ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

Julian Assange and Ecuador's foreign minister Ricardo Patino

শিরোনাম দেখে অনেকেই ভেংচি কাটতে পারেন, আবার অনেকেই অবাক হতে পারেন। আবার কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন বেচারা এসাঞ্জ নিয়ে আবার টানাটানি কেনো ? কিংবা অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন বাঙালির খুনটুসি সর্বক্ষেত্রেই। প্রিয় পাঠক সেরকম কিছুই না। আসলে এ শিরোনামের ধার নেয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে, একই সাথে নিউ ইয়র্ক টাইমসের ব্লগ থেকে নেয়া। আজ বেশ ঘটা করেই প্রভাবশালী এই দুই পত্র-পত্রিকায় এভাবেই শিরোনাম এসেছে। যদিও লেখকদের বক্তব্যের সাথে সহমত কিংবা বিরোধিতা কোনটাই এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।সকলেই জানেন জুলিয়ান এসাঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষ্ট্যাট ডিপার্টম্যান্টের তারবার্তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে বিশ্বব্যাপী তাক লাগিয়ে দেন। তার এই তাক লাগানো ও হৈ চৈ ফেলে দেয়ার পর পরই সুইডেনে তাকে নিয়ে ধর্ষণ ও এই সংক্রান্ত অভিযোগ যখন দায়ের হয় তখনো এসাঞ্জকে আলোচনা নতুন মাত্রা লাভ করে।ব্রিটেন এসাঞ্জকে এরেস্ট করার জন্য উঠে পড়ে লাগে বিশেষ করে সুইডিশ সরকার যখন চায় তাকে এক্সট্রাডাইট করে কুয়েশ্চান করার জন্য। এসাঞ্জ চাননা সুইডেনে যেতে, গ্রেপ্তার এড়াতে জুলিয়ান এসাঞ্জ একের পর এক নিরাপত্তার আস্রয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষার কৌশল হিসেবে লন্ডনের ইকুয়েডর এম্বাসিতে আশ্রয় নেন। ইকুয়েডর হলো অধিক ফ্রিডম অব স্পিচের স্বর্গ রাজ্য। আর দীর্ঘদিন ধরে জুলিয়ান এসাঞ্জ লন্ডনের ইকুয়েডর এম্বাসিতে এক ধরনের জেল বন্দি জীবন যাপন করছেন যদিও দূতাবাসের ভিতরে সকল রাজকীয় সুযোগ সুবিধা তাকে প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু দূতাবাসের বাইরে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে সারাক্ষণ নজরে রাখছে। যখনই দূতাবাসের ভিতর থেকে বের হবেন তখনি ব্রিটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করবে সন্দেহ নাই।

 

উইকিলিকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান এসাঞ্জ মার্কিন ষ্ট্যাট ডিপার্টম্যান্টের কেবল লিকস করার জন্যে এখন পর্যন্ত তাকে এক্সট্রাডাইড করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সেরকম কোন অনুরোধ ব্রিটেন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এটর্নি অফিস থেকে করা হয়নি, যেমনটা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ক্ষেত্রে।তবে আমভাবে পত্র পত্রিকায় বলাবলি হচ্ছে এসাঞ্জ ইকুয়েডর এম্বাসি ত্যাগ করলেই তাকে যেমন গ্রেপ্তার করা হবে, একই সাথে সুইডিশ সরকারের অনুরোধে এক্সট্রাডাইট করা হবে, কোন কোন পত্রিকা লিখছে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তার মানে এসাঞ্জের বাকি জীবন কারাগারের অন্ধ-প্রকোষ্টে কাটাতে হবে।

 

হঠাত এসাঞ্জের প্রেস কনফারেন্স- দূতাবাস ছাড়ার ঘোষণা-

 

এই যখন জল্পনা-কল্পনা চলছে ঠিক তখনি গত দুদিন আগে জুলিয়ান এসাঞ্জ ঘটা করেই সাংবাদিকদের ডেকে ঘোষণা করলেন তিনি শিগগীরই ইকুয়েডর এম্বাসি ত্যাগ করবেন। এসাঞ্জের এই নাটকীয় ঘোষণায় বিশ্ব মিডিয়া ও মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও আলোড়ন তুলে। বিশ্ব মিডিয়ার তাবৎ নামকরা সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানরা আবারো দিন রাত ইকুয়েডর এম্বাসির সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েন এসাঞ্জ কখন কিভাবে দূতাবাস ত্যাগ করেন এবং ব্রিটিশ পুলিশ তখন তাকে গ্রেপ্তার করে কোথায় নিয়ে যায়।ইকুয়েডর দূতাবাসে এসাঞ্জ যখন আস্রয় নেন, তখন থেকে বাইরে যেমন পুলিশ অপেক্ষার দিন গুনছে, একই সাথে মিডিয়াও সেখানে দিন রাত পাহাড়া বসিয়ে রেখেছে। কোন কোন মিডিয়া এসাঞ্জ গ্রেপ্তারে ব্রিটিশ পুলিশের লক্ষ লক্ষ পাউন্ড খরচের এই অবস্থা বেশ উষ্মার সাথে রিপোর্টেও ইতিমধ্যে বেরিয়েছে। যা নিয়ে হাউস অব কমন্সেও আলোচনা হয়েছে।

 

ইকুয়েডর প্রেসিডেন্ট, রাশিয়ার পুতিন আর ইইউ ও পশ্চিমারা-

 

শুধু এসাঞ্জ ইস্যুতে নয়, সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়া আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তাতে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরিয়েও নাটকীয় ভাবে জড়িয়ে গেছেন। রাশিয়ার সাথে একীভূত না থাকলেও স্পষ্টতই প্রেসিডেন্ট রাফাল ইইউ-ন্যাটো-মার্কিন জোটের সেংশনের বিপরীতে বলেছেন, আমার প্রোডাক্ট কোথায় বিক্রি করবো-সেজন্য  কারো অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন মনে করছিনা, কারণ ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশ ইইউর অন্তর্ভুক্ত কোন দেশ নয়।

 

কিন্তু এই অবস্থায় হঠাত করে এসাঞ্জ দূতাবাস ত্যাগের কথা বলছেন কেন ? সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে। তবে কি এসাঞ্জ দূতাবাস থেকে কোন চাপের মধ্যে আছেন ? মোটা-দাগের কথায় এরকম ভাবনা বা প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে। কিন্তু দূতাবাসের সার্বিক সহযোগিতা আর প্রোটেকশন সেরকম কোন অবস্থার ইঙ্গিত দেয়না।কেননা ব্রিটিশ পুলিশ হাজারো চেষ্টা করেও এসাঞ্জকে যেমন বাইরে নিয়ে আসতে পারেনি, একই সাথে ইকুয়েডর সরকারের কড়া ভূমিকার কারণে দূতাবাসের ভিতরে গিয়েও গ্রেপ্তার করতে সম্মত হচ্ছেনা।

 

দূতাবাসে সেলেব্রিটিদের ভিড়-

 

এসাঞ্জকে দেখার জন্যে ইকুয়েডর দূতাবাসে ব্রিটিশ সেলেব্রিটিদের ভিড় লেগেই আছে। ইতিমধ্যে তার সাথে সাক্ষাত করেছেন স্যার গোল্ড স্মীথের কন্যা জেমাইমা স্মীথ খান, সাড়া জাগানো তারকা পামেলা অ্যান্ডারসন, ইকো অনো, আর হালের লেডি গাঁগাঁএসাঞ্জের ফিয়ান্সি জর্জ ক্লোনি প্রায় সময়েই দূতাবাসে তাকে সময় দিচ্ছেন। লেডি গাগা টুইটে কেক আর চায়ের নিমন্ত্রণ জানিয়ে দূতাবাসে এসাঞ্জকে দেখার জন্যে অন্যদেরও নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

 

বিশ্ব শিরোনাম ও আরব বসন্তে উইকিলিকস-

 

২০১২ সাল থেকেই উইকিলিকস, জুলিয়ান এসাঞ্জ আর আজকের স্নোডেন বিশ্ব মিডিয়ায় কেবলস লক করে হৈ চৈ শুধু ফেলেননি, অনেক সরকারের ভিতরের নানান তথ্য জনসমক্ষে নিয়ে এসে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন।আরব বসন্তের যে ঢেউ লাগে বিনিময়ে হোসনি মোবারকের নাটকীয় পতনে এই উইকিলিকসের কেবল বার্তা প্রকাশেও অনেকটা ভূমিকা অনেকেই আরব বিশ্বের ব্লগে লিখেছেন।ল্যাটিন আমেরিকা, আরব বিশ্ব, আর তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই জুলিয়ান এসাঞ্জ এক হিরোইজমের নতুন নাম- এটা অনেকটা সংশয় ছাড়াই বলা যায়। কেননা পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতের অনেক তারবার্তাও উইকিলিকস প্রকাশ করেছে। যদিও ভারতের ভিতরকার বার্তা এখনো সেভাবে আসেনি, যেমনটা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এসেছে।

 

এসাঞ্জের আইনজীবী আমাল আমালুদ্দিন-

 

জুলিয়ান এসাঞ্জ এর আইনজীবী প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত থাকলে নিশ্চিত করে বলেননি এসাঞ্জ এর পরবর্তী পদক্ষেপ। কেননা আমাল আমালউদ্দিনেরও সন্দেহ এসাঞ্জ দূতাবাসের বাইরে গেলেই গ্রেপ্তার বরণ করবেন। প্রশ্ন এসে যায় তাহলে কি এসাঞ্জ স্বেচ্ছা কারাবরণ করবেন?

 

এদিকে আজকে এসাঞ্জের আইনজীবী সংবাদ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, জুলিয়ান এসাঞ্জ নিজের নিরাপত্তা ও গ্রেপ্তার ইস্যুতে নিশ্চিত না হয়ে দূতাবাস ছাড়ছেননা। সংবাদ মাধ্যমে তিনি এরকমই বিবৃতি আজকে ইস্যু করেছেন।

 

পশ্চিমা গণমাধ্যমের কেউ জুলিয়ান এসাঞ্জের এই স্ববিরোধী ভুমিকারও সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ বলছেন এসাঞ্জ জানেন যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এক্সট্রাডাইটের জন্য আবেদন করেনি, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ম্যানিংস এর কেসে কেবল বার্তা প্রকাশের অপরাধে রাষ্ট্রদ্রোহি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ভোগ করছেন। এসাঞ্জ ও তার আইনজীবী জানেন জুলিয়ানের ভাগ্যে কি ঘটছে।

 

হিরো এবং জিরো-

 

মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ কেবলস প্রকাশ করে বিশ্ব গণমাধ্যমের এই হিরো ধর্ষণ আর শ্লীলতাহানির অভিযোগে নাজেহাল অবস্থায়ও অনেক খ্যাতিমানদের বিশেষ করে তার বান্ধবী ক্লোনির সমর্থন পাচ্ছেন।ইকুয়েডর সহ ল্যাটিন আমেরিকার সরকারগুলো এখনো এসাঞ্জের পেছনে রয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী রাশিয়ার পুতিন সরকারের ডিপ্লোম্যাটিক কুশলী সমর্থনের খেলা।এসাঞ্জের বন্ধু বান্ধবেরাও সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। নিউইয়র্কের উইকিলিকস অফিস এতো কিছুর পরেও চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় দেখিয়েছেন।

 

সব মিলিয়ে নানা নাটকীয় টানা পোড়েন ও রাজনৈতিক গেম জুলিয়ানকে ঘিরে এখনো আবর্তিত হচ্ছে। সে গেমে জুলিয়ান কেমন করে নিজেকে প্রকাশ করেন সেটাই এখন দেখার আসল বিষয়। আর এসাঞ্জের পদক্ষেপই বলে দেবে আগামীর উইকিলিকসের হিরো হয়ে থাকবেন নাকি জিরো হয়ে নিজেকে সময়ের হাতে বিলিয়ে দিবেন।

 

Salim932@googlemail.com

19th August 2014, London