ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

“শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি 

আকাশে বাতাসে ওঠে রণী
বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ। ”- গৌরী প্রসন্ন মজুমদার

শুরুতেই বলতে হয়- একুশ-ছাব্বিশ-ষোল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ এবং ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর এই তিনটি তারিখ খচিত আমার অস্তিত্ব । বায়ান্নো এবং একাত্তর এই দুটো চেতনা নিয়েই একজন বাঙালি কবির সত্ত্বা। শুধু কবিগণ নয় – পুরো বাঙালি জাতির অভ্যুদয় এই দুটি সালের সেতুবন্ধন থেকে উৎসারিত । একাত্তরে বিজয় অর্জিত বাঙালি জাতির কবিতা কাহনে, লাল-সবুজের পতাকার দেশে কবিতা নিয়ে আলোচনা শুরু করলে দেশত্ববোধক কবিতার কথা প্রথমে আসে । কবিতামাতৃক বাংলাদেশে দেশের কবিতা নানা আঙিকে চিত্রিত হয় কবির কলমের আঁচড়ে । যারা লেখালেখি করেন তারা বাংলার রূপ সৌন্দর্য, ঋতু বৈচিত্র যেমন এড়াতে পারেন না কোনভাবেই,  তেমনি একটি মহান চরিত্রকে উপেক্ষা করতে পারেন না কোনমতেই । আর সে চরিত্রটি হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।

‘লাল সবুজের পতাকায়-মুজিব তোমায় দেখা যা’ শুধু রাজনৈতিক স্লোগানই নয়, বাস্তবতা প্রতিচ্ছবি। এজন্যই বিভিন্ন প্রেক্ষিতে, বিভিন্ন উপলক্ষে, বিভিন্ন দিবসে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন কবিদের লেখনিতে অন্যতম প্রধান চরিত্র ।

“বিশ্বকবি সোনার বাংলা
নজরুলের বাংলাদেশ,
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা
রূপের যে-তার নেইকো শেষ।”

দেশাত্ববোধক কবিতার কথাই তাই প্রথমে বলি। দেশাত্ববোধক কবিতা, গান সবসময়ই বাঙালিদের প্রাণের খোরাক । আমার প্রিয় দেশমাতার সমান কোনো ব্যক্তিত্ব যদি কল্পনা করতে হয় কবিতার প্রয়োজনে, তবে তিনি একমাত্রই বঙ্গবন্ধু।

কবি মাত্রই দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেম তার মনকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। দেশের সমসাময়িক বিষয়াবলী ধনাত্মক এবং ঋনাত্মক উভয়ভাবেই ফুটে ওঠে দেশের কবিতায়। মজার ব্যাপার- দুই ধরনের কবিতায় কবির অন্তরকুঞ্জে বাস করেন জাতির জনকের চেতনার, তার দ্রোহের কণ্ঠস্বরের পাখিরা। প্রায় সব কবির দেশের কবিতায় তাই অপ্রতিদ্বন্ধী একক চরিত্র বঙ্গবন্ধু।

দেশের সাথে জড়িত সব ঘটনায় বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিকভাবে জড়িত। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের কবিতায় তিনি উজ্জ্বলতম চরিত্র । ১৯৬৩ সালের ২৮ অগাস্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সেই ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ মহাকাব্যের পর আরো একটি মহাকাব্য রচিত হয় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সে ।

নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন–
“অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

দেশের কবিতা, দেশপ্রেমের কবিতা – এসব ক্ষেত্রে সব কবির কবিতায় তিনি অপ্রতিদ্বন্ধী চরিত্র । এ দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে জাতির জনক বলেছিলেন- “এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্যে মুজিব সর্ব প্রথম তার প্রাণ দেবে।”

স্বাধীনতার কবিতার কথা বলি এবার। স্বাধীনতা হীনতায় কেউ থাকতে চায় না, বাঁচতে চায় না । যুগে যুগে শুধু স্বাধীনতার জন্যই পৃথিবীর বুকে লড়াই হয়েছে, হচ্ছে। আমরাও করেছি ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস । বাঙালি জাতি যখন নির্যাতন নিপীড়নে ক্লান্ত তখন আশার আলোকবাতি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু । ইতিহাস জানা আছে সবার । আমি আলোচনাকে সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছি তাই ।

কবিদের স্বাধীনতার কবিতা, মুক্তির কবিতা লেখার প্রেরণার ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু। কবিদের স্বাধীনতার কবিতা একাত্তর থেকে পাওয়া, এর প্রেক্ষিতে ধন্য সেই পুরুষ কবিতায় কবি শামসুর রাহমান বলেছেন-
“ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো
দুলতে থাকে স্বাধীনতা,
ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে
মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।“

এক একটি দ্রোহের কবিতা ছিলো বঙ্গবন্ধুর সব ভাষণ । তখন থেকে বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত দ্রোহের কবিতায় বঙ্গবন্ধু সবার মন জয় করেছেন তার আপোষহীন নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে । অধিকারহারা মানুষের জন্য লেখা দ্রোহের কবিতা তিনি ভালোবাসতেন এটি নিশ্চিত করে বলা যায় কেননা জাতীয় কবি নির্বাচনের জন্য তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকেই বেছে নিয়েছেন- যিনি লেখাতে ছিলেন বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে – কাজে তিনি বিদ্রোহী কবি। এটি অবশ্যই একটি উত্তম প্রমাণক ।

প্রসঙ্গত, দ্রোহের কবিতা লেখেননি এমন কবি সাহিত্যজগতে বিরল । দ্রোহের কবিতায় দেশ, জাতি, সমাজ, বিশ্বের বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরা হয় ফলে এ ধরণের কবিতা লিখতে সাহসের প্রয়োজন বটে । আর বিভিন্ন প্রভাবক এই সাহস যোগায় ।

‘বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সাহসী নেতা’–  ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের এই উক্তির প্রেক্ষিতে বলা যায় বঙ্গবন্ধু দ্রোহের কবিতার ক্ষেত্রে উত্তম প্রভাবক। যিনি মাথা নত না করার শিক্ষাটি বাঙালি জাতিকে দিয়েছেন । সেখানে থেকে কবিরা  ‘উন্নত মম শির’ নতুন করে পেয়েছে।

‘কবিতামাতৃক বাংলাদেশ’ কাব্যগ্রন্থে  ‘বাঙালির শপথ’ কবিতায় আমি লিখেছি –

“ভয় দিওনা, ভয় পাইনা – এদেশ আমার
স্বাধীনতা, পতাকা রক্ষায় – মোরা দুনির্বার ।”

বঙ্গবন্ধু সব সময় সাধারণ মানুষের বিজয় চেয়েছেন । মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে মুক্তির বাণী শুনিয়েছিলেন । তিনি বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বলে পরিচিত যে ছয় দফা কর্মসূচি দিয়েছেন, সেখানেও রয়েছে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা। সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধনই ছিলো তার ধ্যান । তার সুরেই  ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ কবিতায় কামাল চৌধুরী বলেছেন –

“টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামগুলো
তোমার সাহস নেবে।
নেবে ফের বিপ্লবের দুরন্ত প্রেরণা।“

শোকের কবিতা, বিষাদের কবিতা সাহিত্যের একটি বড় অংশ। আমাদের বাংলা সাহিত্যে বহু শোকের কবিতা আছে । তবে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সবচেয়ে মার্মান্তিক শোক কাব্যের জন্ম হয়েছে এদেশে । এদিন বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল দেশদ্রোহীরা। সেই থেকে বছর ঘুরে অগাস্ট মাস এলেই বাংলাদেশের মানব হৃদয়ে শোকের বোবাকান্নার অশ্রুধারা বেগবান হয়। মহাদেব সাহার ভাষায়-
“চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি।”

এ শোকে মূহ্যমান হয়ে অগ্রজ, অনুজ অথবা প্রবীণ,নবীন সব কবিই কবিতা বা গান রচনা করেছেন । আমি দুজন কবির অনুভূতি তুলে ধরছি ।

সুফিয়া কামাল লিখেছেন-

“নিত্যই দেখি এখানে – সেখানে মৃতদেহ আছে পড়ে;
তোমার শোণিতে রাঙানো এ- মাটি কাঁদিতেছে নিরবধি
তাইতো তোমারে ডাকে বাংলার কানন, গিরি ও নদী।”

১৫ অগাস্ট কবিতায় সৈয়দ শামসুল হকের  কয়েকটি পঙতি-
“তোমার শোকে আজও কাঁদছে সারা বাঙালি
অদ্যাবধি দেশের মানুষ তোমার কাঙালি।
হে মহানায়ক তোমাকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি
অঙ্গ জুড়ে মাখি তোমার অমূল্য পদধূলি।”

মানবাধিকার, শ্রমিক অধিকারসহ আম জনতার বিভিন্ন অধিকার নিয়ে বঙ্গবন্ধু সব সময় সক্রিয় ছিলেন। এজন্য তাকে জেলে যেতে হয়েছে বারবার। এসব ঘটনা কতো কবিতার জন্মদাত্রী। তিনি তাই বলেছিলেন, “আমি সব ত্যাগ করতে পারি, তোমাদের ভালোবাসা আমি ত্যাগ করতে পারিনা।”

মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসার জাগরণ সৃষ্টি করা নিশ্চিত কবির দায়বদ্ধতা । এ দায়বদ্ধতা কবিদের মধ্যে প্রবাহিত করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান । শোষণ-নিপীড়ণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন– “বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত – শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।”

বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে তিনি বলেছিলেন – লাখ শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা এই সংবিধান । সেই রক্তের ঋণ শোধ করতেও লিখতে হবে বাঙালির অধিকার আদায়ের কবিতা ।

‘হে বাঙালি যিশু’ কবিতায় মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন –

“শিশু তুমি যিশু তুমি, তুমি পিতা, বাঙালির জাতিপিতা,
মানবধর্মের শিখা, আদিহীন অন্তহীন ভবিষ্য অবধি।
বাঙালি তোমাকে চায়, তুমি চাও বাঙালির ভালো:
বাঙালি মানুষ হয় বুকে যদি মুজিবের আলো। ”

স্বনির্ভর জাতি গঠনে তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। “ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে এনে দেশকে গড়া যাবে না। দেশের মধ্যেই পয়সা করতে হবে” -এ উক্তি তার উজ্জ্বল প্রমাণ ।

উত্তর আধুনিক কবিতার যুগে সব কিছু নিয়েই কবিতা হয় । অর্থনীতি হালের একটি জনপ্রিয় শাখা কবিতার। এক্ষেত্রেও তার নির্দেশনা আছে, “এই স্বাধীনতা তখনি আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলার কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।”

‘পিতাকেই মনে পড়ে’ কবিতায় আসলাম সানী বলেছেন –
“অন্যায়কারি পিতার কাছে
হার মেনেছে হার
সারা জীবন শোষনের বিপক্ষে
জয় হয়েছে তার।”

সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কবিতায় বঙ্গবন্ধু তাই সব কবির প্রেরণার জায়গা কবিতায় ।

“মাটির মানুষ শেখ মুজিবুর
কোথায় তুমি নেই
তোমার ছবি টাঙানো আছে
দেশজুড়ে সবখানেই।“ – (তোমার ছবি- রহীম শাহ)

পরিশেষে, শ্রদ্ধেয় আহমদ ছফার ভাষায় বলতে হয়, “দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রুপোলি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি ও নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তার ভালোবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।“

বাংলা সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু একটি মহকাব্যের নাম।  বাংলাদেশের অমর স্বাধীনতা মহাকাব্যের মহাকবি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তরুণ কবিদের কাছে আজীবন প্রেরণার জায়গা, চলার সথে চেতনার সঙ্গী অবিরাম । যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন তিনিও কবিতায় বেঁচে থাকবেন  দেদীপ্যমান হয়ে নবীন-প্রবীণ সব কবির কবিতায়।

শেষ করতে হয় অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায়-
“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।”

মন্তব্য ০ পঠিত