশ্চিমবাংলা অন্য একটি দেশ। তাদের বিষয়ে কথা বলার জন্য রাজ্যটির অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন। আর বাংলাদেশে আছেন কিছু ‘বিদ্বেষী’। অবশ্য বন্ধুও থাকতে পারেন।

যা বলার জন্য উপরের বিষয়টির টেনে আনলাম তা হলো আমাদের সঙ্গীত চর্চা। এই নিম্নমধ্যবিত্ত বাংলাদেশি-বাঙালি আমি মোটেই কোনও সঙ্গীত বোদ্ধা নই। একজন নিম্নমানের শ্রোতা মাত্র। যে শৈশবেই তার পিতার মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত (গীতি) আর আধুনিক গানের সাথে।

পিতাও ছিলেন এক শ্রোতা। যে সময়টার কথা বলছি তখন সিডি প্লেয়ারের নাম শোনা যেত না। আধুনিক অন্যান্য অনুষঙ্গ তো দূরের কথা। ছিল রেডিও আর ক্যাসেট প্লেয়ার।

সেই সময় আরেক ধরনের গানের শ্রোতা ছিলেন যারা ঢাকাই চলচ্চিত্রের গান শুনতেন। বশির আহমেদ, আব্দুল জব্বার, মাহমুদ উন নবী, সাবিনা ইয়াসমিন, আব্দুল হাদী, রুনা লায়লা, সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোরসহ আরও অনেকের গানের শ্রোতা। তেমনই একজন শ্রোতা ছিলেন আমার একজন অগ্রজ আত্মীয়। যিনি বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন। সেই সময় মানে গত শতকের ৮০-৯০ দশকে বাংলাদেশ বেতারের ঢাকা স্টেশন থেকে চলচ্চিত্রের গান নিয়ে দুপুরে একটি অনুষ্ঠান পরিচালিত হত। ওই অনুষ্ঠানের শ্রোতা আমার অগ্রজ আত্মীয় মোটামুটি বিশাল তথ্য কোষ হয়ে উঠেছিলেন। সিনেমার নাম, গানের শিরোনাম আর শিল্পীর নামের জন্য আমাদের একান্নবর্তী পরিবারতো অবশ্যই, পাড়ার অনেকেই তার ওপর নির্ভর করতেন।

একবার ওপার বাংলার প্রথিতযশা এক শিল্পীর কাছে শুনেছিলাম, তাদের সময়ে  শিক্ষার এক প্রকার মাধ্যম হিসেবে কাজ করতো রেডিও।

যেমন সকালে কোনও একটি গান চলবে রেডিওতে। তার আগে ঘোষক বলে দিতেন এখন অমুক শিল্পী গান গাইবে। ভৈরব রাগের গানটির শিরোনাম অমুক। এখানে আলাদা করে বলে দেওয়া লাগছে না ভৈরব সকালের রাগ।

এখন সেই রেডিও নেই। আছে হয়তো আরও অনেক যন্ত্র। কিন্তু শিক্ষার ওই পদ্ধতিটিও নেই। রুচি বেড়ে উঠছে না শ্রোতার। তাই একটু সুরেলা কণ্ঠে কিছু একটা গাইলেই সকলে হামলে পড়ছে। ইউটিউব আর ফেইসবুক পাতায় সেই গান পোস্ট করলে লাইক আর কমেন্টের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে সব কিছু।

সঙ্গীতের কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সাধনা ছাড়াই হয়ে উঠছে  ‘জনপ্রিয়’  শিল্পী। ‘নজর কাড়া’ অভিব্যক্তি আর হাসি দিয়ে গান গাইলেই বিরাট শিল্পী।

প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা ভিন্ন কথা হয়তো বলতে পারেন। কিন্তু জনাব-জনাবা, সঙ্গীত চর্চা করতে হলে শিক্ষার দরকার আছে বৈকি। শ্রোতা হতে হয়তো লাগে না (বলতে পারেন নিজের জন্য সুবিধা তৈরী করে নিলাম)।

যে শিল্পী লাইক-কমেন্টে ভাসছেন তার কথা বাদই দিলাম। নিজেকে প্রকাশ করতে কে না চায়? কিন্তু আমাদের গণমাধ্যমও তাদের ভাসানো থেকে উঠিয়ে উড়িয়ে নিচ্ছে।

এখানে গণমাধ্যমের কী কোনও দায়িত্ব নেই? গণমাধ্যম কী রুচি তৈরির কাজ করবে না? দায়িত্বশীল গণমাধ্যম তো সমাজে রুচি তৈরীর কাজ করে। সেই রুচি নিশ্চয়ই কোনও কোম্পানির চানাচুরের ব্র্যান্ড নেম নয়।

গত শতকের  ‘৭০  দশকের পর বাংলাদেশে যেসব গান তৈরি হয়েছে তার মধ্যে কয়টা এখনও নাগরিকরা মনে রেখেছে?  খুব অল্পই বোধ করি। এটা কেন? কারণ শ্রোতার কানে সঙ্গীত দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেনি।

সঙ্গীত বলছি, গান নয়। তবে গান আর সঙ্গীতের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা অন্য কোনও সময়ের জন্য তুলে রাখলাম।

প্রসঙ্গে ফিরে আসি। শ্রোতার কানে সঙ্গীত দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেনি বলেই সেই গান এখনকার প্রজন্ম শুনছে না। আসলে এই প্রজন্ম কী শুনছে সেটাও যথেষ্ট আলোচনার দাবি রাখে। তবে  এই জায়গাটাতেই গণমাধ্যমের কাজ।

বাংলাদেশের প্রথিতযশা সঙ্গীতকারদের নিয়ে কয়টা গণমাধ্যম  অনুষ্ঠানের আয়োজন কিংবা বিশেষ আয়োজন করেছে? যারা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তাদের তৈরি সুর নিয়ে কয়টা অনুষ্ঠান হয়েছে?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের  ‘লাইক’ প্রিয় গায়ক-গায়িকা নিয়ে দেখেছি বেশ কিছু গণমাধ্যমের অনুষ্ঠান। ওইসব প্রতিষ্ঠান কি একবার হলেও শ্রোতা-দর্শককে মনে করিয়ে দিয়েছে যে সঙ্গীত একটি সাধনার বিষয়? হয়তো স্বল্প সময়ের জন্য একজন প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতার মন জয় করেছে, কিন্তু এতে কী সঙ্গীত সাধনা হয়?

একদম শুরুতে যে ঘটনাটা বলেছি তা টেনে আনবার কারণ হচ্ছে, হয়তো সামনে ওরকমভাবে সঙ্গীত শেখার কোনও পদ্ধতি চালু হয়ে যাবে; যাতে রোমান হরফের বাংলা লেখার মত অন্য কোনও পদ্ধতি আবিষ্কার হবে। তার বদৌলতে অনেকেই ইউটিউবে দুটো গান পোস্ট করতে পারবেন। হায়, সে সুখ কি কপালে আছে?

এই লেখার জন্য ‘এখনকার সময়ের শ্রোতারা’ হয়তো চাইবেন আমাকে পুলিশ, র‌্যাব কিংবা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাক। নিশ্চয়ই আমি কোনও ‘সন্ত্রাসী’ অথবা ‘অনুভূতি আঘাতকারী’।