ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

সবে মাত্র সন্ধ্যাটা ঘনিয়ে আসতে শুরু করেছে। সময়টাও খুব বেশি নয়,আনুমানিক সাড়ে সাত কি পৌনে আটটা।অনেকক্ষণ ঘরে বসে থেকে মাথাটা ঝিমঝিম করছিল।তাই চা খাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলাম।বাসা থেকে মিনিট সাতেক হেটে যেতে হয়।ভাবলাম আগে একটু বাইরে থেকে বেরিয়ে আসি, তারপর চা খাওয়া যাবে।খানিকটা যেতেই লক্ষ্য করলাম, সবে মাত্র গার্মেন্টস ছুটি হয়েছে,কিংবা গার্মেন্টস কর্মীরা বের হয়ে আসছে।

সাধারণত গার্মেন্টস কর্মীরা কাজের শেষে যখন এই রাস্তাটি ধরে পায়ে হেটে বাড়ি ফিরে, তখন “ভদ্র”লোকেরা এই পথে খুব কমই হেটে যায়।তাই নিয়ম অনুযায়ী রিক্সা খুঁজলাম, কিম্তু পেলাম না। অগত্যা বাকি পথ হেঁটেই যাওয়ার মনস্থির করলাম।কিছুক্ষণের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম, আমার সামনে,পিছনে,চতুর্দিকে গার্মেন্টসের নারী কর্মীরা।তারা পায়ে হেটে বাড়ি যাচ্ছে যার যার মত।এমন অবস্থায় নিজের মত একমনে হাটা যায় না।তাই কখনো দ্রুত, কখনো ধীর পায়ে হাঁটছি, আর লক্ষ্য করছি আমার মত কোনো “ভদ্র”লোক পাওয়া যায় কিনা!কিন্তু সত্যিই পাওয়া গেল না!তাই বিব্রত ভাবটা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে আমার চোখে -মুখে।এমন সময় হঠাত, পিছন দিক থেকে একটি নারী কণ্ঠ, চিত্কার করে বলে উঠলো,”অসভ্ভো, ইতর, হাত সরান বলছি…………ইত্যাদি। মুহুর্তের মধ্যে আমার চোখ দুটি পিছনের দিকে ঘুরে গেল। দেখলাম, উদ্ভ্রান্তের মত এক লোক দাড়িয়ে আছে।এই লোকটিই মেয়েটির গায়ে হাত দিয়েছে,বুঝলাম।প্রতিবাদ করার জন্য পা বাড়িয়েও আবার কি মনে করে যেন পিছিয়ে গেলাম!কি করতে হবে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।বিবেক বলছে,এই সময় এগিয়ে যাওয়া উচিত, কিন্তু কেন যেন পারছি না।

এই ধরনের ঘটনা আমার সামনে ঘটবে,কিন্তু প্রতিবাদ করব না,এটা সত্যিই আমার ডিকশনারিতে নেই।কিন্তু তবুও আমি নির্বাক।…………তারমানে কি গার্মেন্টসের মেয়েদের লাঞ্চিত হতে দেখলেও প্রতিবাদ করতে নেই!তাদের লাঞ্চিত করা কি তবে দোষের কিছুই না!সমাজের উচুতলার “ভদ্র”কোনো মেয়ে হলে নিশ্চয়ই আমি এভাবে পালিয়ে যেতাম না।হঠাত করেই সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি গল্প মনে পরে গেল,”তিন পুরুষ”নাম সম্ভবত।সমাজের নিচুতলার মানুষরা নিজেদের মধ্যে যা কিছুই করুক না কেন, আমাদের “ভদ্র”লোকদের তাতে মাথা ঘামাতে নেই!…….ভাবনা গুলো হঠাত করেই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব।আর চিন্তা করতে পারছি না।ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম আমি এতক্ষণে হাটতে হাটতে চায়ের দোকানের সামনে চলে এসেছি।হোটেলে বসতেই বেয়ারা চা দিয়ে গেল।চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর একটু আগের ঘটনাটা পুরোপুরি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি।…………..কিন্তু বিবেক নামক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি এখনো অবিরাম গুলি বর্ষণ করে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে আমার সমগ্র সত্তাকে।

সামসুল আরেফিন
১৩/৫/২০১২