ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ভাবতেই কেমন যেন লাগছে। কাজ না করে কিংবা দায়িত্ব পালন না করে বেতন নেয়া। যদি সে কাজ করেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা। তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রের মানুষ কি শিক্ষা পাবে। তারা শিক্ষা না দিকে নিজের আত্মসম্মান বোধটুকুও তো থাকতে হয়। তা না হলে যাদের টাকা মাস শেষ বেতন হিসেবে নেন তাদের কথা না বলাটা কি অকৃতজ্ঞের মধ্যে পড়ে না। নাকি তাদের কষ্টের টাকা বিলাসিতার জন্য খরচ করতে বেতন-ভাতা হিসেবে টাকা নিতে লজ্জা করে না? এমন প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনও হতে পারে এই প্রশ্নটা শুধু আমার নয়। আমাদের সাধারণ মানুষের সকলের। প্রশ্ন প্রশ্নের জায়গায় থাকলেও উত্তর মেলেনা শুধু।

আমাদের দেশের বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে যোগ না দিয়েও বেতন-ভাতা নিয়ে যাচ্ছেন অকপটে (সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে যে কার্যদিবসে যোগ দেবার প্রয়োজন সে কার্যদিবস বাদে)। সংসদে যোগ না দিয়ে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা তুলে নেয়াটা তাদের এখন অতিগুরুত্বপূর্ণ কাজ। এমনকি বিরোধী দলীয় অনেক সংসদ সদস্যই নির্বাচনী এলাকা থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার নামে বিমান ভাড়াও তুলে নিচ্ছেন। পারলেও হয়তো এর বিদেশ ভ্রমণের ভাড়াও নিবেন ওনারা।

সংসদের তথ্য মতে, সংসদের নবম, দশম ও একাদশ অধিবেশনে টানা ৪৭ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থেকেছে বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত ও বিজেপির সংসদ সদস্যরা। এই তিন দলের ৩৬ সংসদ সদস্য গত ৭টি অধিবেশনের সময় বেতন-ভাতার বাইরে ৫০ লাখ টাকারও বেশি যাতায়াত ও অধিবেশনকালীন অন্যান্য ভাতা তুলে নিয়েছেন।

তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে নবম সংসদের ১১টি অধিবেশনের (এবারের বাজেট অধিবেশন ব্যতীত) মধ্যে বিরোধী দল অংশ নিয়েছে মাত্র ৪টিতে। প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিন ২০০৯ সালের ৭ এপ্রিল বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত ও বিজেপির সংসদ সদস্যরা প্রথম সংসদ বর্জন করেন। এরপর ২য় ও ৩য় অধিবেশনেও যোগ দেয়নি বিরোধী দলের সদস্যরা। তবে টানা ৬৪ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থেকে ৪র্থ অধিবেশনে বিরোধী দলের সংসদরা যোগ দেয়। কিন্তু ৫ম অধিবেশনে মাত্র ১ দিন যোগ দেয়ার পরই আবার দ্বিতয়ি দফা সংসদ বর্জন শুরু করে বিরোধী দল। টানা ৭৪ কার্যদিবস সংসদ বর্জনের পর ৮ম অধিবেশনের মাঝামাঝি সময় ২০১১ সালের ১৫ মার্চ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন। কিন্তু ১৫ মার্চ সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলেও ২৪ মার্চ সংসদ অধিবেশনের সমাপনী দিনে তারা আবার ওয়াক আউট করেন। পরে ৯ম সংসদ অধিবেশন থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আরো সংসদের অধিবেশনে যোগ দেননি।

হিসেব মতে, নিয়ম অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য মাসে ৩৪ হাজার টাকা পারিতোষিক ও ভাতা, বছরে ৭৫ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা এবং ১ লাখ টাকা ঐচ্ছিক ভাতা পেয়ে থাকেন। এছাড়া সংসদ অধিবেশনের সময় নির্বাচনী এলাকা থেকে ঢাকায় আসা ও অধিবেশন শেষে এলাকায় যাওয়ার জন্য যাতায়াত ভাতা হিসেবে সড়কপথে প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১০ টাকা হারে এবং বিমান, লঞ্চ ও ট্রেনের ভাড়া পেয়ে থাকেন। একই সাথে অধিবেশনে যোগ দিলে প্রতি কার্যদিবসের জন্য একজন সংসদ সদস্য ১ হাজার টাকা করে ভাতা পান।

অধিবেশনে উপস্থিত না থেকেও আমাদের দেশের বিরোধী দলের সাথে সম্পৃক্ত এই ৩৬ সাংসদ নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন। এমন খবরটা হয়তো প্রত্যেক সাংসদের স্ব-স্ব এলাকার সাধারণ মানুষ জানেনা না। কিন্তু তাদের জানার বাইরে থাকা এই বেতন-ভাতা গ্রহণ করা কতটা অনৈতিক তা বলা যাচ্ছে না। শুধু বলা যাবে নির্বাচিত সাংসদরা আমাদের মত সাধারণ জনগনের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। এই প্রতারণার বিরুদ্ধে দাড়াবার অবস্থানকে আটকে দিয়েছে আমাদের সংসদের কার্যপ্রণালী বিধান। কেননা সংসদে না গিয়ে বেতন-ভাতা গ্রহণকারী অকৃতজ্ঞ সাংসদরা এ নিয়ে সংসদের আইনকে সামনে এনে খাড়া যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন। সেরকম আমাদের বিরোধী দলীয় চিপ হুইপ জয়নাল আবেদিন ফারুক বেতন ভাতা নিয়ে এক প্রশ্নের পর সাংবাদিকদের বলেন- সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ও প্রচলিত আইন অনুসারে সংসদ সদস্যরা সকল সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। আইনে সংসদ অধিবেশনে যোগ না দিলে অধিবেশনকালীন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নেয়া যাবে না তা বলা নেই। কাজেই এক্ষেত্রে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের ভাতা গ্রহণ অনৈতিক নয়।

যদি সংসদের অধিবেশনে যোগ না দিলেও বেতন-ভাতা নেয়ার আইন তাদের কাছে মুখ্য হয় তাহলে সংসদের অন্যান্য আইন বা কার্যপ্রণালী তাদের কাছে মানার মতো নয়। বেতন কিংবা টাকার বেলায় সংসদের প্রতি অনেক আবেগ আর অধিবেশনের প্রতি অবজ্ঞা। হয়তো এই অনৈতিক কাজের জন্য তাদের লজ্জা করে না। কিন্তু আমাদের লজ্জা করে। কেননা সাধারণ মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের টাকায় ওনাদের বেতন-ভাতা দেয়া হয়ে থাকে। আমাদের কথা না বলে আমাদের সাথে প্রতারণা করে অকৃতজ্ঞের মতো বিলাসিতা কিংবা অন্য প্রয়োজনে বেতনের টাকা হাতে নিতে লজ্জা করে না। নাকি লজ্জা নেই? এর সদুত্তর দিতে পারবেন কি?

কামাল শাহরিয়ার :