ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

সড়ক মহাসড়কে গাড়ির ভুল ওভারটেকিং দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এছাড়াও গাড়ির অতিরিক্ত গতি ও চালকের অসাবাধনতাসহ বেশ কিছু কারণে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ সড়ক দুর্ঘটনা যেন মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে। চালকদের ওভারটেকিং প্রতিযোগিতার কারণে সড়কে বিশৃ´খলা ও দুর্ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। ভিআইপি সড়কগুলোতে লেইন পদ্ধতি চালু করা হলেও প্রায় চালকই নিয়ম ভঙ্গ করে চলছেন। মামলা, জরিমানা, গ্রেফতারের মতো শাস্তি দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে পারছে না সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগ। আজও লেইনবিহীন সড়কে যানজটের কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। চেকিং পয়েন্ট পর্যন্ত চালকরা নিয়মের মধ্যে থাকলেও মাঝ রাস্তায় এসে আগের অবস্থায় ফিরে যায়। লেন বাদ দিয়ে চালদকদের মধ্যে শুরু হয় ওভারটেকিং প্রতিযোগিতা। এ কারণে কোন্ লেইন কোন্ যানবাহনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা শনাক্ত করার উপায় থাকে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার নেপথ্যে প্রায় ৩০টি কারণ শনাক্ত করেছে। তাদের অনুসন্ধান মতে, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলো হলো- ভুল ওভারটেকিং, যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত গতি, গতিসীমা না মেনে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, চালকের ক্লান্তি অবসাদ, বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির গতি সম্পর্কে না জানা ও কাছাকাছি ২টি গাড়ি চলা, চালকদের ভুল সঙ্কেত, ভুলভাবে মোড় নেয়া, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, অনভিজ্ঞ চালক (চালকের পরিবর্তে হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো), পথচারির কার্যক্রম, খারাপ, বেহাল রাস্তা, অতিরিক্ত যান চলাচল, সড়কের জ্যামিতিক ত্রুটি, আবহাওয়া (কুয়াশাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ), গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি, বিপজ্জনক বোঝাই (পণ্য ও মানুষ), টায়ার বার্স্ট বা চাকা ফেটে যাওয়া, পশুর কার্যক্রম, রাস্তার ওপর পিচ্ছিল কিছু রাখা বা পড়ে থাকা, মাত্রাতিরিক্ত গতিরোধক (স্পিড ব্রেকার), দুর্বল ব্রিজ কালভার্ট, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের জন্য বাস ও ট্রাকের বাড়তি বডি, বাস ট্রাকের অননুমোদিত নকশা, রাস্তায় ফলের আবর্জনা ফেলে রাখা, রাস্তার ওপর বাজার বসানো, রাস্তার ওপর রিকশা বা টেম্পোর স্ট্যান্ড ইত্যাদি।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন মানিকগঞ্জের ঘিওরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তারেক মাসুদ, মিশুক মুনিরদের বহনকারী গাড়িটি দুর্ঘটনায় পড়ার নেপথ্যে প্রাথমিকভাবে প্রধান ৩টি কারণ শনাক্ত করা হয়। বাসের চালক বেপরোয়া গতিতে মোড় অতিক্রম করায় এবং দ্রুত গতিতে মাইক্রোবাসটি অন্যগাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এআরআইর ডাটাবেইস স্পেশালিস্ট কিউ এ এস এম জাকারিয়া ইসলাম জানান, সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে ৮টি কারণেই দুর্ঘটন বেশি হয়। এরমধ্যে রয়েছে ভুল ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, পথচারি ও পশুর কার্যক্রম, বিপজ্জনক বোঝাই ও রাস্তার জ্যামিতিক ত্রুটি।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে যে কারণগুলোর উল্লেখ থাকে, সেগুলো হলো ওভারটেক করার প্রবণতা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া, মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, যানবাহনের ত্রুটি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, অদক্ষ চালক, ট্রাফিক আইন মানা, চালকের মাদক গ্রহণ, অনুপযুক্ত গাড়ি, বিভিন্ন গতিসম্পন্ন পরিবহন একসঙ্গে চলা, রাস্তা ব্যবহারের নিয়ম না জানা, চালকের বদলে সহকারীকে (হেলপার) দিয়ে গাড়ি চালানো ইত্যাদি।

৩১ ডিসেম্বর সাংবাদিক নিখিল ভদ্র জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে যে স্পটটিতে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি মুহূর্তেই নিভে যাচ্ছে মানুষের জীবনপ্রদীপ। সাংবাদিক নিখিল ভদ্রের মতো পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে।

দেশে অবৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই দাবড়ে বেড়াচ্ছে এক লাখের বেশি অবৈধ চালক। সব মিলিয়ে দেশে অবৈধ পরিবহন চালকের সংখ্যা ৬১ ভাগ। সূত্রে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় শতকরা ৮৩ ভাগ আসামি থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে ন্যায়বিচার পায় না আহত-নিহতের পরিবারগুলো। দুর্ঘটনার ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে থানা থেকে গাড়ি পাঠাতে হবে মালিকের জিম্মায়। তাছাড়া মোটরযান অধ্যাদেশ আইনে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চার মাস কারাদ- ও ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ১২ হাজারের বেশি মানুষ। মোট পরিবহনের মধ্যে ৬১ ভাগ চালক অবৈধ। এ কারণে ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে মৃত্যু হচ্ছে ৬০ জনের।

রাজধানী ঢাকায় সড়কে ওভারটেকিং এর দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে ৫১টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরানা পল্টন, জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বর, বিজয় সরণি, দৈনিকবাংলা, নটরডেম কলেজ, কাকরাইল, শনিরআখড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, সোনারগাঁও, সায়েদাবাদ, শেরাটন, জিপিও মোড়, জসিম উদ্দিন রোড ক্রসিং, মালিবাগ, মৌচাক, বাংলামোটর, শান্তিনগর, বাসাবো, রামপুরা, গুলশান-১ ও ২ নম্বর গোল চত্বর, বাড্ডা, নতুন বাজার, আসাদগেট, গাবতলী, টেকনিক্যাল মোড়, মিরপুর-১ ও ১০ নম্বর গোল চত্বর, মহাখালী রেলগেট, মহাখালী বাস টার্মিনাল, নাবিস্কো, সাত রাস্তা, এফডিসি মোড়সহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট। এ ছাড়া ঢাকার ২০০ ইন্টারসেকশনের মধ্যে ৯ ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশেই রাজধানীর শতকরা ৫২ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বাস্তবতা হলো ঢাকাসহ দেশের সকল দুর্ঘটনা স্পটগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এআরআই বিভাগের গবেষণা মতে, সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার স্পট ২০৯টি। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার স্পটের মধ্যে রয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে ৩৮টি, ঢাকা-সিলেট
হাইওয়েতে ৩৫, ঢাকা ময়মনসিংহ হাইওয়েতে ১০টি, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও জামালপুর হাইওয়েতে ১৪টি, ঢাকা-আরিচা হাইওয়েতে ২২টি, নগরবাড়ি-বাংলাবন্ধ হাইওয়েতে ৩৮টি, নগরবাড়ি-রাজশাহী হাইওয়ে ২৪টি, দৌলতদিয়া-ঝিনাইদহ-খুলনা হাইওয়েতে ১৬টি স্পট, ঢাকা-মাওয়া বরিশাল হাইওয়ে ৪, যমুনা ব্রিজ হাইওয়েতে ৮।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইআরআই) সম্প্রতি এক গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশ করলেও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মৃত্যুদূত ঠায় দাঁড়িয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রতিদিন। ঢাকায় সাংবাদিক দীনেশ দাসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রোববার অন্তত ১২ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।

মোটরযান সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বক্তব্য, বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আগামী ১০ বছরের মধ্যে দুর্ঘটনার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান হবে প্রথম। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এখন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে। মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর উদ্যোগের অভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি সড়ক, মহাসড়কে নির্মাণজনিত ত্রুটি, ওভারটেকিং, ওভারলোডিং, অদক্ষ চালকসহ দুর্ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে নানা কারণ। তাছাড়া দুর্ঘটনার জন্য চালক দায়ী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কোন ব্যবস্থা নেই। অপরাধও জামিনযোগ্য! এই বাস্তবতায় দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই।

কামাল শাহরিয়ার
সহ-সম্পাদক
দৈনিক ভোরের ডাক