ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

সবে মাত্র ঘুমাতে যাবো, দরজায় প্রচন্ড কড়াঘাত,হতচকিত হয়ে দরজা খুলেই অবাক, স্যার আমি ফরে এসেছি,আমাকে আসতে হয়েছে,কথা ছিলো, মাঝরাতে আর আসবো না, কিন্তু আমাকে যে আসতে হলো।আমি ভ্যাবাচেখা খেয়ে গেলাম, ভীমরতি খাওয়ার মতো অবস্থা, মাঝরাতে দরজার সামনে যে দন্ডায়মান হয়ে আছে, জ্বলজ্যান্ত সাক্ষাত মানুষ,গা ছম-ছম করা গম-গম শব্দে শব্দ শুনে আরো ভরকে গেলাম, এও কি সম্ভব, নাম জিজ্ঞেস করায় বলতে লাগলো আমি মিসির আলী স্যার, হুমায়ূন স্যারের মিসির আলী।মনে নেই গত একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে মাঝরাতে হলুদ হিমুকে নিয়ে আরো একবার এসেছিলাম,বলেছিলাম আর আসবোনা, কিন্তু পারলামনা, আমাকে আবার আসতে হলো।কারণ আমার স্যার হুমায়ূন আজ বড় অসুস্থ্য, শংকা মুক্ত নন। সুদূঢ় আমেরিকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, আমার স্যার বড় কষ্টে আছেন।এই কথা শুনে আমার নিজের কানকে যেন বিশ্বাস হচ্ছিলো না।ভাবলাম এতো রাতে কে না কে এসেছে, উঠকো ঝামেলা, বিদায় করে দিতে উদ্যত হতেই মিসির আলী একেবারে কানের কাছে এসে বললো স্যার আমাকে চিনতে পারেননি, সেদিন একুশের রাতে আমিই তো আপনাকে এভাবে এসে জাগিয়ে তুলেছিলাম, মনের দুঃখের কথা বলেছিলাম।

এইবার আস্তে-আস্তে কিছুটা মনে পড়তে লাগলো, তাইতো মিসির আলীইতো, হ্যা হ্যা, তুমিইতো সেই রাতে এসেছিলে, বলো আজ আবার কি হলো, কেন এতো হন্ত-দন্ত হয়ে তোমার এই আগমণ, কি হয়েছে তোমার স্যারের, সে কেবল তোমার স্যার নয়, সে তো আপামর বাঙ্গালীর প্রাণের মানুষ-প্রিয় হুমায়ূন আহমদ।

মিসির এই বার কেঁদেই ফেললো, কেঁদে একাকার হয়ে গেলো, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে উঠা-নামা করতে লাগলো, বললো স্যার সংবাদ পত্রের পাতা দেখেছেন, হুমায়ূন স্যার কেমন কাহিল হয়ে গেছেন, উনার শরীরে এক প্রকার ভাইরাস ধরা পড়েছে, যা সনাক্ত করা যাচ্ছেনা, ফলে চিকিৎসকরা হুমায়ূন স্যারের সঠিক চিকিৎসা করতে পারছেননা।এই বলে মিসির আলী আবারও ঢুকরে কেধে উঠলো।

একটু পরে বড় আক্ষেপ করে বলে উঠলো, হুমায়ূন স্যারের মতো এমন জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি কি বারে বারে আসবে নাকি? সরকার এতো দেদারছে দলীয় লোকদের লুট-পাট করে দিতেছে, অথচ একজন হুমায়ূন আহমদের মতো বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ এক সন্তানের জন্য যেন দায়ছাড়া গোছের দেখ-ভাল করেই ক্ষান্ত দিয়েছে, বিদেশ-বিভূইয়ে আমার স্যার কতো কষ্টে আছেন, উনি কি দেশ ছেড়ে থাকার লোক? চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় স্যার দেশে আসলেন, নিজের একটু সময় আলাদা ও অন্যরকমভাবে নিজের নূহাশ পল্লীতে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য, যাতে নতুনের সাথে পুরনোর সৃষ্টি সুখের উল্লাসের সাযুজ্য ও মূল্য খুজতে কিংবা কিছুটা একান্ত নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাঠাতেই আসা, অথচ লেখকের স্বাধীনতায় অযথা হস্তক্ষেপ করে স্যারকে কি পরিমাণ এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখী করে তোলা হয়েছিলো, একজন হুমায়ূন আহমদ বলেই স্যার নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দগ্ধ হয়েই ফের চিকিৎসা নিতেই তাই যেতে হয়েছিলো, এ যে কতো কষ্টের ও অপমানের ছিলো, তা একটি বারের জন্যেও কিন্ত কেউ ভাবলেন না, যেন সবাই ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন মোক্ষম একটা হাতিয়ার পেয়ে গেছেন, যেনতেন ভাবে পত্রিকার কাটতি বাড়াতেই ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন।আফসোস আমাদের মানবিক বিবেচনা বোধ দেখে।

আজ হুমায়ূন স্যার বড় যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন, জানিনা স্যার-এর শেষ পর্যন্ত কি হয়।আপনার কাছে তো প্রায় আসি, সুখ-দুঃখের কথা বলে থাকি, আমার যদি অবস্থা থাকতো স্যারের কাছে চলে যেতাম, আমাকে দেখে স্যার নিশ্চয়ই খুশী হতেন,আমার কথা শুনলে স্যার ভীষণ খুশী হবেনই, ভালোও হয়ে যেতে পারেন।

আমি চাই স্যার ভালো হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসুন, আবার আমাকে নিয়ে গল্প লিখুন,নাটক লিখুন।একজন হুমায়ূন আহমদ, বিশ্ব সভায় যিনি বাঙ্গালীর প্রাণের হ্রদয়ের মানুষ, তিনি এই ভাবে হুট করে চলে যেতে পারেননা। শত-সহস্র বাংলাদেশীর লক্ষ-কোটি প্রাণের মিলিত প্রার্থনা আজ একাকার হয়ে বলছে, মিসির আলী,হলুদ হিমু, বাকের ভাই সবাই বলছে, প্রিয় হুমায়ূন আহমদ—তোমাকে যে আবার ফিরে আসতে হবে আমাদের প্রাণের মাঝে, লিখতে হবে আমাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে, মিসির আলী আর হলুদ হিমু কে নিয়ে জ্যোৎস্না মাখা তারাবিহীন রাতের কাহিনী আর গা ছম-ছম করা গল্পের নতুন রুপ যে তোমাকে দিয়ে মানায়, তোমাকে দিয়েইতো নূহাশ পল্লীর প্রাণের ছোঁয়া আবার বিকশিত করতে হবে, তোমার হলূদ হিমূ আর মিসির আলী নূহাশ পল্লীতে মাটি আঁকড়ে তাই পড়ে আছে,মিসির আলীর প্রানের কথা, হূমায়ূন স্যার তোমাকে সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসতে হবে।

বিড়বিড় করতে করতে রাতের অন্ধকারের ছায়ার সাথে মিসির আলী মিলিয়ে গেলো।আমি ভাবতে লাগলাম,সত্যি মিসির আলী যা বলে গেলো, সত্যিইতো, এটা শুধু মিসির আলীর প্রাণের দাবী নয়, এটাতো আজ সাড়ে ষোল-কোটি বাংলাদেশীর প্রাণের কথা,সারা বাংলাদেশ আজ হুমায়ূন স্যারের সুস্থতা কামনায় দিন-রাত প্রার্থনায় পার করতেছে, প্রিয় স্যার আল্লাহর দরবারে তাই আমাদের মিলিত প্রার্থনা আর একটাই চাওয়া, আপনি সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসুন।

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ ।
Salim932@googlemail.com
19th July 2012,UK