ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

০১) শত প্রতিকূলতা ও বিরূপ প্রচারণা সত্যেও কেন জানি আমি এক ধরনের বিশ্বাস, ভালোবাসায় সিক্ত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার প্রতি, যেমনটা আকৃষ্ট সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি। এই কারণে যে, তারেক রহমান যখন তৃণমূল রাজনীতির কথা বলেন, নতুন চিন্তা চেতনা ও আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশের কথা বলেন, তখন বিশ্বাস, আস্থা ও ভালোবাসার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। হতাশার মাঝেও বুক ভরা আশার আলো দেখতে পাই। কারণ, আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি- এই দুই দলের বাইরে এখন পর্যন্ত নতুন কোন চিন্তা ভাবনা করার মতো বাস্তব অবস্থায় নেই, সুযোগ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিও তেমন একটা নেই। এতোকিছুর পরেও মানুষ এই দুই দলের নেতা নেত্রীদেরকে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের কাণ্ডারি হিসেবেই মনে করে কিংবা ইচ্ছে করেই আত্মাহুতি দিয়ে থাকেন-যে যাই বলুন না কেন, সেরকমই।তাই এই দুই দলের হয়ে দুই তরুণ যখন রাজনীতির মাঠে নতুন রাজনীতি চর্চার কথা বলেন, তখন মন্দের ভালো হিসেবে বিকল্পের অনুপস্থিতিতে ভরসাস্থল হিসেবেই দেখতে হয় বৈ কি। নতুন রাজনীতি ও তৃণমূলের রাজনীতি তথা পরিবর্তনের রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে বা সেই রাজনৈতিক দর্শন এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করতে গিয়ে যদি অহেতুক বিতর্ক আর মিথ্যা, গোয়েবলসীয় তত্যে ভরপুর উদ্ভট সব অরাজনৈতিক কথা বা বক্তব্য দেন, জনগণকে গেলানোর চেষ্টা করেন বা সমাজ ও রাজনীতির ময়দানে নয়া নয়া বিতর্ক আর কূট-রাজনীতির চর্চা চালু করেন, তাহলে সেটা যেমন গ্রহণ যোগ্য নয়, একই সাথে সেটা যদি হয় মিথ্যা আর ইতিহাস ঐতিহ্যকে অহেতুক চ্যালেঞ্জ করে অস্বাভাবিক বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়, সেটা দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য খুবই খারাপ এবং নেতিবাচক এক অরাজনীতি চর্চার ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে এবং এই নেতিবাচক রাজনীতি দেশ জাতি ও জনগণের জন্যে কোন কল্যাণ যেমন বয়ে আনবেনা, একই সাথে জনগণের কাছে তরুণ নেতৃত্বের যে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছিলো, তাও মাঝ পথে থেমে যাবে, জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বারে বার প্রশ্ন বিদ্ধ হওয়া সঠিক ও যোগ্য রাজনীতিবিদের জন্য কল্যাণতো নয়ই, নেতৃত্ব সৃষ্টির সুযোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে।

০২) গত কাল লন্ডনের রয়াল রিজেন্সি হলে বিএনপির স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় তারেক রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ইত্যাদি নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়ে একজন সাধারণ জনগণও আমার বিশ্বাস মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। তারেক রহমানের মতো তরুণ এবং বিএনপির দায়িত্বশীল পদে থেকে এরকম ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং একই সাথে বলা চলে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাচ্ছিল্যপূর্ণ নতুন বক্তব্য দেয়া কতোটুকু যুক্তিসঙ্গত হয়েছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। এরকম বক্তব্য তারেক রহমানের আগামী নেতৃত্ব সৃষ্টিতে বিরাট এক ঝুঁকি এবং বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এরকম বক্তব্য আদৌ দেয়ার আগে কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কিংবা স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচিত হওয়াটা উচিত ছিলো। তাহলে বিএনপির বয়োবৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ, শিক্ষিত, রাজনীতিবিদেরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করার সুযোগ পেতেন।তাহলে তারেক রহমানের বক্তব্য দেশে বিদেশে এতো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতোনা। কেননা আজকের পৃথিবীতে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে কেউই চমক সৃষ্টি করাতো দূরে থাকুক, নিজের গ্রহণযোগ্যতাই তাতে হারাবেন বৈ কি।আমার কেন জানি মনে হয়, বিগত দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই তারেক রহমান কোন কোন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চক্রের খপ্পরে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন, যা তিনির বোধগম্যের বাইরে। নতুবা একজন আধুনিক শিক্ষিত তরুণ রাজনৈতিক কি করে এতো ভ্রান্ত ও ভুল তথ্য সমগ্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরলেন।

প্রিয় তারেক রহমান, আমি আপনার নতুন রাজনীতির সমর্থক তবে আপনার দলীয় রাজনীতি কখনো করিনি, সমর্থনও করিনা। তারমানে এই নয়, একজন বিচক্ষণ, আগামীর স্বপ্ন দ্রষ্টা তরুণ রাজনীতিবিদকে আমি সামনে এগিয়ে দিতে সাহায্য করবোনা। তা নয়, বরং আমি চাই আপনি নতুন স্বপ্ন, নতুন আশাজাগানিয়া গান নিয়ে বিএনপির নেতৃত্ব দিন।কিন্তু ইতিহাস ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি কিংবা খামখেয়ালিপূর্ণ করে নয়। এরকম বক্তব্য যদি বিএনপি একেবারে কট্টর কোন সমর্থক বা কট্টর নেতা দিতেন, তাহলে জনগণের কিছুই আসতোনা। জনগণ সেসব ভাবতেনও না।কেননা বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় সর্বোচ্চ পদে থেকে এরকম অনৈতিক এবং মনগড়া বক্তব্য দেয়াটা কতোটুকু যুক্তিসঙ্গত হয়েছে সেটাই আপনি নিজে বুকে হাত দিয়ে ভাবুন, তারপর চিন্তা করুন, এরকম ইতিহাস বিকৃত করার হীন মতলব নিয়ে কে বা কারা আপনাকে ব্যবহার করে আপনার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে। কি তাদের উদ্দেশ্য ? আপনাকে গভীর ভাবে সেসব ভাবতে হবে, খুঁজতে হবে।

০৩) আপনি বলেছেন জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। এ ধরনের তথ্য আপনাকে কারা দিয়েছে। আপনিতো আর বাংলাদেশের বাইরে থেকে হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসেননি।জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগই লাভ করলেন ৭৫-৭৬ এর পট-পরিবর্তনের সুবাধে। এর পরে ৭৭-এ তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেন। তাহলে উনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন কিভাবে? তাহলে কি আপনি বাংলাদেশের ইতিহাসের চলমান চাকাকে পেছনে নিয়ে যেতে চান? মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যদি প্রথম রাষ্ট্রপতিই হবেন, তাহলে উনি স্বাধীনতার ঘোষক তাকেন কি করে? কারণ আপনিই বলেছেন উনি প্রথম রাষ্ট্রপতি। ধরেই নিলাম আপনার তথ্য সঠিক।তাহলেতো এর আগ পর্যন্ত পেছনের ইতিহাস বাতিল বলে গণ্য হয়ে যায়।কারণ জিয়াউর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি মানতে হলে, উনি যাদের অধীনে রাষ্ট্রের সেবা করেছেন, বা রাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ করেছেন, তার অস্তিত্ব আর থাকেনা। কেননা সেসব থাকলে, আপনার তথ্য আপনা আপনিই বাতিল হয়ে যায়।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের প্রধান হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমদ আর স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তারপরে ৭৫ পরবর্তী সরকার আর যে সরকারের প্রধান বেনিফিসিয়ারি হিসেবে জিয়াউর রহমানের উত্থানের সুযোগ-সবই কি বৃথা, মিথ্যে।কিন্তু ঐ সময় যারা ছিলেন, সারা বিশ্ব যাদের কথায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কে নিয়ে ভাবলো, স্বীকৃতি দিলো, মুক্তিযুদ্ধ হলো-সবই কি মিথ্যে? যদি তাই হবে তাহলে ঐ সময়ে জিয়াউর রহমানের অবস্থানইবা কি হবে- সেটা এখন আপনাকে বলতে হবে।ঐ সময়ের ইতিহাস যদি না থাকে, অস্তিত্ব যদি স্বীকার করা না হয়, তাহলে জিয়াউর রহমানের অস্তিত্ব আপনি কিভাবে প্রমাণ করবেন ? আবার ঐ সময়কার ইতিহাস এবং জিয়াউর রহমান-কেউই যেহেতু ইনভিজিবল নন, তাহলে আপনি কেমন করে বলছেন জিয়াউর রহমান প্রথম রাষ্ট্রপতি? কারণ নতুন তথ্য আপনি দিয়েছেন। এর জবাব জাতিকে দেয়ার দায়িত্ব আপনার। আমার প্রশ্ন হলো আপনি কি জেনে শুনে বুঝে এসব কথা বলেছেন নাকি স্রেফ রাজনৈতিক ময়দানে আলোড়ন তুলার জন্য এমন চমকপ্রদ তথ্য উপস্থাপন করেছেন।জিয়াউর রহমান যখন সিএমএলে তখন ইত্তেফাক পত্রিকায় ও অধুনালুপ্ত অবজারভারে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, সেই নিবন্ধে তিনি কখনো লিখেননি, তিনিই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বরং মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও প্রবাসী সরকারের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বের ও অবদানের কথাই লিখেছিলেন।

মজার ব্যাপার হলো, বিগত জোট সরকারের সময় বিএনপির প্রকাশিত ব্রুসিয়ার এবং সর্বশেষ বিএনপির ওয়েবসাইটেও বলা হয়েছে জিয়াউর রহমান দেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট, যা সজীব ওয়াজেদ জয়ও ইতিমধ্যে সামাজিক গণমাধ্যমেও বলেছেন।তাহলে আপনার দাবী কি স্ববিরোধী নয় ?

০৪) জিয়াউর রহমান ৭৭-৭৮ সালে ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, অবজারভারে নিবন্ধে লিখেছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বেতারে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। আমরা সেই বক্তব্যকে ধরে নিয়েই জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক মেনে নিচ্ছি।কিন্তু তিনি নিজে কখনো বলেননি তিনিই স্বাধীনতার ঘোষক, বরং তিনি এবং বেলাল মোহাম্মদ-যিনি তাকে বহু কষ্টে চট্টগ্রাম বেতারে নিয়ে এসে দুবার কাটা ছেড়া করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করিয়েছিলেন- সেকথাই বলেছেন।মজার ব্যাপার হলো, মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় তখনকার বাজাদল বা আজকের বিএনপি কেউই এই দাবী করেননি। এই দাবী সামনে আসে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর অনেক পরে। এটা পরিষ্কার এবং একশো ভাগ সত্য।একটি ঘোষণা কিংবা বেতারে একটি বক্তব্যের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়নি এবং হওয়া সম্ভব নয়-সেটা আপনি আমি সকলেই জানি। তাছাড়া, ঘোষণা যেহেতু রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক- তাহলে সেটার যেমন রিকগনিশন দরকার, তেমনি ঘোষণাটা আসতেও হবে সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে, যার রয়েছে ঐ ঘটনা বা ইতিহাসের নতুন সৃষ্টির সাথে বিশ্বের নেতৃত্বের সাথে পরিচিত ও সম্পর্কিত। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে জিয়াউর রহমানকে কি করে দাঁড় করাবেন ? বঙ্গবন্ধুর নামে যেমন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীনও হয়েছে। বিশ্ব এবং বাঙালি বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কারো কি রিকগনিশন ছিলো? সেজন্যে এটা একটা অহেতুক বিতর্ক। আমি এই অহেতুক বিতর্কে যেতে চাইনা।এই বিতর্ক আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি করুক-জনগণ বেশ আরামে আয়েশে সেটা উপভোগ করবে।কারণ এরকম বিতর্কে ইতিহাসের সত্য কখনো পাল্টে যাবেনা, বিশ্বে এরকম বহু বিতর্কই আছে, কারো বক্তব্যে বা তথ্যে এর কিছুই আসে যায়না।

০৫) আপনি সব চাইতে মারাত্মক ভ্রান্ত এক বক্তব্য দিয়েছেন, আর তাহলো ৭ই মার্চ নিয়ে।আজকে যারা বিএনপি করেন, সেসময় যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, কিংবা জাসদ বাসদ কমিউনিস্ট বহুধা ভাগে বিভক্ত- যারা আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেক তথ্য ও যুক্তি পাল্টা যুক্তি ও মার্ক্সীয় তথ্য হাজির করেন-তারাও কেউই ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে, এমনকি যে জামায়াতে ইসলামী, শুধু কি তাই, খোদ পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি। অথচ আমাদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর এসে আপনি তুললেন। নিশ্চয় ৭ই মার্চ সম্পর্কে আপনার বিস্তর ধারণা, জ্ঞান এবং নতুন তথ্য রয়েছে। বিশ্বের বহু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে এখন নিয়মিত গবেষণা, লেকচার, চেয়ার যেমন গ্যাটিসবার্গ এড্রেস নিয়ে হয়, তেমনি হয়ে থাকে।৭ই মার্চের বক্তব্য যে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের টিম লিখেছিলেন, নির্ধারণ করেছিলেন, সেই নিউক্লিয়াসের জনক সিরাজুল আলম এখনো বেচে আছেন, আর বাকি সকলেই প্রয়াত। তাদের কেউ এমনকি সিরাজুল আলম খানও কখনো এমন দাবী করেননি, অথচ আপনি জাতিকে নতুন তথ্য দিলেন। এই কি আপনার নতুন রাজনীতি ? ৭ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানের অবস্থা কেমন ছিলো-একটু মনের আয়নায় আগে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন প্লিজ। সেদিন বাইরে পাকিস্তানী বন্ধুক, কামান, আর উপরে হেলিকপ্টারের নজরদারির মধ্যে বন্ধুক বুলেটের মুখে বঙ্গবন্ধু কেমন রাজনৈতিক দক্ষতা আর ঐতিহাসিক অনিবার্য স্বাধীনতার সত্যের দিকে বাংলাদেশকে দিকনির্দেশনা দিলেন আর বললেন এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম- এরপরের ইতিহাসতো শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্ব জানে। প্রিয় তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের বক্তব্য নিয়ে হঠাত করে নতুন বিতর্ক তুলে আপনি কি ফায়দা হাসিল করতে চান আমার বোধগম্য নয়।এই ভাষণ নিয়ে কথা বার্তা এই ছোট কলামে লিখে শেষ করা যাবেনা, তাই এখানে এই ভাষণ নিয়ে কোন বক্তব্য দিতে চাইনা। কেননা ৭ই মার্চের ভাষণের ফলেই জিয়াউর রহমান সহ সকল বাঙালি সৈনিক আর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আজকে ৭ই মার্চ নিয়ে প্রশ্ন তুললে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সহ খোদ জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের বৈধতাই প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। সেটা কি ভেবে চিনতে দেখেছেন, নাকি হুজুগের তালেই বক্তব্য দিয়েছেন?

০৬) প্রিয় তারেক রহমান, আপনার সমালোচনা করলে আমার নিজেরই কষ্ট হয়, কেননা আপনার তৃণমূলের রাজনৈতিক দর্শন আমার খুব পছন্দের। তাই আপনার রাজনৈতিক মৃত্যু আমি কখনোই চাইনা। তবে কেন জানি মনে হচ্ছে, একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী খুব সন্তর্পণে আপনার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মৃত্যু ঘটানোর যত রকমের পথ ও পন্থা আছে, অতি সঙ্গোপনে তারা করে ফেলতেছে, যার শুরু দশম সংবাদ নির্বাচনের আগ থেকেই। এর সর্বশেষ প্রকাশ স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় আপনার বক্তব্য-যা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির হাতকেই শক্তিশালী ও খুশী করেছে অথচ হাজারো লাখো জাতীয়াতাবাদী শক্তি ও নতুন রাজনীতির স্বপ্ন চারীদের আহত ও ক্ষত বিক্ষত করেছে। একজন লোক যদি তার নিজ হাতের আঙ্গুলের দিকে তাকায় কিংবা স্কুলের প্রাথমিক নামতা শেখার জন্যে প্রথম যখন স্কুলে যায়, তখন ১ দিয়েই শুরু করে নামতা, কিংবা হাতের আঙ্গুলের ছোট (কানি)আঙ্গুলকে ছোট (কানি) আঙ্গুল বলতে শিখে। কখনো ১ বাদ দিয়ে ২ কিংবা ছোট আঙ্গুলটিকে(কানি)বড় আঙ্গুল বা বৃদ্ধাঙ্গুলি বলতে শিখেনা। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বা তাকে ছোট করে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি, বাংলাদেশের অভ্যুদয় কিছুতেই ভাবা যায়না, হয়ও না। আজকে আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করা মানেই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা নয়।তবে আপনি ঠিকই বলেছেন, আওয়ামীলীগ বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করেছে। এই একটি বক্তব্যের জন্যে আপনি ধন্যবাদ পাওয়ার দাবীদার।তবে সেটা আওয়ামীলীগের সমস্যা। আমি বঙ্গবন্ধুর কথা বলছি, স্বাধীনতার কথা বলছি, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি- আর তা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যারা যুদ্ধ করেছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদেরও অবদান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্বীকার করি ও স্বীকৃতি দিতে হবে, তাই বলে তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর মর্যাদায় বসিয়ে যদি নেতাকে বা যে নেতার ডাকে মুক্তিযুদ্ধ হলো, দেশ স্বাধীন হলো, সেই নেতাকে অস্বীকার করি কিংবা ছোট করি-তাহলেতো আমার নিজের কৃতিত্বই ছোট হয়ে যায়, বিতর্কিত হয়ে যায়, বৈধতা হারিয়ে ফেলে। আমি জেনে শুনে কি এমন করতে পারি ? প্রশ্নটা আপনার কাছেই রাখলাম।

এখানে একটা কথা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেননি- এরকম কথা আপনি নন অনেকেই বলেন।তাদেরকে একথাটাই বলতে চাই কোন নেতা দিক নির্দেশনা দিতে পারেন, যুদ্ধ করেননা, তিনি যুদ্ধের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করে দেন, যেমন করে দিয়েছিলেন চার্চিল, মার্টিন লুথার কিং, আব্রাহাম লিংকন আরো অনেকেই।

বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সঠিক কথা বললেই সে বা তিনি আওয়ামীলীগ হয়ে যাননা। আবার একজন তারেক রহমানের তৃণমূলের রাজনীতির কিংবা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিজ্ঞান মনস্ক আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর রাজনীতির পক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিলেই তিনিও বিএনপি বা আওয়ামীলীগের দালাল হয়ে যাননা, যদিও আমাদের দেশে এরকম ভাববার একটা রেওয়াজ সমাজের উপর তলা থেকে নিচ পর্যন্ত হয়েই আছে।সমাজের সব চাইতে সচেতন অংশই যখন সঠিক সমালোচনা পছন্দ ও সহ্য করতে পারেনা, তখন সাধারণ জনগণের দুষ দিয়েই লাভ কি?

প্রিয় তারেক রহমান, নতুনের জয়গানে আমরা সব সময়ই আপনার সঙ্গী হতে চাই। তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ এবং ভিষন হতে হবে ক্লিয়ার ও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে সংঘর্ষ বিহীন।আর সেজন্যে তার আগে ভাগে দরকার আপনার প্রেস টিমকে ঢেলে সাজানো, যাদের থাকবে সকল তথ্য ও তত্বের সুনির্দিষ্ট ও আপ টু দ্য ডেইটেড, অহেতুক বিতর্কের ফানুস নয়, চাই কর্মের ও শৃঙ্খলার এবং উজ্জীবনীর সম্মিলন।ভালো থাকুন-নিয়ত এটাই চাই।

Salim932@googlemail.com
27th March 2014, London.

***
লেখাটি প্রকাশিত: http://gbnews24.com