ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

“এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা/গগন ভরিয়া এসেছে ভুবন ভরসা/ দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা/গীতময় তরুলতিকা।”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙতিমালা কোন প্রেমাতুর মন জীবনে উচ্চারণ করেনি তেমনটি সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবেনা । কবিতামাতৃক বাংলাদেশে ঋতুবৈচিত্রে জনমানুষের জীবন সঙ্গত কারণে প্রভাবিত । এই প্রভাব সব শ্রেণি পেশার মানুষের উপরই লক্ষ্যনীয় । কবি এবং কবিতাও তাই ষড়ঋতুর সোন্দর্য, রূপমা যেমন উপেক্ষা করতে পারে না তেমনি এসব জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে এখানকার জনগোষ্ঠীর জীবনাচারে বা জীবনবোধে দুঃখ-বেদনামাখা ঘটনাসমূহকেও এড়িয়ে যেতে পারে না । ছয়ঋতুর বাংলাদেশে কম-বেশি সবগুলোর সরব উপস্থিতি দেখা গেলেও বোধহয়  বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সমৃদ্ধধারা কবিতায় বর্ষার প্রভাব একটু বেশিই।

বর্ষা বহুরূপী। বর্ষা যেমন প্রেমের উপমায় ব্যবহার করা যায়, তেমনই বিরহের উপমায়ও খাপ খায় যথাযথ ।

মহাদেব সাহার  “কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে রেখেছে আকাশে। / সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি, এই ভরা বর্ষা…” অথবা  রুদ্র গোস্বামীর “বৃষ্টি বৃষ্টি/ জলেদের চাঁদনি/দে সোনা এনে দে/মন সুখ রোশনি”;  বর্ষাকে জীবনে সুখের আগমন এবং সুখের বিদায় দুইভাবেই দেখানো যায়, ঠিক একইভাবে দুঃখের আগমন ও বিদায়রূপেও দেখানো যায় ।

‘আষাঢ়ের রাত্রে’ আল মাহমুদ ব্যক্ত করেছেন, “শুধু দিগন্ত বিস্তৃত বৃষ্টি ঝরে যায়, শেওলা পিছল/আমাদের গরিয়ান গ্রহটির গায়।“

মেঘ-বৃষ্টিকে ভয় এবং মেঘ-মুক্ততাকে সাহস, ঝড়কে দ্রোহ এবং ধ্বংসের উভয় উপমায় ব্যবহার করা যায় অন্যকোন প্রাকৃতিক ঘটনাকে বোধহয় এতোরূপে উপস্থাপন করা যায় না বিধায় কবিতায়ও মেঘ-বৃষ্টি-ঝড় এর আধিক্য ।

ইন্দ্র পতনে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, “তখনো অস্ত যায়নি সূর্য, সহসা হইল শুরু / অম্বরে ঘন ডম্বরু-ধ্বনি গুরুগুরু গুরুগুরু! / আকাশে আকাশে বাজিছে এ কোন ইন্দ্রের আগমনী? / শুনি, অম্বুদ-কম্বু-নিনাদে ঘন বৃত্তহিত-ধ্বনি।/ বাজে চিক্কুর-হ্রেষা-হর্ষণ মেঘ-মন্দুরা-মাঝে,/সাজিল প্রথম আসাঢ় আজিকে প্রলয়ঙ্কর সাজে।” 

পল্লী বর্ষায় জসীম উদ্দিন লিখেছেন,  “আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে, / কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।/
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,/ ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়! ”

বাংলা কবিতায় বর্ষার প্রভাব কেন একটু বেশি- এই বিষয়টির কারন অনুসন্ধানের চেষ্টা বেশ কঠিন। তবুও একটু সহজ-সরল এবং অগভীরভাবে ভেবে দেখা যেতে পারে।

আমরা জানি- ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য। পদ্য হল সাহিত্যিক ধারার একটি রূপ আর কবিতাই হলো পদ্যের মূলত মূখ্য রূপ । জীবনের সাথে সম্পর্কিত সব ধরনের কর্মকাণ্ড, বোধ, চিন্তা-চেতনা, রূপকতা কবিতার মাধ্যমে কবিরা তুলে ধরেন পাঠকদের সামনে। জীবনের উপর বেশি প্রভাব বিস্তারকারী ঋতুটি কবিতায়ও তাই বেশি প্রভাব বিস্তার করে আসছে।

প্রশ্ন উঠে গেলো তাহলে বর্ষাই কি আমাদের জীবনে বেশি প্রভাব ফেলছে?  হ্যাঁ, অন্যসব প্রাকৃতিক আচরণের চেয়ে বর্ষাই আমাদের মন ও জীবনযাত্রার উপর সেই আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বহুমাত্রিকরূপে প্রভাব ফেলে আসছে ।

বাংলা সাহিত্যের যুগ বিন্যাস আমাদের জানা আছে- প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ । প্রায় সব যুগের সাহিত্যকর্মে বর্ষার উপস্থিতি দেখা যায়। চর্যাপদে সরাসরি বর্ষা ঋতুর উল্লেখ নেই সত্য তবে বর্ষাকালে মানুষের জীবনচিত্রের আঁচ পাওয়া যায়। চর্যায় নদী ও নৌকা-সংক্রান্ত রূপকের সংখ্যাধিক্য, গুণ টানা, দাঁড় টানা, পাল তোলা, উজান বাওয়া প্রভৃতি বারবার চর্যায় উল্লিখিত হয়েছে- যার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে বর্ষাকালে ভর যৌবনা নদী ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি রূপ পাওয়া যায় । ৩৮তম পদে দেখা যায়- “কাঅ ণাবডহি খান্টি মন কেডুয়াল। /সদগুরুবঅণে ধর পতবাল।” অর্থাৎ কায় [হইল] ছোট নৌকাখানি, মন [হইল] কেরোয়াল। সদ্গুরু-বচনে পতবাল (পাল) ধর।(অনুবাদ: সুকুমার সেন)।

এবার মধ্যযুগের কবিতায় বর্ষার রূপমা-উপমা কেমন তা একটু দেখা যাক । মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন- আনুমানিক চৌদ্দ শতকের শেষার্ধে বা পনের শতকের প্রথমার্ধে বড়ু চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি অবলম্বনে এ কাব্য রচনা করেন।  এখানে বর্ষাকালের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় । যেমন- “আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে মেঘ/ বরিষে যেহ্ন/ ঝর এ নয়নের পানী।/আলবড়ায়ি/সঙপুটে প্রণাম করি দুইলোঁ সখিজনে/কেহো নান্দ কাহ বনঞিকে আনী।”

এটি বর্ষা বিরহের পদাবলির অন্যতম নজির । মেঘ-বর্ষা নিয়ে মহাকবি কালিদাস রচনা করেছেন বিখ্যাত মহাকাব্য ‘মেঘদূত’। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ‘কালকেতু উপাখ্যান’-এ ফুলরার বার মাসের দুঃখ বর্ণনায় বর্ষাকালের বিবরণে জানাচ্ছেন,“আষাঢ়ে পুরিল মহী নেবেমেঘে জল।/বড় বড় গৃহস্থের টুটয়ে সম্বর।”

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য মনসামঙ্গল বা পদ্মাপু্রাণ। বর্ষার প্রকোপে এ সময় সাপের বিচরণ বেড়ে যায়, তাই সাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভক্তকূল দেবীর আশ্রয় প্রার্থনা করে।

এছাড়া মধ্যযুগের অমূল্য সাহিত্য  ময়মনসিংহ গীতিকা । এখানেও বর্ষা ঋতুর উপস্থিতি দেখা যায় । যেমন দেওয়ানা মদিনা পালায় আছে, “আইল আষাঢ় মাস লইয়া মেঘের রাণী।/নদী নালা বাইয়া আইসে আষাঢ়িয়া পানি ৷/শকুনা নদীতে ঢেউয়ে তালেপার করে।/বাণিজ্য করিতে সাধু যত যাহে দেশান্তরে ৷”

আধুনিক যুগের কবিদের কবিতায় ঋতুবৈচিত্র্য ফুটে ইঠেছে কম-বেশি সবগুলোরই তবে বর্ষা এবং বসন্ত বিশেষ স্থান করে নিয়েছে ।এইসময়ে মহিরুহ বৃক্ষের ন্যায় বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । রবীন্দ্রনাথ বর্ষা ঋতুকে নিয়ে প্রচুর কবিতা, গল্প, গান লিখেছেন। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কখনো কখনো আবার বর্ষার কবিও বলা হয়ে থাকে ।

রবীন্দ্রনাথের বহু জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নববর্ষ, সোনার তরী, আষাঢ় সন্ধ্যা, আষাঢ়, ‘বর্ষামঙ্গল প্রভৃতি’ । বর্ষার দিনে কবিতায় তিনি । ‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন,“এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়,/এমন মেঘস্বর বাদল-ঝরঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়…।”

নজরুল, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীন, ফররুখ থেকে শুরু করে সমসাময়িক প্রায় সব প্রথিতযশা কবিদের কবিতায় বর্ষা স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে । সুফিয়া কামাল, রফিক আজাদ, আহমদ রফিক, অমিয়সহ ওপার বাংলার বাঙালি কবি কেউই বর্ষার বন্দনা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। পাওয়া যাবে না এমন একজন কবি যে তার কবিদশায় বর্ষা নিয়ে একটি পয়ার লেখেননি, বর্ষাকে উপমা করে লেখেননি একটি ছত্র। এসব কবিতার দুই চরণ দিলেও কয়েক হাজার পৃষ্ঠা হবে বৃষ্টির পদাবলি পূর্ণ ।

সুতরাং পরিশেষে আমরা বলতে পারি- মানুষের সহজাত জীবনাচার এবং জীবনবোধের উপর বর্ষার অসম্ভবরকম প্রভাবের কারণে বাংলা কবিতায় কবিতায় বর্ষার বহুরূপী প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । পাঠক মনে, কবিমনে এভাবে সম্বনিতভাবে সকল মানুষের সুখ-দুখ, প্রেম-বিরহ, ভালোথাকা-মন্দথাকা বর্ষার পঙতিমালায় সাজানো আছে; থাকবে বাংলা সহিত্যে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এবং আরও সমৃদ্ধ হবে কবিতাকুঞ্জ বাংলার বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকাননে ।

মন্তব্য ০ পঠিত