ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সম্ভবত ২০০৯ সালের আগস্ট মাসের কথা।আমি তখন ধানমন্ডিতে একটি মেসে থাকি।আমার রুমমেট এক ছোট ভাই ছিল যে সাধারণত পত্রিকা কিংবা নিউজ দেখত না বিধায় দেশের খবরাখবর কিছুই জানত না।সারাক্ষণ শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে ডুবে থাকত সে।তো হঠাত করে একদিন সে আমার নিয়ে আসা পত্রিকা দেখে বলে উঠলো “ভাই,দেহেন,ভারতের পানি মন্ত্রী কি কইছে?” উল্লেখ্য যে, তখন টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে খুব লেখালেখি হচ্ছিল।সে আমাকে একটি কলাম দেখিয়ে পড়তে বলল। লেখাটি ছিল এরকম:

“পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেস চন্দ্র :
টিপাইমুখ বাধে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না”
আমি তখন হাসতে হাসতে বলেছিলাম,” আরে বেটা, রমেস ভারতের পানি মন্ত্রী না,অয় আমাগো দেশের মন্ত্রী”।
এ কথা শুনে ভীষণ অবাক হয়েছিল সে।ধাক্কাটা সামলে কিছুক্ষণ পর হাসতে হাসতে বলেছিল,”ভাই এমনে লোক হাসানোর দরকার কি আমাগো মন্ত্রীগো”? মন্ত্রীদের লোক হাসানোর কি দরকার তা আমিও জানি না।তবে এতটুকু জানি যে গত সাড়ে তিন বছর তারা অব্যাহত গতিতে লোক হাসিয়েই চলছে। কেন তারা এইভাবে লোক হাসিয়েই চলছে?কারণ খুজতে গিয়ে হঠাত করেই স্কুল জীবনে দেখা একটি হিন্দী মুভির কথা মনে পড়ে গেল।মুভিটির নাম মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস ।এইখানে “লাফটার থেরাপি”র সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল।আপনার রাগ,গোস্যা, অভিমান, টেনশন যাই হোক না কেন হাসার চেষ্টা করবেন তাহলে ভালো থাকবেন।কিন্তু রাগ কিংবা টেনশনের সময় হাসা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়!তাই আপনাকে হাসানোর জন্য আছেন আমাদের মননীয় মন্ত্রী মহোদয়রা।তাই তো দেখছি আমাদের হাসানোর জন্য তাদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা!

দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি!বাজার করতে নাভিশ্বাস!বাজারে আগুন!জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ছে!তবুও একটু হাসুন।না হাসলে যে শরীর খারাপ করবে!হাসি আসছে না?আরে ভাই,কোনো টেনশন নিয়েন না,বানিজ্য মন্ত্রী যে আমদের কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন!এইবার নিশ্চয়ই আপনি হাসছেন।দেখলেন কি সহজে আপনার সমস্যা সমাধান হয়ে গেল মন্ত্রীর বদৌলতে!

শেয়ার মার্কেটে ধস!পথে বসে গেছেন!তাও একটু হাসুন। হাসতে পারছেন না? আরে মশাই,অর্থমন্ত্রী তো বলল,তিনি শেয়ার মার্কেট বুঝেন না!!!বাহ,এইতো আপনার মুখে হাসি।
ভারতের সাংবাদিকরা আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশকে “বাফার স্টেট” বলেছে বলে আপনার মন খারাপ। ভাবছেন, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মা কষ্ট পাচ্ছে! আরে ধুর,শুনলেন না,মন্ত্রী বললেন যে,তিনি বাফার স্টেট কি জিনিস বুঝেন না!আমি শিওর,৩০ লক্ষ শহীদের আত্মারাও যে হাসছে!!

ফেলানির লাশ কাটাতারের বেড়ায় ঝুলছে বলে আপনি ভাবছেন,কাটাতারের বেড়ায় ঝুলছে বাংলাদেশ!বুকের বামপাশে বেথা অনুভূত হচ্ছে! এক্ষুণি হাসুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন,ফেলানি এই দেশের কেউ না!!!!
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন!ভাবছেন রাস্তায় উত পেতে আছে মৃত্যুরা!প্রচন্ড আতঙ্কিত আপনি!আপনার যে এক্ষুণি হাসতে হয়। শুনুন, এল,জি,আর,ডি মন্ত্রী আশরাফ বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনা হবেই, থামানো যাবে না!!!

জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে আপনি আতঙ্কিত!ভাবছেন বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে এই দেশ!তবুও হাসুন,পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেছেন,”জনসংখ্যা কোনো সমস্যা না,আমরাও তো ১১ ভাই বোন!!!!
সাংবাদিকদের উপর পুলিশী নির্যাতন দেখে ভাবছেন,আমরা পুলিশী রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছি কিনা?নিজেদেরকে প্রচন্ড অসভ্য মনে হচ্ছে!তবুও তো আপনাকে হাসতে হবে মশাই,নিজের সুস্থ থাকার জন্যই হাসতে হবে।তবে শুনুন, স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী যে পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন!!!এইবার একটু হাসুন!তাও হাসি আসছে না?তবে শুনুন,আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো!পুলিশ ও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভদ্র!

দেখলেন তো,হাজারো সমস্যা সংকুল আমাদের জীবন ধারণ যেখানে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, সেখানে সরকারের মন্ত্রীদের “লাফটার থেরাপি” আমাদের বেচে থাকার জন্য কেমন “টনিকের” মত কাজ করছে!সত্যিই আমাদের বেচে থাকাই যখন দায়,তখন সরকারের মন্ত্রীদের আমাদের বেচে থাকার টনিক যোগার করার এই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার!আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট সকলকে তাদের এই “লাফটার থেরাপির”জন্য জনগনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।আশা করি,সরকারের দেশের জনগনকে ভালো রাখার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।নিন্দুকের নিন্দাও বন্ধ হবে নিশ্চয়।

একটি সত্যি ঘটনা দিয়ে শেষ করছি :

আমার এক প্রতিবাদী বন্ধু,জাতীয় স্বার্থে, যেকোনো ইস্যুতে তাকে রাজপথে পাওয়া যায়।কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বেনার নয়,বরঞ্চ,জাতীয় ইস্যুতে যে কারো সাথে মাঠে নামতে সে প্রস্তুত। তো,সেই বন্ধুকে কিছুদিন আগে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার পথে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল।টানা ৩৭ দিন জেলে থাকার পরে তার মুক্তির দিনে সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়া করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়েছিলাম তাকে রিসিভ করতে।সদ্য কারামুক্ত বন্ধুকে নিয়ে আমরা তিন বন্ধু ফিরছিলাম।এমন সময় এক জন আমাকে বলল,”দোস্ত,তোমাকে কিন্তু আরো স্মার্ট হইতে হবে”।আমি তাকে বললাম,”আমি অতীতের যেকোনো সময়ের চাইতে এখন বেশি স্মার্ট’।তখন আমার পাশ থেকে এক বন্ধু বলল,দোস্ত,তোমার টি-শার্টটা উল্টা পড়ছ!নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,ঘটনা সত্য।এতদিন পরে বন্ধুকে দেখার উত্তেজনায় এবং তাড়াহুড়ার কারণে উল্টো টি-শার্ট পড়েই আমি চলে এসেছি!এইবার সদ্য কারামুক্ত বন্ধুটি বলল,”দোস্ত,তোমার বক্তব্য অনেকটা সাহারা খাতুনের মত হয়ে গেল না!”