ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

একজন চাকুরিজীবী মানুষের স্বপ্ন থাকে অবসর নেয়ার পরে পেনশনের টাকাই তার আসল সম্বল। সারাটা জীবনের কর্মরত সময়ের এইটুকু আশাই তাদের বুক ভরায়। শেষ জীবনে এসে হয়ত এই পেনশনের টাকাটাই তাদের কাছে প্রধান এবং প্রথম উৎস। প্রত্যেক চাকুরীজীবি মানুষই এই স্বপ্নটাকে আকড়ে রাখে। পেনশনের টাকা পেলে অন্তত কারো কাছে হাত পেতে জীবনের শেষ সময়ে বাঁচতে হবে না।

তবে আমাদের দেশে পেনশন নিয়ে টেনশন নতুন কোন বিষয় নয়। পেনশনের টাকা পেতে হলে পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগের। আর টেবিলে টেবিলে হয়রানি হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাও থাকে। তবে যখন পেনশনের টাকাটা তার পরিবারের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তখন এই হয়রানি তাদের জন্য কতটা কষ্টের হয়ে থাকে তা হয়তো আমরা অনুভব করতে পারি না। এমনই ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে দৈনিক জনকণ্ঠ-এ। গত ৫ জুন মঙ্গলবার ‘পেনশন ভোগান্তি’ নিয়ে একটি মর্মান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে জানানো হয়, স্বামীর পেনশনের টাকা পাওয়ার অপোয় ৩৯ বছর ধরে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বৃদ্ধা নেকজান বেওয়া।

ওই সংবাদ বলা হয়, ময়মনসিংহের জিএ এস্টেটের সহকারী তহসিলদার ছিলেন নেকজান বেওয়ার স্বামী নেওয়াজ উদ্দিন। ওই চাকরিতে তিনি ১৯৫০ সালে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সালের ৪ জানুয়ারি চাকরিরত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী নেকজান, ছেলে আতিউর রহমানসহ ৩ মেয়ে রেখে যান।

অসহায় নেকজান বেওয়া ছেলেমেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ঢাকায় ভূমি প্রশাসন বোর্ডে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে স্বামীর পেনশনের টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় তদবির করতে শুরু করেন। দীর্ঘদিন পর ঢাকার ভূমি প্রশাসন বোর্ড ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এক হাজার ৮৭৭ টাকা ৪ পয়সা পারিবারিক পেনশন উত্তোলনের মঞ্জুরি প্রদান করেন। মঞ্জুরিপত্রে ওই পাওনা বিনা অনুসন্ধানে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক কার্যালয়কে প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।

কিন্তু এরপর শুরু হয় ‘পেনশন ভোগান্তি’র কাহিনী। নেকজান বেওয়া মঞ্জুরিপত্র নিয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ওই টাকা পাওয়ার আশায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। এভাবে অনেক দৌড়াদৌড়িতেও কোন কাজ হয় না।

কোন কূল-কিনারা না পেয়ে নেকজান বেওয়া বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার শরণাপন্ন হন। প্রধান উপদেষ্টার দফতর থেকে পাঠানো হয় পেনশন পরিশোধের তাগিদপত্র। কিন্ত তার তাগিদপত্রেও কোন সুফল মেলেনি। এভাবেই পেনশনের আশায় কেটে গেছে ৩৯টি বছর। আর কত দিন অপো করতে হবে কিংবা আদৌ তিনি স্বামীর পেনশনের টাকা পাবেন কিনা সে কথা অজানাই থাকছে আপাতত।

প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত প্রতিবেদনে যে মর্মাহত তথ্য এসেছে- তা কি আমাদের কারও কাম্য। আমার সাথে সবাই একমত হবেন যে এটা এক ধরণের নোংরামি। তা না হলে অসহায় এ বৃদ্ধাকে এভাবে জেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো না। মূলত: যেসব কর্মকর্তা নেকজান বেওয়ার পেনশনের টাকা দিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে , সেসব কর্তাদের এখনও মনে হয়নি তারাও অবসর নিবেন। তাদের পেনশনের টাকাও তার পরিবারের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ন হয়ে যাবে। আর যদি অনিয়ম আর নীতিকে বিসর্জন দিয়ে অগাধ টাকার মালিক হয়ে থাকেন তাহলে হয়তো পেনশনের টাকা প্রয়োজন হবে না। কিন্তু আমাদের কাছে জবাবদিহি না করলেও সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

চাকরি শেষে একজন ন্যায্য পাওনা তুলতে গিয়ে মানুষকে ভোগান্তি মধ্যে পড়তে হবে এটা কোন কাজের কথা নয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত এটা ঘটে চলছে। এটা ক্রমানুসারে চলার একটা সহজ সমীকরণও আছে। তবে আমাদের দেশের প্রত্যেক সরকারই এ ব্যাপারে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত অবস্থা যা ছিল তাই রয়ে গেছে।

তাছাড়া পেনশনের টাকা তুলতে যে প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা অত্যন্ত জটিল। যারা পেনশনের টাকা তুলতে চান তাদের ৮ থেকে ১৬ রকমের কাগজ তৈরি করতে হয়। এই কাগজ তৈরি করতেই অনেক সময় ব্যয় হয়। এরপর নানা জায়গায় তদবির এবং অর্থ খরচ করতে হয়। কাগজ তৈরি করে টেবিলে টেবিলে শিকার হতে হয় ভোগান্তির।

যদিও ২০০৯ সালে পেনশন জটিলতা দূর করতে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে বলা হয়, অডিট আপত্তি ২১ দিনের মধ্যে সুরাহা করা হবে এবং বিভাগীয় মামলা থাকলে তা এক বছরের মধ্যে নিস্পত্তি করতে হবে। কিন্তু এই উদ্যোগটি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকতপক্ষে বিষয়টি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রাখা হয়। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা সর্বোপরি সদিচ্ছার অভাবেই দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে পেনশন ভোগান্তি।

তবে হতাশার কথা হলো- প্রভাব থাকলে মাত্র ১৫ দিনের মাথায় পেনশনের টাকা পাওয়া যাচেছ। কিভাবে যাচ্ছে এমন প্রশ্ন সবাই রাখতে পারেন। ঘটনাটি খুব বেশি দিনের নয়। ২০০৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই পুলিশ সদস্যের পরিবারকে মাত্র ১৫ দিনের মাথায় পেনশনের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার কারণেই এমনটা হয়।

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু সাড়ে তিনবছরের বেশি সময়ে দেশ কতটুকু ডিজিটাল হয়েছে? কোন কোন খাতে ডিজিটালাইজ্ড পক্রিয়া ব্যবহার করে দেশের মানুষকে এর সেবা দেয়া হচ্ছে তা খুজে বের করা বেশ কষ্টের। যেসব প্রয়োজন আমাদের দেশের মানুষের অতিপ্রয়োজন সেসব বিষয়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা রাখা অন্তত জরুরি।

কিন্তু দেশের ডিজিটালাইজড পক্রিয়া অদৃশ্য কারণে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। বর্তমান সকার টে-ারবাজি বন্ধ করার লক্ষ্যে চালু করেছিল ই-টে-ার পক্রিয়া। যেখানে অনলাইনের মাধ্যমে টে-ারিং পক্রিয়া চালানো হবে। তাতে ক্ষমতার অপব্যবহার, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। কিন্তু ই-টে-ার পক্রিয়া কাগজে-কলমে রয়েছে। এর বাস্তবায়ন ঘটেনি। বাস্তবায়ন করতে চায়নি সরকারের লোকজন। এলাকায় টে-ারবাজি বন্ধ হয়ে যাবে এমন কারণেই তাদের কোন ইচ্ছে নেই। গুছ পক্রিয়া করে ঘুষ-দূর্নীতি করা যাবে না- একারণে ই-টে-ারিংয়ে আগ্রহ নেই কর্মকর্তাদের।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় সচিবালয়কে গতিশীল করার লক্ষ্যে ডিজিটালাইজড করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সচিবালয় কম্পিউরাইজড পক্রিয়ার আওতায় এলে মানুষ সবধরনের সেবা অতিসহজে পাবেন এমনটা বলা হয়েছে। আমরাও আশা করছি সেরকমটা হবে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা যেভাবে পূরণ হচ্ছে না তাতে আশংকা থেকে যাচ্ছে- সচিবালয় ডিজিটালাইজড হলেও সেবার মান কি বাড়বে। ভোগান্তি কি কমবে? যদি ভোগান্তি কমে সেটা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবে। আর যদি ভোগান্তি আরও বেড়ে যায় তাহলে মানুষ এর দায়ভার কাকে দেবে- সে প্রশ্নও থেকে যায়।

সর্বোপরি বলা যায়- ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের উচিত দেশের সব জেলা-উপজেলা ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা। শুধু আওতায় আনাই শেষ নয় এর সুষ্ঠু ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনাও থাকতে হবে। তাতে সাধারণ মানুষ এর সুবিধা ও অতিসহজে তাদের প্রত্যাশিত সেবা পাবে। ব্যবস্থাপনা ও তদারকির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে হয়ত নেকজান বিবিকে দীর্ঘ ৩৯ বছর জেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হত না। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন আপনাদের রোষানলে কিংবা আন্তরিকতার বাইরে পরে আর যেন নেকজান বেওয়াকে কষ্ট না করতে হয়।

প্লিজ, তার মতো অসহায় এক বৃদ্ধার কষ্টটা অনুভব করুন। তাতে ওই পরিবারটা যেমন ভালো থাকবে। আর আপনাদের পরিবারও ভরসা পাবে- অন্তত পেনশনের টাকার জন্য আর ভোগান্তি পেহাতে হবে না। দয়া করে পেনশন ভোগান্তি বন্ধ করে নেকজান বেওয়ার অপেক্ষার প্রহরের সমাপ্তি টানুন।

কামাল শাহরিয়ার: