ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত যে রাজনৈতিক দলটি -তার নাম জামায়াতে ইসলাম ।৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা,স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরে একটু একটু করে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা, স্বাধীনতার পরে আবার স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে ভিন্ন নামে রাজনীতি করা, ৯১ এ এককভাবে বড় দুই দলএর কেউই যখন ক্ষমতায় যেতে পারল না, তখন দুটি দলের টানাপড়ন থাকা সত্বেও বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দান, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে আওয়ামী লীগের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে তত্বাবধায়ক দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করা,অত:পর আবার ২০০১ সালে বিএনপির সাথে জোটগতভাবে ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করা,২০০৯ সালে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পরে দলের হাইকমান্ডের সকলেই যুদ্ধাপরাধীদের অভিযোগে জেলে আটক থাকা, এবং এই বিচার বানচাল তাদের দেশ-বিদেশে লবিং ও প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানোর নিউজ করে বক্তৃতা করা মন্ত্রী-এম পি দের প্রায় প্রত্যহ রুটিন ওয়ার্কে পরিনত হওয়া ,অর্থাত, দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই অদ্যাবধি যে রাজনৈতিক দলটি মিডিয়ার লাইম লাইটে ছিল, কিংবা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সেটি হলো জামায়াত ।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,যে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল,যে দলের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ঘুরছেন,সেই দলটি কি করে আজকের বাংলাদেশে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে, সরকারকে সব কাজ বাদ দিয়ে শুধু মাত্র তাদের বিচার বানচালের ষড়যন্ত্র জনগনকে নসিহত করেই সময় পার করে দিতে হচ্ছে!এই বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে,কি করে জামায়াত এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠলো, কেননা এটি জানলেই আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে রাজনীতিতে জামায়াতের খুটির জোর কি?

প্রথমেই জানা যাক, ৭১ এ জামায়াতের জনবল কেমন ছিল?উত্তর খুবই সহজ ।জামায়াত তখন কোনো ধর্তব্য রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ছিল না ।সর্বসাকুল্যে তাদের পনের-বিশ হাজার কর্মী ছিল।সংখ্যাটা মোটেও এর থেকে বেশি নয় ।অর্থাত,জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা তো দুরে থাক,এই কল্পনা করাও তাদের সাধ্য ছিল না ।তাহলে, আজ কেন তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার যথেষ্ট শক্তি পেল?কেন তাদের ভয়ে তটস্ত থাকতে হবে আমাদের মহাশক্তিধর সরকারকে?এর উত্তর ও সহজ ।৭১ এর জামায়াত আর আজকের জামায়াতের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ফারাক ।একটু একটু করে তারা তাদের রাজনৈতিক বলয় বৃদ্ধি করেছে ।

জামায়াতের রাজনৈতিক উত্তরণের দিকে তাকালে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়তের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত ৯০ পরবর্তী সময় থেকে ।গোলাম আজমের কাছে ৯১ এ মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব নিয়ে আমির হোসেন আমুদের সাক্ষাত করার পরেই জামায়াত বুঝতে পেরেছে রাজনীতিতে তাদের কদর কত!!তারপরে তত্বাবধায়ক দাবিতে হাসিনা-নিজামী-আজমরা একসাথে হরতাল করেছে ।অত:পর খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভা এবং আজকের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ।সোজা কোথায়, ১৫/২০ হাজার কর্মীর জামায়াতকে ও তার নেতৃত্বকে “কলাবরেটর’আইনের মাধ্যমে ক্ষমা করে দেওয়ার কারণেই তারা সংগঠিত হয়েছে ।অর্থাত, আজকের জামাতকে ৭১ পরবর্তী সময়ে বিচারের মুখোমুখি না করে বরঞ্চ তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার সুযোগ করে দিয়েছে ।সুতরাং, জামায়াতের এই রাজনৈতিক উত্তরণের মূলে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর “ক্ষমাহীন ক্ষমা”।তারপর জেনারাল জিয়ার “বহদলীয় গণতন্ত্রের’সুবিধা শতভাগ ভোগ করার কৌশল জামায়াতকে আর শিখিয়ে দিতে হয় নি!রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে প্রথম ও প্রধান শর্ত বিশাল কর্মী বাহিনীর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা ।আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নামে-বেনামে কত শত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে জামায়াত তার আধিপত্য ধরে রেখেছে তা একমাত্র জামায়াত-ই জানে!!!

তারপর জামায়াতকে কাছে পেতে সব দলের মরিয়া ভাব তো আছেই!!! বি এন পি না হয় জামায়াতকে সাথে পেয়ে ধন্য হলো, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সোল এজেন্সির দাবিদার আওয়ামী লিগ কেন জামায়াতের প্রেম পেতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিল?কারণ একটাই, আমাদের রাজনৈতিক সমীকরণ ।
জামায়াতের এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সাধ্য নাই, কিন্তু বড় দুই দলই জানে দেশের ৩০০ টি নির্বাচনী আসনের সবগুলোতেই কমপক্ষে ২৫-৩০ হাজার ভোট রয়েছে জামায়াতের ।তাই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে যে জামায়াতকে বড় প্রয়োজন!!!তাই মুখে যত কথাই বলুক না কেন, আসলে জামায়াতের প্রেম পেতে মরিয়া বড় দুইটি দল ।যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা আর জোড়াতালি মার্কা স্বাক্ষীর ধরন,সাথে অনভিজ্ঞ প্রসিকিউশন দেখে সহজেই অনুমেয় আবারও জামায়াত প্রেমের প্রহর গুনছে সরকার!!!

সুতরাং, আজকে আমরা বিচার, বিচার করে যতই চিত্কার করি না কেন, বিচার এর মোক্ষম সুযোগ জাতি হাতছাড়া করেছে বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতার কারণে ।এর এই মহানুভবতাই মূলত রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে এতটা প্রতিষ্ঠিত করেছে একটু একটু করে!!!!আর জামায়াতের অর্থনৈতিক শক্তির বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে জেনারাল জিয়ার সময় থেকে ।৯১ এ মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব পাঠিয়ে এবং ৯৬ এ রাজপথে একসাথে হরতাল করে রাজনীতিতে জামাতকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন শেখ হাসিনা আর ২০০১ সালে মন্ত্রিত্ব দিয়ে তাদেরকে আরো বেশি গণমুখী দলে পরিনত করেছেন খালেদা জিয়া ।
তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে এতটা প্রভাবশালী করে তোলার দায় বঙ্গবন্ধু,জিয়া, হাসিনা , খালেদা কেউই এড়াতে পারবে না!!
সুতরাং,বুঝাই যাচ্ছে,মুখে রাজনৈতিক বিরোধিতা আর অন্তরে জামায়াতের জন্য “উথলে পরা প্রেম”ই হলো আমাদের ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক নেতৃবিন্দের আসল চরিত্র !!!