ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ হয়তো জামায়াত-ই-ইসলামীকে একটি ইসলামিক রাজনৈতিক দল। ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধীতাকারী এ দলটি নিজেদের ইসলামী দল হিসেবে জোর দাবি করে আসছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি জামায়াত-শিবির কোন ইসলামিক দল নয়। তারা ধর্মকে পুজি করে ব্যবসা আর অপরাজনীতি করে যাচ্ছে। তাদের ইসলামের জন্য কোন কঠোর অবস্থান নয় বরং পাকিস্তান প্রীতি আর ক্ষমতা নিতেই ধর্মকে সামনে নিয়ে এসব কাজ করে যাচ্ছে। যা কখনোই একজন মুসলমানের কাছে কাম্য নয়।

সম্প্রতি শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং ধর্ম ব্যবসায়ী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের যে দাবি দীপ্ত শপথে রূপ নিয়েছে তা শুধু মাত্র জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই ধর্ম ব্যবসায়ী দলটি এ আন্দোলনকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার চক্রান্ত চালাচেছ। ইতিমধ্যে তাদের দোসর বিএনপি এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এজন্য দলটির প্রধানের সাবেক জ্বালানি উপদেস্টা দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও উত্তরা ষড়যন্ত্রের অন্যতম উদ্যোক্তা মাহমুদুর রহমান জামায়াতের হয়ে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তার সম্পাদিত একটি পত্রিকায় ( বিএনপির মুখপত্র হিসেবে বলা হয়। তবে এখন এটাকে বলা হয় রাজাকারের মুখপত্র- যা জামায়াতের সংগ্রামকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে।) আন্দোলন নিয়ে অসৎ উদ্দোশ্য নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে।

যদিও এনিয়ে শাহবাগ থেকে তাকে অবাঞ্চিত করা হয়েছে। তার পত্রিকাকে বয়কটের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দেয়া হলেও তা মানা হয়নি। রোববারও তার বিরুদ্ধে প্রাণনাশের পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগে শাহবাগ থানায় সাধারন ডায়রী করেছে ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পা দত্ত বসু। আমি মনে করে এই বেহায়া মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনি পক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে আমি অন্যসময় লিখবো বলে আশা রাখি। আজ আমি এই লেখায় জামায়াত ইসলামীর মুখোশ খুলতে কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য সবার কাছে তুলে ধরতে চাচ্ছি। এই বাস্তব এবং সত্য তথ্যই প্রমাণ করবে তাদের মুল লক্ষ্য কী? তারা ধর্মকে পুজি করে ব্যবসা করছে। আর ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই নিজেদের দলের মেনুফেস্টার পরিবর্তন করছে ধর্মকে ব্যবহার করছে। নিজেদের স্বার্থে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিবর্তন করছে এমন প্রমাণ সম্প্রতি দিয়েছে তারা। নির্বাচন কমিশনে তাদের সংশোধিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জমা দিয়ে।

বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সব সময়ই দাবী করে তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কিরূপ হওয়া উচিত সেই বিষয়ে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট। এ দেশে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি যেটি তাদের ভাষায় আধুনিক শিক্ষা, এই আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। এমন দাবি তাদের।

দলটির সাবেক আমীর এবং ৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধী গোলাম আযম ‘শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী রূপরেখা’ পুস্তিকার ৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষাই যদি আদর্শ শিক্ষা বলে প্রচারিত হয় তাহলে এ শিক্ষার ফল দেখে কোনো ইসলামপন্থী লোকই সন্তুষ্টচিত্তে এ ধরনের শিক্ষাকে সমর্থন করতে পারে না।’ ১২ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘পাশ্চাত্য মতাদর্শে বিশ্বাসীরা মানুষকে অন্যান্য পশুর ন্যায় গড়ে তুলবার উপযোগী শিক্ষাপদ্ধতির প্রচলন করেছেন। এ শিক্ষা দ্বারা মানুষ্যত্বের বিকাশ অসম্ভব।’ এই বইয়ের ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে, ‘আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের গোটা পরিবেশ একেবারেই ইসলামবিরোধী।’

ভালো কথা, কিন্তু জামাতের মূল নেতাদের সন্তানরা কোথায় পড়াশোনা করছে/ করেছে? এমন প্রশ্ন সামনে আসলে- সবাই হয়তো মনে করবেন নিশ্চয়ই মাদ্রাসা-মক্তবে? কিন্তু এমন প্রশ্নে উত্তর খুজে যা পাওয়া গেছে তা সবাইকে অবাক করে দেবে। অনুসন্ধানে করে পাওয়া গেল এর উল্টো চিত্র। কিন্তু কেন ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলে নিজেদের ছেলেমেয়েদের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াচ্ছেন – এই ব্যাখ্যা গোলাম আযমের কাছে চাইতে গেলে সেই ভন্ডটা নির্লজ্জভাবে বলেছিলেন- “আমি আমার ছেলেদের মাদ্রাসায় দেইনি এজন্য যে আমি তাদের যোগ্য বানাতে চাই”

এখানে আমার প্রশ্ন, যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষার গুনাগুন কীর্তন করে অন্যকে মাদ্রাসায় পড়ার জন্য প্ররোচিত করে গোলাম আজম। কিন্তু নিজের ছেলে-মেয়েদের বেলায় মাদ্রাসায় পড়ায় না। তাহলে কি মাদ্রাসায় পড়লে যোগ্য ভাবে মানুষ গড়ে উঠে না? যদি না-ই উঠে, তবে হাজার হাজার মানুষকে গোলাম কেন বিভ্রান্ত করছে? কেন করছে এই সকল মিথ্যাচার? এ প্রশ্নের উত্তর আমি এই মুহুর্তে না পেলেও সবার কাছে অনুরোধ করছি, আপনারাই বিচার করবেন। যারা নিজেদের ইসলামী দল দাবি করে এতসব ভালো ভালো কথা বলে কিন্তু তাদের নিজের পরিবারের জন্য সেসব কথার বাইরে চলছে কেন?

শুধু গোলাম আযম নয়, জামায়াতের শীর্ষ নেতাসহ বেশিরভাগ নেতারা নিজেরাও মাদ্রাসা পড়াশুনা করেনি। আবার তাদের ছেলে মেয়েদেরও মাদ্রাসার শিক্ষায় শিক্ষিত করেন নি। শীর্ষ জামায়্তা নেতাদের ছেলে মেয়েরা কোথায় পড়েছে বা পড়ছে তা আলোচনা করা দরকার বলে তা উল্লেখ করলাম-

জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম সাংসারিক জীবনের ৬ ছেলের জনক তিনি। এদের মধ্যে- ১. আব্দুল্লাহহিল মামুন আল আযমী- খিলগাঁও গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার থেকে অর্থনীতিতে এমএ করেছেন।
২. আব্দুল্লাহ হিল আমিন আল আযমী- খিলগাঁও গর্ভমেন্ট স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দেশত্যাগ এবং লন্ডনে নিটিং ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেন।
৩. আব্দুল্লাহ হিল মোমেন আল আযমী- সিদ্ধেশ্বরী স্কুল থেকে এসএসসি, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ থেকে এইচএসসি এবং একই কলেজ থেকে বিকম পাস করেছেন।
৪. আব্দুল্লাহ হিল আমান আল আযমী- ১৯৭৫ সালে সিলেট সরকারি অগ্রগামী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি, ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ থেকে তৃতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন (সবার জন্য নির্ধারিত তারিখের একমাস পর তিনি মিলিটারি একাডেমীতে যোগদান করেন)। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণী পাওয়া একজন অতি সাধারণ ছাত্র জিয়ার সময় সেনাবাহিনীতে কিভাবে কমিশন পেলেন সে প্রশ্ন অনেকেরই। ২০০৯ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে কর্মরত অবস্থায় তিনি বরখাস্ত হয়।
৫. আব্দুল্লাহ হিল নোমান আল আযমী- ঢাকা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে এসএসসি ও ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন।
এবং ৬. আব্দুল্লাহ হিল সালমান আল আযমী- মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অর্নাসে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এরপর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মার্স্টাস করেন।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ
৩ ছেলে ও ১ কণ্যা সন্তানের জনক। এদের মধ্যে- ১. আলী আহমেদ- আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থকে কম্পিউটার সায়েন্সে অর্নাস করেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ইউনিভার্সিটিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন।
২. আহমেদ আহকিক- মগবাজার আইএস স্কুল কলেজ থেকে এসএসসি, এইচএসসি করেছেন ঢাকা কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে অর্নাস করেছেন।
৩. আহমেদ মাবরুর- আইএস স্কুল থেকে এসএসসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অর্নাস, আল মানারাত ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছেন। এবং একমাত্র মেয়ে তামরিনা- ভিকারুননিসা স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি এবং আল মানারাত ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশে অনার্স করেছেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা (যার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথমে যাবজ্জীবন রায় ঘোষণা হয়েছে। যদিও এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন পক্রিয়াধীন) ৪ মেয়ে ও ২ ছেলের জনক। এদের মধ্যে- ১. আমাতুল্লাহ পারভীন- ইস্পাহানী গার্লস স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইসএসসি, ইডেন কলেজ থেকে অর্নাস ও মাস্টার্স করেছেন।
২. হাসান জামিল- বাদশাহ ফয়সাল স্কুল থেকে এসএসসি, তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচএসসি ও ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেছেন।
৩. আমাতুল্লাহ ইসায়মিন- এসএসসি ও এইচএসসি ইস্পাহানী স্কুল ও কলেজ থেকে, অনার্স করেছেন হোম ইকোনমিক্স কলেজ থেকে এবং একই কলেজে ফুড অ্যান্ড নিউট্রেশন বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন।
৪. হাসান মওদুদ- রাইফেলস পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি পাশ করেছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে সে।
৫. আফতুল্লাহ লারদীন- ইস্পাহানী গার্লস স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেছেন। এবং ৬. আমাতুল্লাহ নাজনীন- ইস্পাহানী গার্লস স্কুল ও কলেজে পড়েছেন। তবে সর্বশেষ কোথায় আছেন তা এখনো জানা যায়নি।

দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ( যার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা চলছে) ব্যাক্তিগত জীবনে ৫ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানের জনক। এদের মধ্যে- ১. হাসান ইকবাল ওয়ামী- ন্যাশনাল ব্যাংক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেছেন। এরপর ইসলামি ইউনিভার্সিটি থেকে মিডিয়া এন্ড ম্যাস কমিনিকেশনে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন।
২. হাসান ইকরাম- ন্যাশনাল ব্যাংক স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে অনার্সে পড়াশুনা করছেন।
৩. হাসান জামান- এসএসসি ও এইসএসসি ন্যাশনাল ব্যাংক স্কুল থেকে, অনার্স করেছেন মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে।
৪. হাসান ইমাম- এসএসসি ও এইচএসসি ন্যাশনাল ব্যাংক স্কুল থেকে এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ করেছেন। এবং আহম্মদ হাসান জামান- একাডেমিয়া ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে ও লেবেল শেষ করেছেন। এবং একমাত্র কণ্যা আতিয়া মিরপুর লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়াশুনা করছে ।

এছাড়া জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ নেতা সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাসেম আলী এবং ইসলামী ঐক্যজোট নেতা এবং মাসিক মদীনা পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের ছেলে মেয়েরা মাদ্রাসা শিক্ষায় দীক্ষা না নেয়ার তথ্য প্রমাণ মিলেছে। যা আগামী পর্বে তুলে ধরা হবে।

[এই মন্তব্য কলামে পূর্নতা দেয়ার জন্য ২০০৮ সালে ‘সাপ্তাহিক ২০০০’-এ হাসান নিটোলের লেখা প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের সহায়তা নেয়া হয়েছে।]

লেখক : কামাল শাহরিয়ার, সহ-সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ।