ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

আজ (শুক্রবার) আর কাল মিলিয়ে ২০১১ বিদায় নিতে বাকি মাত্র ২দিন। নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছি সবাই। সবাই হয়তো পুরোনো বছরের সব দুঃখ কষ্ট বেদনা ভূলে যাবে। নতুন আশায় নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করবে। সবার মতো আমিও আগের বছরের সব ক্লান্তি-গ্লানি মুছে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু আমাকে ভাবিয়ে তুলছে বাড়ি ভাড়া। নতুন বছরের শুরুতে বাড়ি ভাড়া বাড়াতে চাইবে বাড়ির মালিকরা।
নতুন বছর বলে প্রথমে সবাই হয়ত টের পাবে না। কিন্তু এটা অনেক মানুষের সমস্যার সৃষ্টি করবে। আমাদের দেশে বিশেষ করে ঢাকায় যে হারে বাড়ি ভাড়া প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাতে বাড়ি বাড়া নিয়ে থাকা বেশ দুঃসহ হয়ে যাচ্ছে।

প্রতি বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষ আসতেই বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির আতঙ্কে থাকি। কলিংবেল বা দরজায় খট খট শব্দ শুনতে পেলেই ভাড়াটিয়ারা আঁতকে ওঠি, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির খড়্গ বোঁধহয় আবার ঘাড়ে পড়তে যাচ্ছে। এই বুঝি বাড়িওয়ালা এল, নোটিস দিয়ে যাবেন নতুন বছরের প্রথম মাস থেকে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে। বুঝে হলে থাকেন। নতুবা অন্য রাস্তা দেখেন। টু-লেট ঝোলাতে হবে। বাড়িওয়ালার এমন কথা শুনতে হবে। বছর শেষের এ মাসটিতে এমন আতঙ্কে কাটাতে হয়। এটা শুধু আমার একার কথা নয়। রাজধানীর প্রত্যেক এলাকার বিভিন্ন শ্রেণীর ভাড়াটিয়া সঙ্গে কথা বলেও এমনটি জানা গেছে।
অন্যদিকে, রাজধানীতে প্রতি বছর বাড়ি ভাড়া বাড়ছে। কিন্তু ভাড়াটিয়াদের আয় বাড়ছে না। তার পরও বছর শেষ হলেই বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ানোর অজুহাত খুঁজতে থাকেন। লাগামহীন ভাড়া বৃদ্ধিতে ভাড়াটিয়াদের নাভিশ্বাস উঠেছে।

ভাড়ার অর্থ যোগান দিতে না পেরে অনেকেই বাঁধ্য হচ্ছেন ছোট বাসায় থাকতে। অনেকে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে নিজে ভাড়ার টকা যোগাতে না পেরে সাবলেট হিসেবেও ভাড়া দিচ্ছেন। পরিণামে সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা।

বাড়ির সিন্ধুকে ঘুমিয়ে থাকে আইন:
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও এর বিন্দুমাত্র প্রয়োগ নেই। প্রয়োগ করার দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। যে কারণে প্রায় ২০ বছর ধরে এ আইনটি ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে; কিন্তু গোয়ালে নেই’ এমন অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আর এ সুযোগে বাড়িওয়ালারা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অজুহাত দেখিয়ে বছর বছর লম্ফঝম্ফ দিয়ে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করে যাচ্ছেন। আর এর মাশুল গুনতে হচ্ছে নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত সবার। এমনকি বস্তিবাসীরও। কারণ এখানেও একশ্রেণীর অসাধু লোক বাড়িওয়ালা সেজে বসে রয়েছে। বছর ঘুরতেই বাড়িওয়ালার মতো আচরণ করছে। বস্তিবাসীর ওপর নেমে আসছে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির খড়্গ।

ভাড়াটিয়াদের অসহায়ত্ব বেড়ে যাচ্ছে:
গতকাল সন্ধ্যায় শান্তিনগর এলকায় এক চায়ের দোকানে বসে আছি। এমন সময় এক ভদ্রলোক চায়ের দোকানিকে জিঙ্গেস করলেন,‘‘ ভাই, আশেপাশে বাড়ি ভাড়া পাওয়া কেমন।’’
তার এমন প্রশ্ন শুনে চায়ের দোকনি বলল,‘‘ আরে ভাই, বাসা ভাড়া নিবেন। কিন্তু ভাড়া বেশি গুনতে হবে। এ পাড়ায় বাসা ভাড়া বছরের শুরুতেই বৃদ্ধি পায়।’’

দোকানী আর ঐ ভদ্র লোকের কথা শুনে একটা চিন্তা করলাম ভদ্র লোকটার সাথে একটু কথা বলি। প্রথমে তার নাম জিঙেস করলে রোহেত বলে জানা যায়। তাকে জিঙ্গেস করলাম, ‘ভাই কি বাসা খুজছে? এ এলাকায় ভাড়া বাড়তেই থাকে।’ এমন কথা শুনে তার মনে কিছুই পরিবর্তন হলো না। আমি ভাবলাম হয়ত তার হাসার অভ্যাশ নেই। একটু পরেই সে বলল,‘‘ নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বাড়িওয়ালা তাকে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির নোটিস দিয়ে গেছেন। অতিরিক্ত ভাড়া তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় নতুন বছরের প্রথম মাসটিতেই অন্যত্র ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বাসা খোঁজাখুঁজি করছেন বিভিন্ন এলাকায়। বছরের শুরুতেই বাসা পরিবর্তনে আসবাবপত্র স্থানান্তর বাবদ তাকে অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হবে, যা তাকে অনেকটাই অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে ফেলতে হবে।’’
আরেকদিন নোমান সিদ্দিক নামে আরেক জনের সাথে কথা হচ্ছিল। বাড়ি ভাড়া নিয়ে কথা উঠতেই সে থেমে গেল। পরে তিনি জানালেন, তিনি যে মেসটিতে থাকেন তাতে আগে প্রতি মাসে সিট ভাড়া দিতে হতো আড়াই হাজার টাকা। বাড়ির মালিক সেই সিট ভাড়া নতুন বছরের জানুয়ারি মাস থেকে তিন হাজার টাকা করে দেওয়ার জন্য বলেছেন। এ নিয়ে তিনি বিপাকে রয়েছেন। কারণ নতুন বছরে তার আয় বাড়ছে না। বিমানবন্দর আশকোনা এলাকার ভাড়াটিয়া মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মাসিক বেতনের অর্ধেক টাকা বাড়ি ভাড়া বাবদ খরচ হয়। বাকি টাকা দিয়ে কোনো রকম মাস অতিবাহিত হয়। উনিশ থেকে বিশ হলেই ধারদেনা করতে হয়। এদিকে বাড়িওয়ালা এসে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে গেছেন।

শুধু কি এসব জায়গায় ভাড়ি ভাড়ার বাড়ার আতঙ্কে আছে বস্তিবাসীরাও। রেলস্টেশন সংলগ্ন বস্তির একজনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ভাড়া ভাড়া নিয়ে। তখন তিনি জানালেন, তার ১০-১০ ফুট বস্তিঘরের মাসিক ভাড়া এক হাজার থেকে বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা করা হয়েছে, যা নতুন বছরের প্রথম মাস থেকে কার্যকর হবে। ভাড়া দিতে হবে বস্তির সর্দারকে।

সিরাজ নামে একজনের সাথে কথা হচ্ছিল। সে বলল ‘‘নারে ভাই এবার হয়ত নতুন বছরে বাড়ি ভাড়া বাড়বে না। বাড়ির মালিকরা বুঝবেন। দৈনন্দিন খরচ যেভাবে বাড়ছে। সেভাবে তো আর বেতন বাড়ে না। সেহেতু বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে আমাদেরকে বাসা থেকে বের করে দিতে তাদের কষ্ট হবে।’’ [ পাঠক, এই কথাগুলো বলে লোকটা নিঃশাস ফেলল। তার মানে বুঝতে বাকি নেই যে, লোকটার মুখের কথাটা আর প্রত্যাশা। কিন্তু সে নিজেও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে হতাশায় ভুগছেন।]

সম্প্রতি পত্রিকায় একটি সংবাদ পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়েছিল রাজধানীর ৮৩ শতাংশ মানুষ ভাড়াটিয়া। এ কথাটা কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক জরিপে পাওয়া গেছে।
তাতে আরো হয়েছিল গত ২২ বছরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৩২৫ ভাগ। কিন্তু অস্বাভাবিক হারে ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার যেন কেউ নেই। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে না থাকায় আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

নতুন বাসায় উঠতে এবং নতুন বছরের শুরুতে ভাড়াটিয়াদের বাড়তি ভাড়া গুণতে হয়। বাড়িওয়ালারা ভাড়ার নির্দেশনা তো মানছেই না, উপরন্তু এ সংক্রান্ত একটি আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নেই।
প্রকাশিত রিপোর্টে প্রতি বছরের বাড়ি বাড়ার হার দেয়া ছিল এভাবে- জরিপ রিপোর্টের তথ্যমতে, ১৯৯০ সালে ভাড়া বেড়েছে ২৫.৭৯। ১৯৯১ সালে ২১.৭৫, ১৯৯২ সালে ১৩.৪৩, ১৯৯৩ সালে ১২.১৬, ১৯৯৪ সালে ১৬.৪৪, ১৯৯৫ সালে ২২.৬১, ১৯৯৬ সালে ১৭.৮৬, ১৯৯৭ সালে ১৫.০৩, ১৯৯৮ সালে ১৪.০৯, ১৯৯৯ সালে ১৮.২৪, ২০০০ সালে ১৫.০৮, ২০০১ সালে ১৭.০৪, ২০০২ সালে ১৩.৪৯, ২০০৩ সালে ৮.০৪, ২০০৪ সালে ৯.৯৬, ২০০৫ সালে ৭.৮৯, ২০০৬ সালে ১৪.১৪ এবং ২০০৭ সালে ২১.৪৮ ভাগ।

জরিপে আরও দেখানো হয়, ১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ১১৬.৯৬ ভাগ। এই সময়ে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, অর্থাৎ ২৫৯.৪৫ ভাগ। ২০০৮ সালে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে দ্রব্যমূল্য।

ঢাকায় বর্তমানে দেড় কোটি মানুষ বাস করছে। এরমধ্যে ১ কোটি ২৬ লাখ ভাড়াটিয়া আর মাত্র ২৪ লাখ মানুষের নিজের বাড়ি আছে। ভাড়াটিয়ারা আয়ের ৬০ ভাগ ব্যয় করেন বাড়ি ভাড়ায়। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিন রাত পার করছে রাজধানীবাসি। অফিসে গিয়েও অনেকে ভাবছেন বাড়ি ভাড়া নিয়ে। আর যাই হোক ভাড়া বাড়িতে তো থাকতে হবে। কিন্তু বাড়ি ভাড়া যে বাড়বে। কিন্তু বছরের শুরুতে তো আর বেতন বাড়বে না। বাড়ি ভাড়া দিতে গিয়েই যেন পকেট খালি হয়ে যাবে। এমন আতঙ্কে ঢাকাবাসী দিন পার করছে।