ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

খুব ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি যে ভারত হচ্ছে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশিরা জাতি হিসেবে অকৃতজ্ঞ নয়,তাই তারা ভারতের বন্ধুত্বের ঋণ এখনো শোধ করে যাচ্ছে।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে,বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখনি কিছুটা জ্ঞান-বুদ্ধি হয়েছে তখন থেকেই দেখি আসছি ভারতের আধিপত্যবাদী আর সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের কদর্য রূপ।সীমান্তে পাখির মত গুলি করে বাংলাদেশীদের হত্যা করা,ফারাক্কা দিয়ে জঘন্যতম পানি আগ্রাসন চালানো,সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়াবহতা, রাজনৈতিকভাবে সারাক্ষণই প্রতিবেশী ছোট্ট রাষ্ট্রটিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার কৌশল অবলম্বন করা বৃহৎ এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির ব্যাপারে একটি প্রশ্ন বারবার মনের কোণে উকি দিয়েছে, তারা কি সত্যিই আমাদের বন্ধু??মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের এই ভূমিকার সাথে ৭১ পরবর্তী ভারতকে মিলাতে পারিনি কখনো। তাই চেষ্টা করেছি মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে কেন ভারত সাহায্য করলো তার স্বরূপ উদঘাটনে।কিন্তু স্পর্শকাতর এই ব্যাপারটি নিয়ে লিখব কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলাম।তার কারণ হচ্ছে,কোনো এক অজানা কারণে আজকের বাংলাদেশে ভারতের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার বিরোধিতা আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা সমার্থক হয়ে গেছে। সত্যিই সেলুকাস!

কমরেড তুআহা,দিলীপ বড়ুয়া কিংবা জামাতে ইসলামী সহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো যে দাবি করে,ভারতের এই আধিপত্যবাদী চরিত্রের কথাটি মাথায় রেখেই তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি,এই অমূলক দাবিটিকে প্রকারন্তরে “জায়েজ”করে দেয়া হয়,যখন ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরোধিতা আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা সমার্থক হয়ে যায়।কেননা,ভারতের বলয়ের বাইরে থেকেও যে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করা যেত তার প্রমান কমান্ডার সিরাজ সিকদার।’বাংলাদেশের চে” বলেও তিনি অনেকের কাছে সুপরিচিত।তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে সিরাজের “গুম ‘হয়ে যাওয়ার কাহিনীও কম চমকপ্রদ নয়!এর প্রধান কারণ হচ্ছে,ভারতীয় বাহিনীর আনুকূল্য ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি,কখনই বামদের প্রতি না।এই বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে বিধায় এই পোস্টটিতে এই বিষয়ের আর অবতারণা করব না।যাই হোক,তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা স্বাধীন করার প্রয়োজন ভারতের যে ছিল নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতাকামীদের দমন এবং সাউথ এশিয়ায় আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্য তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা “ভারতের” মস্তিস্ক জাত বলে আমি মনে করি না,বরঞ্চ পাকিস্তানিরাই আমাদেরকে স্বাধীনতা যুদ্ধটিকে ত্বরান্বিত করতে বাধ্য করেছে।বঞ্চনা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়,পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়,তখন দেয়ালই ধাক্কা দেয়। মুক্তিযুদ্ধে তা-ই ঘটেছিল।কিন্তু ভারত যে স্বার্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়ে ছিল, তা তারা পুরোপুরি আদায় করতে পারেনি মূলত আমাদের সংগ্রামী মানসিকতার জন্য।”ভারত সাহায্য না করলে বাংলাদেশ কখনই স্বাধীন হত না” এই কথাটির সাথে আমি একমত নই।এ কথা নিশ্চিত যে,ভারতের সাহায্যেই আমরা মাত্র ২৬৬ দিনে স্বাধীন হয়েছি,কিন্তু তাদের সহযোগিতা না পেলেও আমরা স্বাধীন হতাম,সময় আরো বেশি লাগত,আরো অনেক রক্তের প্রয়োজন পড়ত এই মাটির।কিন্তু তবুও আমরা স্বাধীন হতাম।নিশ্চিতভাবেই হতাম।ভারত যে আমাদেরকে কৌশলগত কারণেই মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে তার প্রমান হচ্ছে,যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তার “প্রভুসুলভ” আচরণ।স্বাধীনতার পর থেকে আজকে পর্যন্ত ভারত সকল ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী আচরণ করছে।ভারতের এই আগ্রাসনকে আমরা মোটামুটিভাবে ৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারি।

১ :রাজনৈতিক আগ্রাসন
২ :পানি আগ্রাসন
৩:সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
৪:অর্থনৈতিক আগ্রাসন এবং
৫:সীমান্তে হত্যা,পুশ ইন ইত্যাদির মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ।

প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে আলাদাভাবে লেখার চেষ্টা করব যাতে আমাদের সবার এই কথা বুঝতে সুবিধা হয় যে, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে ভারত যে সহযোগিতা করেছিল তার মূল উদ্দেশ্য ছিল “পিন্ডির শৃঙ্খল থেকে আমাদের মুক্ত করে দিল্লির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করা”।এই পোস্টটিতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অস্রাসন নিয়ে কথা বলব।প্রথমেই দেখে নেই পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ দলিলে কি আছে:

“”পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড পূর্ব রণক্ষেত্রে ভারতীয় এবং বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক লে:জে : অরোরার কাছে আত্মসমর্পনে সম্মতি প্রদান করছে।এই আত্মসমর্পনে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাক বাহিনীর স্থল,নৌ ও বিমান বাহিনীর সকল সদস্য(আর্মি),সকল আধা সামরিক বাহিনী(মিলিশিয়া বাহিনী এবং পুলিশ) এবং অসামরিক অস্ত্রধারী সৈনিক(আল বদর,রাজাকার,আল শামস)অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এই সকল সৈন্যরা যে যেখানে আছে,সেইভাবে অস্ত্র পরিত্যাগ করবে এবং তাদের নিকটস্থ জে:অরোরার বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করবে।এই দলিল স্বাক্ষরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড জে: অরোরার এদেশাধিনে নেস্ত হবে।তার আদেশ এর বরখেলাপ আত্মসমর্পণ চুক্তি ভঙ্গের শামিল হবে এবং যুদ্ধের সব গ্রায্য নিয়মাবলী ও বিধি অনুযায়ী অমান্যকারীর বিরুদ্ধে বেবস্থা নেওয়া হবে।

এই আত্মসমর্পণ চুক্তির ব্যাখ্যা সম্পর্কিত কোনো সন্দেহের উদ্ভব হলে জে:অরোরার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। লে:জে:অরোরা এই মর্মে পবিত্র আশ্বাস প্রদান করেন যে,যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের প্রতি জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী যোগ্য সম্মান ও নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।

স্বাক্ষর : স্বাক্ষর :
জগজিত সিং অরোরা আমির আব্দুল্লা খান নিয়াজি
লে: জেনারেল, জি ও সি এবং লে:জেনারেল,সামরিক আইন প্রশাসক,
পূর্বাঞ্চলীয় বাংলাদেশ বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর প্রধান
(সুত্র:৬৬ দিনে স্বাধীনতা ,নুরুল কাদির,ভ্রাম্যমান রাষ্ট্রদূত,মুজিবনগর সরকার )

এই চুক্তি অনুযায়ী যা সাব্যস্ত হচ্ছে তা হলো:
১:এই চুক্তি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থানকারী পাক আর্মি এবং তার সাহায্যকারীদের বিরদ্ধে বেবস্থা নিতে পারেন জে অরোরা এবং বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিবাহিনীর অধিকার রহিত ও অগ্রায্য করা হয়।(যার প্রমান ১৯৭৪ এর সিমলা চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া)

২:চুক্তিতে মুক্তিযুদ্ধ,মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সরকারকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মূলত ১১ টি সেক্টরের মাধ্যমে ৯ মাসের মনাহ মুক্তিযুদ্ধকে পরিপূর্ণভাবে অস্বিকার করা হয়েছে।
দলিলের কোথাও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি নেই এবং বাংলাদেশ সরকারের উল্লেখ নেই।এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে কেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জে এম এ জি ওসমানী কে রাখা হলো না তা আজ ও এক রহস্য।মোদ্দা কথা,এই দলিলে ভারতের রাজনৈতিক আগ্রাসনের পরিচয় স্পষ্ট।

৭১ এর সেপ্টেম্বরে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনের পরে অক্টোবরে ভারতে সাথে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার একটি ৭ দফা মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে।চুক্তিগুলো নিম্নরূপ :

১:যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে,শুধু তারাই প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়জিত থাকতে পারবে।বাকিদের চাকরিচুত করা হবে এবং এই শূন্য পদ পূরণ করবে ভারতীয় কর্মকর্তারা।
২:প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে(কত দিন করবে তার কোনো সময় সীমা নেই।)
৩:বাংলাদেশের কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে না।
৪:অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি পেরা মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে।
৫:সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবে ভারতীয় বাহিনীর প্রধান,মুক্তিবাহিনীর প্রধান ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়কত্বে থাকবে।
৬:দু দেশের বানিজ্য হবে ওপেন মার্কেট ভিত্তিক এবং বানিজ্যের হিসাব হবে বছর ওয়ারী ও যার যা পাওনা সেটা স্টার্লিং এ পরিশোধ করা হবে।
৭:বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সাথে যোগাযোগ করবে এবং ভারত যতদুর পারে এই বেপারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে।

প্রবাসী সরকারের পক্ষে ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দানের পরপরই তিনি মূর্ছা যান।
(সুত্র :২৬৬ দিনে স্বাধীনতা,নুরুল কাদির,ভ্রাম্যমান রাষ্ট্রদূত,মুজিবনগর সরকার)

এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করাই প্রমান করে ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী চিন্তা ই মূলত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে সহযোগিতা করার মূল কারণ।
৭২ এর ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে আসে এই ৭ দফা চুক্তির কথা জানতে পেরে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হন এবং যেসব ভারতীয় কর্মকর্তা বাংলাদেশে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে এসেছি,তাদের দেশে ফেরত পাঠান। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের দিল্লি মিশন প্রধান এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ন রশীদ চৌধুরী ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৯ এক সাক্ষাত্কারে জানান, “ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের এই চুক্তি বঙ্গবন্ধু পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেন। এক কথায়, ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তান শত্রু মুক্ত হয়, কিন্তু সত্যিকার অর্থে,স্বাধীন সার্বভৌম হয় ৭২ এর ১০ জানুয়ারী।এভাবে বঙ্গবন্ধু সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের আধিপত্যের হাত থেকে হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেন।কিন্তু ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের আগ্রাসন আজ ও বন্ধ হয়নি।সর্বশেষ ভারতীয় সাবেক সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’ এর উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি :”ভারত খুব বেশি রাজনৈতিক লাভ পায় নি বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে তার কারণ হচ্ছে,বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামী মানসিকতা।তবে অব্যাহত চাপ প্রয়োগ ভারতকে তার স্বার্থ হাসিলের পথকে কিছুটা প্রশস্ত করবে,যদিও তা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ।”

(চলবে )